• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো

  তাসকিন আল আনাস

৩০ মার্চ ২০২০, ১৭:১১
তাসকিন
তাসকিন আল আনাস

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কালজয়ী সেই ভাষণ আজও মানুষের কানে বাজে। প্রতি শতাব্দীতেই তার শব্দগুলো যেন অবিনশ্বর। ১৯৭১ সালের পর অনেকগুলো দুর্যোগ মানুষ পার করেছে। এখনো পার করে যাচ্ছে। প্রতিবারেই দুর্যোগের ধরনগুলো ছিল একটির থেকে আরেকটি আলাদা। কিছু দুর্যোগ ছিল জাতীয় আর কিছু বৈশ্বিক। 

বর্তমানে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক করোনা দুর্যোগ পার করছে পৃথিবী। করোনার বিষনিঃশ্বাস থেকে বাদ পড়েনি বাংলাদেশও। তবে এই দুর্যোগের কবল থেকে বাঁচার হয়তো অনেক বড় উপায় ছিল কিন্তু তার আগেই দুর্যোগের কবলে পড়ে গেছে দেশের মানুষ। মোটাদাগে চিন্তা করতে গেলে এর প্রধান কারণ ছিল দুটো। 

এক. অসচেতন মানুষ ও দুই সরকারের সম্বনয়হীনতা। 

শুরু করতে গেলে প্রথম কারণ দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। প্রথম কারণকে ভাগ করা যেতে পারে চারটি ভাগে, মানুষের আবেগপ্রবণতা, অপরিষ্কার ও পরিস্থিতিকে হালকা করে দেখার প্রবণতা, আড্ডাপ্রিয় জাতি ও অভাব। করোনা প্রথম আঘাত হানে চীনের উহানে ডিসেম্বরের শেষের দিকে। এর পর থেকে সারা বিশ্বে যখন করোনা প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তখন দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীরা দেশে আসতে শুরু করেন। এর ফলে খাল কেটে কুমির নয় বরং এনাকোন্ডা সাপ আনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এয়ারপোর্টে এসেই কোয়ারেন্টাইনে থাকার মানসিকতা দূরের কথা নিজের প্রিয়জনদের জীবন বিপন্ন করে জড়িয়ে ধরেছেন, ফেলে দিয়েছেন জীবন শংকায়। 

এর পর ছিল অপরিষ্কার এবং পরিস্থিতি হালকা করে দেখার প্রবণতা। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসেও যখন সারা বিশ্বে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে তখনো দেশের মানুষ সচেতন হয়নি। এদিক-সেদিক থুতু ফেলাসহ নোংরা এবং অপরিষ্কার করে গিয়েছেন গোটা শহরকে। হ্যান্ডস্যানিটাইজার দূরের কথা সাধারণ সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথাও কেউ ভেবেছেন কী-না সন্দেহ। 

ধীরে ধীরে যখন চীন, হংকং ছাড়িয়ে ইউরোপে হানা দিয়েছে করোনা ভাইরাস তখনো আমরা হাটে বাজারে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে মশগুল। সবার আলোচনার বস্তু করোনা। কিন্তু কারো মাঝেই নেই সচেতনতা। যে যার মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনকি সরকার স্কুল-কলেজ ছুটি দিলেও সবাই সেটিকে নিয়েছেন গ্রীষ্মকালীন অবকাশের আমেজ হিমেবে। বাসের টিকেট বুক করে গিয়েছেন কক্সবাজারে। ঘুরে বেড়িয়েছেন আত্মীয়ের বিয়ে ও পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে। 

শেষ পয়েন্টটি ছিল অভাব। অভাবকে যদি আপনি আর্থিক দেখেন তার চেয়ে বড় হচ্ছে মানসিক দৈন্যতা। দেশের দুর্যোগের মুহূর্তে রাতারাতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাস্ক ও হ্যান্ডস্যানিটাইজারের দাম। অথচ এই ভাইরাস আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিচ্ছে নিজে নয় সবাইকে নিয়ে বাঁচতে জানতে হবে। না হয় মরতে হবে সবাইকেই। এ ছাড়াও জীবিকার তাগিদে মানুষ এখনো ছুটে বেড়াচ্ছেন ঢাকার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। যেখানে লকডাউন ও অফিস বন্ধ করে দেওয়া অবশ্যকরণীয় ছিল সেখানে কিছু কিছু অফিস হোম অফিস করে বাহবা পেয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিক, ডাক্তার, ফায়ার সার্ভিসকর্মীসহ জরুরী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বাদে এখনো যারা অফিস করে যাচ্ছেন তারা শুধু শহরের মানুষকেই নয় সারা দেশের মানুষকে নিয়ে যাচ্ছেন এক অনিবার্য স্বাস্থ্যদুর্যোগের দিকে। 

এরপর যদি দেখি সরকারের সমন্বয়হীনতাকে। সেটিকে বলা উচিত সবচেয়ে ভয়াবহ একটি বিষয়। যেকোন দুর্যোগের কোনো মন্ত্রণালয়েই নেই সমন্বয় পরিকল্পনা। এখন এটি একটি স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ তাই এটি দেখছে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অথচ এত বড় দুর্যোগ শুধু একটি মন্ত্রণালয় নয় গোটা সরকারের সকল স্তরের পরিকল্পনা দরকার ছিল। দেশের এয়ারপোর্ট লকডাউন। অথচ এই পরিস্থিতির মধ্যেও নেমেছে ফ্লাইট। এখন পর্যন্ত সরকার কোনো ডাক্তারকেই দিতে পারেনি পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই)। উপরন্তু  সরকারী মেডিকেল কলেজ নিজ দায়িত্বে নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি কিনে ডাক্তারদের সেবা দিতে বলছেন। এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে? এত এত বড় বড় কোম্পানি তারাও এগিয়ে আসছে না। 

প্রত্যেকটা দেশের সীমাবদ্ধতা আছে। সেটিকে মাথায় রেখেই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। যেমন- চায়নার করোনা পরিস্থিতির কথাই ধরুন। করোনা আক্রমণের পর সে দেশের সরকার তাদের বাতাস পরিস্কার করার যন্ত্র ওয়াটার মিস্ট ক্যানন দিয়ে জীবাণুনাশক ছড়িয়েছে।আমাদের দেশে সেটিনা থাকলেও দাংগা নিয়ন্ত্রণে যে ওয়াটার গান ব্যবহার করা হয় সেটি দিয়ে অন্তত লকডাউন এলাকাগুলোতে জীবাণুনাশক ছড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে সরকার। দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো নিজেদের সিএসআর ফান্ড থেকে পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু এগুলো না করে বরং প্রেস ব্রিফিং, হাত ধোয়ার জন্য জনসমাবেশ, করোনা প্রতিরোধে করণীয় লিফলেট বিতরণ মিছিল চালানো হচ্ছে। যা আমি মনে করি সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলানোর একটি পরিকল্পনা। কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকটা দুর্যোগে দেশের মানুষের পাশে ছিলেন। তার পিতা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে গোটা জাতিকে একটি পরিচয় দান করেছিলেন তার সুযোগ্য কন্যা হিসেবে অবশ্যই তিনি দেশের মানুষের ভালোটাই চাইবেন। 

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে যে, সরকারী মন্ত্রণালয়গুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর চেয়ে হাস্যকর সব অনুষ্ঠানাদি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। আমি মনে করি না এখনো সময় আছে, তবুও যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে হয়তো দুর্যোগের প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। সরকারের উচিত ওয়াটারগানগুলো দিয়ে শুধু মানুষের উপর গরম পানি না মেরে জীবাণুনাশক ছিটান, ফেসবুকের ভাইরাল টপিকের উপরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ন্যস্ত না করে দুর্যোগ, স্বাস্থ্য, সামরিক সকল স্তরের মহলকে নিয়ে জরুরী কমিটি গঠন করে করোনা মোকাবিলায় দ্রুত মাঠে নামা। 

হ্যাঁ, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো- এই মতাদর্শে উজ্জীবিত এই দেশের মানুষ। তাদের হয়তো পরাজিত করা সহজ হবে না। তবে এও মনে রাখতে হবে আমরা এখনো এমন মৃত্যু কেউ চাইবো না যেখানে আমি আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে শেষ দেখা দেখতে পারব না, বিনা চিকিৎসায় নিজের প্রিয়জনকে মরতে দেখতে হবে। তাই সচেতনতার এখনি সময়। জনগণের পাশাপাশি সরকারকে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভাইরাস মোকাবিলায় কেননা এই ভাইরাস যেভাবে প্রতিনিয়ত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় তেমনি সরকারের সিদ্ধান্ত দ্রুততার সঙ্গে না নিতে পারলে এই দুর্যোগ আর থামানো সম্ভব হবে না। 

লেখক : সাংবাদিক

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড