• রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন

ডাস্টবিনে নবজাতক, ধর্ষণের শিকার শিশু, নিশ্চুপ আমরা

  অধিকার ডেস্ক    ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৪২

ধর্ষণ
ছবি : সম্পাদিত

আজকাল পত্রিকার পাতা উল্টাতে কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টাল ভিজিট করতে ভীষণ ভয় লাগে আমার। সবখানেই শিশু ধর্ষণ, নবজাতকের লাশ খুঁজে পাওয়া, শিশু হত্যার খবর। ধর্ষণ কিংবা গর্ভপাত যেন এখন বেশ স্বাভাবিক বিষয়। ভয় হয়, কবে ঘুম থেকে জেগে শুনবো আমারই কোনো পরিচিত শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। কিংবা হতেই পারেই আমার মায়ের বয়সী কারও ওপরই পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ভেসে উঠবে চোখের সামনে। 

গত ৭ জানুয়ারির কথা, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা খবরগুলো হলো- রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় দুই বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর তিনতলা থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার অভিযোগ, ৬ তারিখ রাতে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে প্রতিবেশী যুবক জয়দেব, গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে ৪ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশির বিরুদ্ধে, সাভারে এক পোশাক কর্মীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। 

একদিনের ব্যবধানে ৪টি প্রাণ, ৪টি ধর্ষণ। ভাবতে পারেন, দুই বছরের একটি শিশুও রক্ষা পায়নি ধর্ষকের হাত থেকে। তার শরীরের কি খুব বেশি নারী চিহ্ন ফুটে উঠেছিল যা ধর্ষককে উত্তেজিত করেছিল? কিংবা দোষ ছিল তার পোশাকে? কী অপরাধ ছিল ৪ বছর বয়সী কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া পবিত্র শিশুগুলোর? 

ধর্ষণ শব্দটি এখন আমাদের খুব পরিচিত। আচ্ছা, আপনার ছোট্ট সন্তানটি যদি আজ বাদে কাল আপনার কাছে জানতে চায়, ‘মা, ধর্ষণ কী?’ কিংবা যদি বলে ‘বাবা, ছোট্ট বাবুটাকে কী করেছে?’— কী উত্তর দেবেন আপনি? হয়তো সচেতন মা-বাবা হিসেবে ‘তুমি এখনও এসব বোঝার মতো বড় হওনি’ বলে এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু আপনার কন্যা সন্তানটি কি পুরোপুরি সুরক্ষিত ধর্ষকের কবল থেকে? আপনার ছেলে সন্তানটি বছর কয়েক পর যে ধর্ষক হবে না তার নিশ্চয়তা দেবে কে? 

এই সমাজে ধর্ষণের স্বীকার হয়ে বেঁচে থাকার চাইতে বড় লজ্জার বিষয় আর কিছুই নেই। পরিবারের মানুষগুলোই হয়তো বলে বসেন, ‘তুই গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারলি না হতভাগী’। পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে বিচার চাইলেও খুব একটা লাভ হয় না। হয়তো কিছু অর্থের বিনিময়ে সব সমাধান হয়। অতঃপর, ঘরের কোণে দুমড়ে মরে ধর্ষিতা আর বুক ফুলিয়ে রাজপথে চলে ধর্ষক! কী দারুণ প্রহসন! 

এবার আসা যাক, দ্বিতীয় বিষয়টিতে। কদিন পরপর ডাস্টবিনে নবজাতকের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া এখন নিত্য দিনের খবর। গতকাল আমরা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রী গতকাল আমাকে বলল, ‘পেপারে দেখেছি, ডাস্টবিনে একটা ছোট্ট বাবুকে পাওয়া গেছে, একটা কুকুর খুঁজে পেয়েছে ওকে। আচ্ছা ও কি দুষ্টুমি করেছিল? ওর মা ওকে বকা দিলেই তো হতো, ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে কেন? আম্মুরা তো ভালো হয়, তাহলে ওর আম্মু এমন করল কেন?’ 

আমি বেশ কিছুটা সময় স্তব্ধ হয়েছিলাম। যেই আমি ওকে শিখিয়েছি মায়েরা সন্তানদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, সেই আমি কী উত্তর দেব ওর প্রশ্নগুলোর। দুদিন বাদে যদি এই বাচ্চা মেয়েটাই আমাকে প্রশ্ন করে বসে, ‘আচ্ছা মিস, ধর্ষণ কী?’ তবে কী জবাব দেব আমি? 

ভালোবাসার প্রেক্ষাপটে এখন শারীরিক সম্পর্ক খুব স্বাভাবিক বিষয়। অনৈতিক সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা অতঃপর একটি তাজা প্রাণের মৃত্যু। অথচ একটি সন্তানের জন্য প্রতিদিন চোখের জল ফেলছে কতই না দম্পতি। নিজের ভালোবাসার গভীরতা বাড়াতে গিয়ে একটি জীবন কী করে শেষ করে দিচ্ছেন আপনারা? আপনাদের মা-বাবারা যদি একই কাজ করতো তবে কি দেখতে পেতেন এই পৃথিবীর আলো? 

আর কত নবজাতকের লাশের খোঁজ মিললে জাগবে আমাদের বিবেক? ধর্ষণের তালিকায় আর কটি শিশুর নাম যুক্ত হলে থামবে এই অরাজকতা। কবে আমরা একটু নিশ্চিন্ত ঘুমাতে পারব? কবে নিশ্চিত হবে কন্যা শিশু কিংবা ৪ সন্তানের জননী একজন মায়ের যৌন সুরক্ষা? প্রশ্নগুলো জবাব দেবে কে? 

লেখক : নিশীতা মিতু। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড