• সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গর্বিত বাঙালি আমার বাবা-মা

  রহমান মৃথা

১৭ মে ২০২০, ২৩:৩৮
সুইডেন প্রবাসী রহমান মৃধা
সুইডেন প্রবাসী রহমান মৃধা

ব্রিটিশদের আগমনের আগ থেকেই বাংলা কৃষি প্রধান দেশ। আমার দাদা এবং নানার বাবাও কৃষক ছিলেন। ধান, পাট, মুসুরি, সরিষা থেকে শুরু করে নীল চাষ করেছেন জমিতে। তখন বাড়িতে ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। কৃষি কাজ যুগ যুগ ধরে বয়ে চলেছে আমার বাপ দাদা চৌদ্দগোষ্ঠীর মধ্যে। সেই হিসাবে আমরা গর্বিত বাঙালি। যদিও ভিনদেশি অনেক শাসক বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশে এসে বাহাদুরি বা অত্যাচার করেছে। পরগাছা হয়ে আমাদের খেয়ে আমাদের উপর বাটপারি করেছে। সে সব পরগাছাদের আমরা দেশ থেকে তাড়িয়েছি তবে আমাদের সময় লেগেছে।

বাঙালিরা অতিথিপরায়ণ তাই অনেক সময় ধৈর্য ধরে এবং অনেক কিছু সহ্য করে অন্যায় অত্যাচার মেনে নিয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষরা। আমি আমার দাদা-দাদিকে দেখিনি। দাদা চেষ্টা করেছেন বাবাকে সংসারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে। বাবা তা না করে মেট্রিক পরীক্ষার পর পরই বাড়ি থেকে পালিয়ে পুলিশে যোগদান করেন।
শিক্ষার ভালো সুযোগ না থাকার কারণে ব্রিটিশ প্রশাসনে পুলিশ কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। তাঁর কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন পুরো বাংলাদেশেকে। দেখেছেন বাংলাদেশের মানুষকে। কীভাবে শাসন-শোষণ আর ভাষণের রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে বয়ে চলেছে। যাইহোক বাবা ব্রিটিশ আমলে চাকুরী শুরু করেন এবং যার সমাপ্তি হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। ১৯৭৫ সালের কালরাত্রিতে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন এবং বেশ ভেঙ্গে পড়েন। শেষে সরকারি কর্মজীবন ছেড়ে দাদার বিষয় সম্পদের দায়িত্বে ফিরে আসেন।

বাবার শখ ছিল যেমন গরু পালা, পুকুরে মাছের চাষ করা, মাঠে প্রজেক্ট করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ইত্যাদি। এটা  শুধু নিজের জন্য নয় অন্যকেও অনুপ্রেরণা দিতে সাহায্য করেছেন। তখন সবকিছু আমাদের বাড়িতেই তৈরি হতো লবণ আর কেরোসিন তেল ছাড়া। হাট বাজারে বাড়ির বিভিন্ন উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। পাড়া প্রতিবেশী সহ আশেপাশের গ্রামের মানুষ উৎপাদিত পণ্যের দ্বারা উপকৃত হয়েছে। 
আমার বাবা-মা সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। অপচয় বা বিলাসিতা পছন্দ করেননি। তাঁদের আদর্শে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে। বাপ-দাদার অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার প্রতি তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সাথে বাবার একটু মন খারাপ হয়েছে এই ভেবে কৃষিকাজকে আমাদের সংসারে কে ধরে রাখবে। পরবর্তীতে আমাদের বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা  ১৯৮৬ সাল থেকে লং ডিসটেন্স প্রজেক্ট চালু করেন বাংলাদেশে। উদ্দেশ্য একটিই তা হলো আমাদের যা আছে তা কীভাবে আরো উন্নত করা যায়। আমাদের এলাকায় তিনি নানা ধরনের প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ এবং গবাদি পশু পালনে বিশাল অবদান রেখেছেন। বর্তমানে নহাটা একটি আদর্শ গ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে।

বাবা-মা দীর্ঘ দিন ইউরোপে আমাদের সঙ্গে থেকেছেন। তবে তাঁরা মৃত্যুর আগে দেখে গেছেন তাদের সন্তানরা দেশকে গড়তে, দেশের মানুষকে সাহায্য করতে, শিক্ষাকে প্রসারিত করতে এতটুকু কার্পণ্য করেনি।

আমি বিশ্বাস করি যদি সারা দেশের মানুষ যার যার জায়গা থেকে এলাকা ভিত্তিক বিভিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবে বাংলাদেশেকে সোনার বাংলা করা সহজ হবে। দেশকে ভালোবাসা মানে যেমন নিজের পরিবারকে গড়তে সাহায্য করা এবং একই সাথে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে টেনে তুলতে   চেষ্টা করা। এই চেষ্টা করার মনোভাব তৈরি করার মধ্য দিয়ে একটি সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়।

আমরা যারা ভালো আছি আমাদের কাজ এখন যারা ভালো নেই তাদের সাহায্য করা। এখন যারা ভালো নেই তাদের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু পাবার আশা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কারণ পরিবর্তন আনতে হলে যেমন আছি তেমন থাকলে চলবে না। জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে ধাপে ধাপে সামনের দিকে এগোতে হবে।

আমার বাবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর বাবার সম্পদের লোভে না পড়ে নিজের চেষ্টায় ধাপে ধাপে বছরের পর বছর কঠিন সংগ্রাম করে অনেক কিছু রেখে গেছেন। অন্যদিকে মা আমাদের লালন পালন করেছেন এবং বাবার কাজে সাহায্য করেছেন। তাঁদের জীবনের ৮০ বছরের চেষ্টা এবং কষ্টের ফল বাংলাদেশে রেখে গেছেন, সঙ্গে রেখে গেছেন তাঁদের ছেলে মেয়েদের। যে ফসল তাঁরা ফলিয়েছেন সে ফসল বৃথা যেতে পারেনা।

মনে রাখতে হবে পরিবর্তন প্রথমে নিজ থেকে শুরু করতে হবে, পরে পরিবার, সমাজ এবং শেষে পুরো দেশে। এটা একটি প্রসেস এর জন্য দরকার পরিশ্রম, সংঘবদ্ধতা, সু-শিক্ষা, সততা, দেশ প্রেম, ভালোবাসা এবং সর্বোপরি চেষ্টা। সবাইকে শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড