• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

তরুণ প্রজন্মের নৈতিকতার অবক্ষয়

  মোহাম্মদ হাসান তামিম, ঢাকা কলেজ প্রতিনিধি ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১১:১১

নৈতিকতা
ছবি : প্রতীকী

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সে দেশের তরুণ সমাজ। কেননা আজকের তরুণ-তরুণীরাই আগামীর দেশ ও জাতির কাণ্ডারী রূপে আবর্তিত হবে। পৃথিবীর যে কোনো দেশকে বদলে দিতে প্র‍য়োজন দক্ষ এবং সুশিক্ষিত তরুণ সমাজ। আমাদের বাংলাদেশ ক্রমেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিনকে দিন আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত থেকে উন্নতর হচ্ছে, কিন্তু আমাদের এই তরুণ প্রজন্মের নৈতিকতার অবক্ষয় বা পদস্থলন ও সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তরুণ সমাজ এই আধুনিকায়নের ফাঁদে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য গ্রহণ, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, বিদ্বেষসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা।

ঐশির নাম নিশ্চয়ই ভুলেননি আপনারা, যে কিনা নিজের বাবা মাকে হত্যা করেছিল। ঐশির তো কোনো কিছুর অভাব ছিল না! তার পরিবার ছিল শিক্ষিত, সে নিজেও ইংলিশ মিডিয়ামের একজন শিক্ষার্থী ছিল! তারপরও কেন এমনটি হলো?

খুনের কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে ঐশী মাদকাসক্ত ছিল। সে ইয়াবা সেবন করত। এই ঘটনায় আমরা সবাই হতবাক। একি আদৌ সম্ভব। ঘটনা যতই অবিশ্বাস্য হোক বাস্তবতা হচ্ছে ঘটনাটি ঘটেছে। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যুবসমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

আজ আমরা তরুণ সমাজের নৈতিকতার অবক্ষয়ের কিছু কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব।

প্রাথমিকভাবে নৈতিকতার পর্যস্থলনের জন্য সবচেয়ে বড় একটি কারণ হচ্ছে সুশিক্ষার অভাব। আমরা তরুণরা শিক্ষিত হচ্ছি, কিন্তু সুশিক্ষা পাচ্ছি না। একটা উক্তি প্রচলিত আছে যে ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। আমাদের দেশে এখনো ৪০% নিরক্ষর মানুষ রয়েছে, এই নিরক্ষর মানুষের অনেক অংশ সঠিকভাবে শিক্ষিত না হওয়ায় তারা বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকে।

আমাদের অনেক তরুণ শিক্ষিত হওয়ার পরেও অসামাজিক কার্যকলাপ করে। এর প্রধান কারণ তারা পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হলেও সামাজিক শিক্ষায় সঠিকভাবে শিক্ষিত নয়। যার কারণে তারা মাদক এবং অন্যান্য কুকর্মে আসক্ত হয়ে পড়ে। তারপর আরও বড় ভূমিকা পালন করে বেকারত্ব। তরুণ সমাজ শিক্ষিত হওয়ার পরেও সম্মানজনক পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে না পেরে হতাশ হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। আবার বর্তমানে আধুনিকায়নের নামে আমরা আরও বর্বকার আর অশিক্ষিত হচ্ছি।

সংস্কৃতিক বিকাশের নামে অপসংস্কৃতি ধারণ করছি আর যত রকম অসামাজিক কাজ আছে তা করার চেষ্টা করছি। রাজধানীসহ দেশের কিছু জায়গায় রেস্টুরেন্টের নামে ভেতরে এক কালো দুনিয়া আছে। স্মার্ট হবার জন্য এখন তরুণ তরুণীদের মধ্যে সিগারেট বা ধূমপানের আসক্তি দিনকে দিন বেড়েই চলছে। আবার ১৬-২৫ এর কিশোররা অনেকেই সিসা নামের ভয়ঙ্কর এক মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

নৈতিকতার অবক্ষয় রোধে সমস্যাগুলোর সমাধান করা একান্তই অপরিহার্য। না হলে একের পর এক হতাশার প্রজন্ম জন্ম হবে আমাদের সমাজে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আখতারা বানু বললেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলী গড়ে তুলতে পরিবারকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা প্রতিটি মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো তার পরিবার। যেখানে বাবা, মা, পরিবার-পরিজনের প্রত্যেক সদস্যই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, সামাজিক পরিবেশ দেখে শিশুরা অনেক কিছু শেখে। এ জন্য সমাজকেও গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। এছাড়া, মূল্যবোধ সৃষ্টিতে ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। ধর্মের প্রকৃত পাঠই শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে কেউ যাতে শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাবিলা নাজ আমীন বললেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিমাণগত শিক্ষার লক্ষ্য পূর্ণ হলেও ঘাটতি রয়েছে গুণগত শিক্ষায়। তাদের কেবল পুঁথিগত বিদ্যা শিক্ষাকো দেওয়া হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের মননে শৈশব থেকেই জাগ্রত করতে হবে নৈতিকতাবোধ। এই শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হবে আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে শিক্ষকরা। শিক্ষকরা তাদের অভিভাবক হিসেবে সততা, দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা শিক্ষা দিবেন। শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত করলে এই সমাজ, মানুষ, পৃথিবী নিয়ে তাদের কোনো সম্যক ধারণা থাকবে না। শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার বড় দায়িত্ব শিক্ষকদের কাঁধে। কারণ তারা মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ভালো-মন্দ ব্যবহার এবং প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করে দিকনির্দেশনা দিতে হবে শিক্ষকদের। সর্বোপরি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতে হবে শিক্ষার্থীদের মানসে। আর এটা কারও একার নয়, বরং সবার দায়িত্ব। সরকার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিবার এবং সমাজের মানুষকে একত্রিত হয়ে সমকালীন বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে হবে।

সর্বোপরি এই তরুণ প্রজন্মকে ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নৈতিক ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশের মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে একটি শক্ত ভিত গড়ে তুলতে হবে। ফলে তারা বিপথগামী হওয়া থেকে বিরত থাকবে। সেইসঙ্গে তাদের মননশীলতার বিকাশ ও ঘটবে। আমরা স্বপ্ন দেখি এক উন্নত সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের যেখানে তরুণ তরুণীরা তাদের নৈতিকতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে রোল মডেল হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

ওডি/আরএআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড