• বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

সম্ভাবনার দুয়ারে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম 

  ইকরাম আল বায়জিদ ১১ মে ২০১৯, ১২:৫২

চট্রগ্রাম 
কর্মফুলী টানেল (ছবি : সংগৃহীত)

এমডিজি পূরণের সাফল্য নিয়ে এখন এসডিজি পূরণের স্বল্প সময়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিবারণ, সকলের জন্য সুশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নসহ রয়েছে- টেকসই অবকাঠামো ও শিল্পায়ন, বাসযোগ্য টেকসই নগরায়ণ, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান এবং আরও ১১টিসহ মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার ও দেশের রয়েছে বিভিন্ন মেয়াদী পরিকল্পনা যা অগ্রসর হচ্ছে তার স্বাভাবিক গতিতে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একটি আরেকটির ওপর অনেকাংশেই পরস্পরভাবে সম্পর্কযুক্ত। যেমনটা সকলের জন্য সুশিক্ষা খুলে দেয় জনসচেতনতা, লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচনসহ জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার আরও অনেক সম্ভাবনা। ঠিক তেমনি টেকসই অবকাঠামো ও শিল্পায়নের সঙ্গেও রয়েছে নগরায়ণ ও কর্মসংস্থানের গভীর সম্পর্ক। কিছু মৌলিক লক্ষ্যমাত্রাকে স্বল্প সময়ে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে যা অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রার জন্যও হয়ে উঠবে তীব্র প্রভাবক। বর্তমান সময়ের দুটি সেরা সাফল্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও পদ্মা ব্রিজসহ রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ আরও অনেক যা প্রত্যক্ষভাবেই অনেক লক্ষ্যমাত্রাকে গতিবৃদ্ধিমূলকভাবে প্রভাবিত করছে এবং করবে।

আজকের আলোচনা তেমনি একটি সুবিশাল অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে যা আমাদের দেশের নতুন একটি উজ্জ্বল মুখ হয়ে দাঁড়াবে অদূর ভবিষ্যতে। সময়ের হাতছানিতেই বন্দর নগরী চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে দেশের আরেকটি মেগাসিটি। সহজ হবে তার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তৈরি হবে অসংখ্য কর্মসংস্থান। নতুনভাবে হবে সুপরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণ। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে যাচ্ছে যে বঙ্গবন্ধু টানেল তা চট্রগ্রাম বন্দর ও আনোয়ারা উপজেলাকে সড়কপথে সংযুক্ত করবে। তাতে সংক্ষিপ্ত হবে চট্টগ্রাম ও কক্সজারের রাস্তা এবং বন্দর এলাকার বিশেষ যানচলাচলের চাপ কমবে শাহ আমানত তথা কর্ণফুলী ৩য় সেতুর ওপর।

নেভাল একাডেমি ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে এই টানেল আনোয়ারা উপজেলার চার লেন রাস্তার সঙ্গে গিয়ে যুক্ত হওয়ার জন্য অতিরিক্ত ১০ কিমি. রাস্তা তৈরির উদ্যোগ ও রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু টানেল ও চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শুভ উদ্বোধন করেন। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম টানেল ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এই টানেল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ প্রায় ৩৫ শতাংশ শেষ, যার ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জোগান দেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক।

চট্টগ্রামের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৬ কিমি. ফ্লাইওভার ও ১২ কিমি র‍্যাম্প তৈরির সময়সীমা ৪ বছর। অর্থাৎ ২০২২ সাল নাগাদ চট্টগ্রাম শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম সেরা। শহরের ব্যস্ততা নিচে রেখে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে নামতে তখন সময় শুধু মাত্রই। প্রায় ২৮ কিমি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ৯ কিমি কয়েকগুণ হারে বাড়িয়ে দেবে এই বন্দর নগরীর গতি ও এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান।

পাশাপাশি আনোয়ারা উপজেলায় কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কেএএফসিও) ও সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরকৃত চায়নিজ এপিজেডের (সিএসইআইজেড) আদলে এই উপজেলা হয়ে উঠবে নগরীর তীর ঘেঁষা আরেকটি ছোট শহর। তাই এই টানেল প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেল, যার ধারণা চায়নার মেগাসিটি সাংঘাই থেকে সংগৃহীত।

চায়নার ব্যস্ততম বন্দর নগরী সাংঘাই এর প্রকল্পটিও ইকো জোন ও সুপরিকল্পিত নগরায়নের উদ্দেশ্যেই হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০০০ সালের দিকে যা এক যুগ না ঘুরতেই পৃথিবীর অন্যতম একটি ব্যস্ত ও ব্যয়বহুল শহরে রূপ নিয়েছে। এবং সারাবিশ্বে চায়নার বাজারের এত দাপট যা তৈরি হয়েছে তা সাংঘাইয়ের উন্নয়নের কল্যাণেই। যদিও প্রকল্পটি ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ নামেই করা হয়েছে এবং এই নামেই সার্বজনীন খ্যাত, কিন্তু হুয়াংপু নদীর দুই ধারের পূর্ব ও পশ্চিম সাংঘাইয়ের উন্নয়ন যোগাযোগ ব্যবস্থাই দিয়েছে সাংঘাইয়ের এই বর্তমান রূপরেখা।

একাধিক টানেলের মাধ্যমে বৃহত্তর সাংঘাইকে যুক্ত করে এক যুগান্তকারী প্রলয় এনেছে এই শহরটি। সেই ধারণা থেকেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আধুনিক শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম নগরীর আদলে আরও বিস্তর শিল্প প্রসার ও নগরায়ণকে গতিশীল করতে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে। গতিশীল উন্নয়ন ও অগ্রগতির দ্বারপ্রান্তের দরজায় যখন আমরা কড়া নাড়ছি, তখন তাকে রক্ষার্থে দরকার একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র যার প্রতিটি ক্ষেত্র থাকবে সচল ও সুপরিকল্পিত। দেশি বিদেশি উদ্যেক্তাদের আকর্ষণ করে অঞ্চলটিকে একটি ইকোনোমিক হাবে পরিণত হবে শিগগরই। কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে দেশের হাজারো যুবকের আর গড়ে উঠবে নতুন নতুন আবাসন ব্যবস্থা। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরের ওপর চাপ ও কমবে কিছুটা।

ঠিক কর্ণফুলীর মতো হুয়াংপুর সেতুও উপেক্ষা করে বানানো হয়েছিল সেই টানেলগুলো। আজ যা এই শহরের সকল কৃতিত্ব বহন করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, একদিন এই বঙ্গবন্ধু টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েই কৃতিত্ব বহন করবে পুরো বন্দর নগরীর, যুগান্তকারী সম্ভবনা নিয়ে আসবে এই দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে। ২০২২ সাল নাগাদ নির্মাণ কাজ শেষ করা হলে, পাশাপাশি চলমান পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেলসহ অন্যান্য বড় যোগাযোগ প্রকল্প, পারমাণবিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য পাওয়ার প্লান্ট এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের দ্বারা আইসিটির বিস্তর প্রসারে বিশ্বের অন্যান্য বন্দর নগরীগুলোর মতো করে, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশকে পৌঁছে দেবে উন্নয়নের শেখরে ও এসডিজি সফল হয়ে বাংলাদেশ পা রাখবে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে।  

লেখক : অর্থনীতি বিভাগ (৪র্থ বর্ষ), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড