• বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্মার্ট শহর : নগরায়নে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার

  মো. জাহাঙ্গীর আলম ৩০ মে ২০১৯, ১৬:০১

স্মার্ট শহর
ছবি : প্রতীকী (ইনসেটে লেখক অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম)

শহরাঞ্চল একটি জাতির অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি এবং নানা উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ শহরে বসবাস করে। এছাড়া, বিশ্বব্যাপী অর্জিত মোট জিডিপির শতকরা ৮০ ভাগ জিডিপি অর্জিত হয় শহরাঞ্চল থেকে, কিন্তু ভারসাম্যহীনভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ন বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণ শহরগুলোর জীবনযাত্রা ও গুণগত মান হ্রাস করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বৃহত্তর শহরগুলো অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের ফলে বতর্মানে অনেকাংশে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে হলে শহরগুলোকে উন্নত বিশ্বের স্মার্ট শহরগুলোর মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত কাঠামোর ভিত্তিতে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

স্মার্ট শহর এমন একটি আধুনিক শহর যা নগরের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবহার করে। সুতরাং সহজ ভাষায় বলতে স্মার্ট শহর হচ্ছে টেকসই পরিকল্পনা, নির্মাণ, পরিচালনা ও সেবার একটি নতুন ধারণা ও পদ্ধতি যা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেটের তথ্যাবলী (আইওটি), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ভৌগলিক তথ্য (জিআইএস) ব্যবহার করে শহরের নাগরিকদের উন্নত সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আধুনিক স্মার্ট শহরগুলো তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই সামজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। একইসঙ্গে শহরে বসবাসরত নাগরিক ও কর্মজীবি মানুষের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি করে। উন্নত দেশগুলোর স্মার্ট শহরে একটি টেকসই সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো থাকে। যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় কমায়, নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর ব্যবহার সাশ্রয়ী করে।

একটি স্মার্ট শহর কেমন হবে সেটা ঐদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ধারা, জনগণের পরিবর্তন করার ইচ্ছা, শহরে বসবাসকারীদের সম্পদ ও আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করে। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি স্মার্ট নগরী অবশ্যই আমেরিকা, জাপান বা ইউরোপের যেকোনো স্মার্ট নগরী থেকে ভিন্ন হবে। বাংলাদেশের শহরগুলো খুব দ্রুত, কিন্তু অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ শহরে বসবাস করে। ২০৪০ সালের ভেতরে দেশের শতকরা ৫০ ভাগ মানুষ শহরে বসবাস করবে। সঠিক পরিকল্পিত নগরায়ন না হলে ভয়াবহ পরিবেশ ঝুকি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখন থেকে শহরগুলোকে স্মার্ট শহরে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তুলতে হবে।

আমাদের স্মার্ট শহরের প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থাপত্যবিদ ও প্রকৌশলীদের একসঙ্গে সমন্বিতভাবে স্মার্ট নগরের একটি নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। যেখানে শহরের প্রাতিষ্ঠানিক, অবকাঠামোগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক এই চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে শহরগুলোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে সকল উপজেলার জন্য একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে তুলতে বলেছেন। পরিকল্পনাটির মূল লক্ষ্য আবাদি জমি রক্ষা করার পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা ভবন, সড়ক ও অন্যান্য কাঠামোকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভেতরে নিয়ে আসা। স্মার্ট শহর তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য হলো- টেকসই ও পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নাগরিকদের উন্নত জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়া। নিত্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধান করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গঠন করা।

একটি শহর স্মার্ট শহরের নাগরিকদের জন্য কিছু বিশেষ সুবিধা প্রদান করতে হবে। শহরে পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ থাকবে। সরবরাহ ব্যবস্থা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতে স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে পানির ব্যবহার পরিমাপ করার সুবিধা থাকবে। সেন্সরের পানির গুণগতমান ও সঞ্চালন লাইনে কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা সেটি নির্ণয় করতে হবে। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চত করা হবে যা অত্যাধুনিক গ্রিড সিস্টেমের মাধ্যমে সঞ্চালিত হবে। স্মার্ট শহরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ করার জন্য কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রিপেইড মিটার, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবস্থা করা হবে। স্মার্ট শহরে অগ্নি নির্বাপনের সুব্যবস্থা থাকবে।

শহরে একটি উন্নত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং কঠিন বর্জ্য পরিশোধনাগারও থাকবে যেখানে আবর্জনা থেকে শক্তি উৎপাদন করা হবে। মানববর্জ্য এমনভাবে পরিশোধন করতে হবে যেন পরিবেশের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকবে। ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম ও উন্নত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিশ্চিত করা হবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য মানসম্মত আবাসিক ভবন থাকবে। এছাড়া, উন্নত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে যেমন- টেলি মেডিসিন, দূর শিক্ষা ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হবে। সুশাসন, বিশেষ করে ই-গভর্নেস ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে নদী, বাতাস ও শব্দদূষণ রোধ করা হবে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সর্বোপরি তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে যা আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব তথা তথ্য ও প্রযুক্তির শিল্পায়নে টিকে থাকতে সহায়তা করবে।

এ সকল সুবিধা নিশ্চিত করতে চাইলে আমাদের যে সকল ধাপ মেনে কাজ করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সাহায্যে নাগরিকদের জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ও তাদের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। স্মার্ট নেশন সেনসর প্লাটফরম (এসএনএসপি)- সিসিটিভি ও ভিডিও ক্যামেরা ও স্ট্রিট লাইটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে দূরবর্তী হাসপাতালের সেবাসমূহ গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। সমন্বিত অনলাইন ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, দেশব্যাপী ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার কোডিং, প্রোগ্রামিং ও রোবটিক্স শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। মোবাইল এপসের মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান করতে হবে। পানি পরিশোধন ও বর্জ্য পরিশোধন করার জন্য উদ্ভাবনমূলক প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে। যেমন : মেমব্রেন প্রযুক্তি ও লবণাক্ততা দূর করা। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস থাকবে যেখানে সরাসরি কথোপকথন ব্যবস্থা থাকবে।

স্মার্ট শহর পরিকল্পনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের একটি সাহসী উদ্যোগ। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি নতুনত্বের উদাহরণ তৈরি করবে। স্মার্ট শহর গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে পুরোনো শহরগুলোর বিদ্যমান ভবন ও অবকাঠামোগুলোকে ক্রমবর্ধমানভাবে উন্নত করা যেতে পারে, যা একপর্যায়ে শহরগুলোকে ‘স্মার্টনেস’ এরপর্যায়ে নিয়ে যাবে। স্মার্ট নগরী হিসেবে যে শহরগুলো গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে সেসব শহরে দুই ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন, যথাক্রমে বর্তমান শহরের উন্নয়ন এবং শহরের চারপাশে পরিকল্পিত সম্প্রসারণ।

শহর সম্প্রসারণের সময় আবশ্যই শহরের চারপাশে পর্যাপ্ত সবুজের বেস্টনি রাখতে হবে। বিদ্যমান শহরের পুননির্মাণের ক্ষেত্রে ৫০০০ একরের অধিক একটি বড় এলাকা নির্ধারন করতে হবে। নির্ধারিত এলাকার বিদ্যমান অবকাঠামো, পরিবেশগত অবস্থান ও আদিবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে এলাকাটি আধুনিকায়নের কলাকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ঐ শহরের বেশিরভাগ কাঠামো অক্ষত থাকবে তাই অবকাঠামোভাবে বেশি স্মার্ট সেবা দিতে হবে। যেমন উন্নত পয়নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ, প্রতিটি রাস্তায় ডিজিটাল সিগনাল, পথচারীদের হাটাচলার জন্য প্রস্থ ফুটপাথ, সিসিটিভি ভিডিওর মাধ্যমে অপরাধ পর্যবেক্ষণ, উন্নত গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে শহরের চারপাশে সম্প্রসারণের জন্য নীতিনির্ধারক, বুদ্ধিজীবি, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী ও স্থাপত্যবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করতে হবে। যেখানে সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত পরিবেশ, জননিরাপত্তা, উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা ও উপগ্রহ ব্যবহার করে সড়কের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

অপরিকল্পিত শহরগুলোকে স্মার্ট শহরে রূপান্তর করতে চাইলে এখন থেকেই জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে, সামাজিক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি একটি সুন্দর ও আধুনিক শহর গড়ে তুলতে সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব শহরকে স্মার্ট শহরে রূপান্তর করার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

লেখক :  অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড