• রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

হারকিউলিস : লাগামহীন ধর্ষণ এবং তার সিনেমাটিক পরিণতি

  অধিকার ডেস্ক    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:০২

মো. আসাদুল্লাহ শাকিল
মো. আসাদুল্লাহ শাকিল

নতুন বছর নতুনভাবে শুরু করার আগে দেশবাসী স্তম্ভিত হয়ে যায় নোয়াখালীর সুবর্ণচর গ্রামের গণধর্ষণের ঘটনায়। ভোটের দিন রাতে স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে গণধর্ষণ করা হয়, একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দেয়ার কারণে। এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল কয়েক সপ্তাহ।

সুবর্ণচরের রেশ কাটতে না কাটতে নোয়াখালীরই কবিরহাটে জেলে থাকা বিএনপির এক কর্মীর স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে। নারীটির তিন সন্তানকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করে তাদের মধ্যে একজন যুবলীগের নেতা ছিল। তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের ক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য তারা খুন ধর্ষণ করে, যা সাধারণত বলিউড বা ঢালিউডের বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যপটে দেখা যায়। তবে আমরা বর্তমানে এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন। যদিও রাজনৈতিক দলগুলি তাদের দল থেকে অতি দ্রুত এসব আসামীদের বহিষ্কার করে। তাদের পুলিশ রিমান্ডে নেয়ার পর মনে করা হয়েছিল ধর্ষণের ঘটনা কম হবে। বাস্তবে এ ভাবনাটার বিপরীত ফল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

৩১ জানুয়ারী ২০১৯ বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা শাখা থেকে প্রাপ্ত, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক প্রত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তি করে একটি জরিপ করে যাতে জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের সংখ্যা চল্লিশ। এর মধ্যে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয় দশ জনকে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তিন জন নারী। শিশুধর্ষণ ও গণধর্ষণ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই প্রথম পৃষ্ঠায় দুইয়ের অধিক ধর্ষণ আর যৌন নিপীড়নের প্রকাশ করা হয়। ধর্ষণের কালো হাত থেকে তিন মাসের শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউ বাদ পড়ছে না। স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে ধর্ষণের মত ঘটনা কমই ঘটেছে স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে।

নোয়াখালীর দুইটি ঘটনায় রাজনৈতিক নেতা জড়িত থাকার জন্য বেশি সমালোচিত হয়েছিল। কিন্তু মৌলভীবাজারে অপহরণের ২০ দিন পর একটি মেয়েকে পাওয়া যায়, যে দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়েছিল। ফেনী শহরে চার তরুণীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করার অভিযোগ পাওয়া যায়। এই ঘটনা নিয়ে তেমন আলোচনা, মানববন্ধন করা হয়নি। তিন মাস বয়সী শিশু, দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ধর্ষণ, লিপস্টিকের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা, বাংলাদেশের জন্য এসব শুধু সাধারণ ঘটনা নয়।

স্বাধীনতার প্রায় চার যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশের জনগণ আজ চরম বাস্তবতার সামনে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল ৫ বছরে ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩,৫৮৭টি যার মধ্যে ২০১৮ সালেই ঘটেছে ৭৯৮টি। ধর্ষণে শিকারদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ শিশুকিশোর যাদের বয়স ৭-১৮ এর মধে। ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার হয়েছে তিন ভাগের দুই ভাগ শিশুকিশোর (সূত্র : আইন ও সালিশ কেন্দ্র)।

বাংলাদেশে যৌন নিপীড়ন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো অপসংস্কৃতি, আকাশ সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ। এছাড়াও রয়েছে ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক চোরাচালান, মাদকের সহজলভ্যতা ইত্যাদি। পাশাপাশি অশ্লীলতার আগ্রাসনে মানুসের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়ের বড় প্রভাব রয়েছে। স্মার্টফোনের অধিক ব্যবহার, ইন্টারনেটের অপব্যবহার ও পর্নসাইটে সহজে এক্সেস তরুণ সমাজকে সহজে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। সামাজিকীকরণে ঘাটতি, পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব তরুণদের মানসিকভাবে বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ হল বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা। একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইব্যুনালে ২০০২ সাল থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মামলা হয়েছিল ৭ হাজার ৮৬৪টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪ হাজার ২৭৭ টি। সাজা হয়েছিল মাত্র ১১০ টি মামলার। অর্থাৎ বিচার হয়েছে ৩ শতাংশের কম। বাকি ৯৭ শতাংশ হয়তো খালাস পেয়েছে অথবা মামলা চলাকালীন মারা গেছে।

বর্তমানে মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা অনেকেই পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। অধিকাংশ আসামিদের ধরতে পারে না। তবে জানুয়ারী থেকে এ পর্যন্ত তিনজন ধর্ষকের লাশ পাওয়া যায় চিরকুটসহ। সাভারে ৫ জানুয়ারীতে পাওয়া যায়। এরপর আরও দুটি লাশ পাওয়া যায় তারা পিরোজপুরের মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণের আসামি। যদিও এসব আসামি পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।

এসব চিরকুটে লেখা ছিল “আমি অমুকের ধর্ষক, ধর্ষকের শাস্তি এরকম হয়’’। তবে সর্বশেষ যে লাশ পাওয়া যায় তাতে হারকিউলিস ছদ্মনামে হত্যাকারী ধর্ষকদের সাবধান করেছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে পুলিশ যেখানে ব্যর্থ, হারকিউলিস সেখানে সফল, তাহলে কি হারকিউলিসকে সঠিক মনে করবে? ধর্ষকদের গুহা থেকে বের করে মারছে সে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশিরভাগ মানুষ হারকিউলিসকে বাহবা দিচ্ছে।

“আমরা আপনার পাশে আছি হারকিউলিস, আপনি এগিয়ে যান!’’, “সে যা করছে ভাল করছে।’’ কেউ কেউ তাদের ফেসবুক পেজে বলছে বাংলাদেশে গাব্বার ইজ ব্যাক। একটি ফেসবুক শেয়ারে দুই বা তিন হাজারের অধিক কমেন্টে বেশিরভাগ কমেন্ট হারকিউলিস এর পক্ষে। বলিউডের একটি জনপ্রিয় মুভি গাব্বার ইজ ব্যাক।

গাব্বার ভারতের বিভিন্ন বিভাগে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে এবং অডিও ক্যাসেটে দুর্নীতিবাজদের হুমকি দেয়। যেন অন্যরা তাকে দেখে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতি না করে, ভয়ে অনেকে দুর্নীতি ছেড়ে দেয়। তার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সাধারণ মানুষ সমর্থন করেছিল। যদিও এটা আইন বিরোধী।

হয়তোবা কেউ বা কোনো গ্রুপ গাব্বারকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এসব করতে পারে গ্রিক পুরানের বীর হারকিউলিসের ছদ্মবেশে। সে হয়তো চায় বাংলাদেশ থেকে ধর্ষণ নিঃশেষ করতে। তার ভাবনায় থাকতে পারে আইনব্যবস্থা কিছুই করতে পারছে না, সে নিজে ঠিক করতে চায়। এটা আইনবিরোধী কাজ। কিন্তু দেশের মানুষজন এটা গ্রহণ করছে। হারকিউলিসকে মানুষ সমর্থন করছে এটা দেখে আরও নতুন হারকিউলিস জন্ম নিতে পারে। তখন দেশের আইন-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে? তাহলে হারকিউলিসকে রুখতে হবে, কীভাবে?

শ্রেণি, বর্ণ, দল, মত সবার উর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত করতে হবে। ধর্ষকদের আশ্রয়দাতা ও সহযোগিতাকারীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ধর্ষণ বাড়ছে, এগুলি যাতে দূর হয় সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করলে এর হার কমবে।

একটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দুইটি যৌন নিপীড়নের ঘটনার সাথে লাল অক্ষরে মোটা করে শিরোনামে যদি থাকে ধর্ষণের কারণে দুইজন আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে তাহলে এ নির্লজ্জ ঘটনার হার দিন দিন কমবে। তাহলে আর দেশে হারকিউলিসের জন্ম হবেনা। বাংলাদেশ ধর্ষণের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে।

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, দৈনিক প্রথম আলো প্রত্রিকা, দৈনিক যুগান্তর প্রত্রিকা। লেখক : মো. আসাদুল্লাহ শাকিল, শিক্ষার্থী -৩য় বর্ষ, অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড