• রবিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঘোড়ার আগে গাড়ি!

  সাব্বির আহমেদ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:০০

উন্নয়ন
সাব্বির আহমেদ (ছবি : সম্পাদিত)

আজব এই পৃথিবীর আজব সব নিয়ম-কানুন, তার থেকেও বড় আজব মানুষ নামক দু’পায়ী প্রাণি। পৃথিবীর আয়তন যতবড় তার থেকেও ঢের পরিধির অধিকারী এই মানুষ। জীবন নামক রেলগাড়ির হাজারো বাঁকে হাজারো গল্পের সাক্ষী এই মানুষই। এই ছুটে চলার পথে অন্যান্য প্রাণি গোষ্ঠীর থেকে মানুষ অনেক উর্ধ্বে সে কথা নির্বিঘ্নে বলা যায়।

এই গতিময়তায় সময়ের সঙ্গে আপোসে লিপ্ত হতে খুব কমই দেখা গেছে মানুষকে। কখনো সময়ের সঙ্গে তো কখনো সময়ের থেকে একধাপ এগিয়ে ভুবন জয়ের নেশায় লিপ্ত হয়েছে মানুষ। আর তখনই ভুবনের ভুলে ভারাক্রান্ত হয়ে প্রতিবারই হারিয়েছে তার গৌরব।

হারানো গৌরব খুঁজে পাওয়ার কোনো বৃথা চেষ্টাও এখন মানুষের মস্তিষ্কের আওতার বাহিরে। সবাই যখন জীবন নামক যুদ্ধে বোকার মতো নিজের বিজয়টাকে আসল বিজয় হিসেবে গণ্য করে, তখনই মানুষ হারায় তার দূরদর্শিতা। র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো কোনো উপহারও মানুষ একটি বারের জন্য হলেও খুলে দেখে ভেতরে কী আছে, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার থেকে পাওয়া আমাদের এই জীবন যে এক অমূল্য উপহার তা আমরা কখনো অনুভব করি না, আর জীবন নামক উপহারের র‍্যাপিং খুলে দেখা তো দূরের কথা।

আমাদের বর্তমান অবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, খুঁটির গোড়ায় মাটি নেই। এটা বেশ কয়েক বছর আগে থেকে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। দেশের সচেতন সমাজ এমনকি শিক্ষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই অনাকাঙ্ক্ষিত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের।

আজকের লেখা মূলত ঘোড়ার আগে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলা কাল্পনিক এক বাস্তবতার গল্পে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের কিছু সমস্যার সংক্ষিপ্ত আলোকপাত। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড আজও তার কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেকাংশেই পিছিয়ে। পিছিয়ে পড়ার মূল কারণটা আমাদের মতো দু’পায়ী মানুষেরাই। আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হলেও আমাদের কর্মকাণ্ডগুলো দেখে মনে হয় যেন সৃষ্টির সর্ব নিকৃষ্ঠ কার্যে লিপ্ত আমরা।

আর যখন মানুষের এই আচরণ পরিবর্তনের জন্য নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তখন ঘটে উল্টো ঘটনা। কারণ আমরা সমস্যা নির্দিষ্ট না করেই সমাধান দিয়ে থাকি। সমস্যার প্রকৃত কারণ না জেনেই যদি আপনি সমাধান দিয়ে থাকেন তবে তা কখনোই যথোপযুক্ত হবে না। সমস্যা নির্দিষ্টকরণের পরে প্রকৃত বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে সমাধান দেওয়া হয় সেটা অবশ্যই কার্যকরী হবে, কিন্তু দুভার্গ্যের বিষয় হলো আমরা সমস্যা দেখলেই হুটহাট কোনো সমাধান দিয়ে দেই এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় সমস্যার সঙ্গে সমাধানের বিন্দুমাত্র মিল নেই।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক তাহলে। আমার নিজের বাসস্থানের অবস্থা বেগতিক হইলেও গাড়ি রাখার জন্য একটা ঘর তৈরি করলাম। অথচ আমার কোনো গাড়ি নেই বা গাড়ি কেনার মতো কোনো সামর্থ্য নেই। গাড়ি রাখার ঘর তৈরি করলে কী আমার গাড়িতে ভ্রমণ হয়ে যাবে? আরেকটা সহজ উদাহরণ দিই,আমি বাজার থেকে দুধ রাখার একটা পাত্র কিনলাম, কিন্তু আমার গাভীও নেই বা গাভী কেনার টাকাও নেই, অথচ আমি জানি দুধ একটি আদর্শ খাদ্য। তাই দুধ কেনার পাত্রটা কিনলাম। তবে কি আমার দুধ খাওয়া হবে? আদর্শ খাদ্য কি খাওয়া হবে আমার?

আমাদের বর্তমান অবস্থাও ঠিক একই রকম। বর্তমানে আমাদের যেই বিষয়টা প্রয়োজন সেই দিকে দৃষ্টিপাত না করে আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে বেশি দৃষ্টিপাত করতে ব্যস্ত। একটা দেশের/ মানুষের উন্নয়নের জন্য অবশ্যই অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু তাই বলে আমাদের মূল লক্ষ্য ব্যহত করে এই উন্নয়ন আমাদের জন্য হিতের বিপরীত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলএক্সের মতে, ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হারে এখন গর্বের সঙ্গে শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এই শীর্ষে থাকার তকমা আমাদের জন্য কতটা গর্বের তা আমরা নিজেরাও নির্ণয়ে একরকম ব্যর্থ। এই শীর্ষ স্থান দখল আমাদের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ তা একটা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ওয়েলএক্সের গবেষণায় দেখা যায়, ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১৭.৩%, যেখানে ৮.১% প্রবৃদ্ধি নিয়ে তালিকার ১০ম স্থানে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের মোট প্রবৃদ্ধি যেখানে ৭.৩% সেখানে এই ১৭.৩% প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য অভিশাপই বটে।

সম্প্রতি, প্রকাশিত গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে (২০১৮) বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার সবচেয়ে নিচে অর্থাৎ আমার দেশটি হলো উদ্ভাবনে সবচেয়ে পিছিয়ে। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এমনকি নেপালও আমাদের চেয়ে এগিয়ে।

ঘোড়ার আগে গাড়ি না চালিয়ে সময়োপযোগী যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। চকচক করলেই যেমন সোনা হয়না ঠিক তেমনি একটা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কখনোই একটা দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি নয়।

ছুটে চলা গাড়ির চালক যেমন পেছনের আসনে বসে গাড়ির সঠিক গতিপথ নির্ধারণ করতে পারেন না ঠিক তেমনি আমরা আমাদের প্রকৃত সমস্যার বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে সমাধান দিয়ে সাফল্যের আশা করতে পারি না। দেশের বর্তমান অবস্থায় দেশের জনগণ যে কোনো অংশে কম দায়ী নয় তার কোন সন্দেহ নেই। বিষয়টি সকলের নজরে এলেও সুনজরে আসেনি। তাই ভবিষ্যত বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলকে সতর্কতার সহিত সমস্যার মোকাবিলা করে জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে হবে।

লেখক : বায়োটেকনোলজি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড