• বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় ভুগছেন কৃষক

আমি একজন কৃষকের সন্তান বলছি

  ইঞ্জিনিয়ার মো. ফিরোজ আলী ০৪ মে ২০১৯, ২১:৫১

সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

২০১৯ সালের ১২ এপ্রিল মাননীয় খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার নওগাঁ জেলার বদলগাছী থানায় খাদ্য গুদাম উদ্বোধন করার সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে, এবারে ধানের দাম বৃদ্ধি পাবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন প্রতি বছরের তুলনায় এবার এক মাস আগে সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা শুরু করবে। যাতে করে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পায়। খবরটা টিভিতে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার বোধ হয় কৃষকদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে যাচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অন্য রকম। বাংলায় যেটাকে বলে যেই লাউ সেই কদু। ইরি ধান কৃষকের ঘরে ঘরে উঠতে শুরু করেছে। প্রতি মণ ধানের দাম কত করে জানেন? মাত্র ছয়শ টাকা। তারমানে এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষক এক কেজি খাসির মাংসও কিনতে পারবে না। মাংসের কথা বলছি কেন! তারা তো দুবেলা ঠিকমত ডাল ভাতও খেতে পায় না। ২০০৯ সালের দিকে কৃষকেরা ধান বিক্রি করত প্রায় ৮০০ টাকা প্রতি মণে। আর ২০১৯ সালে বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ টাকা মণ। ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সে হিসেবে ধানের দাম না বাড়ায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতি বছর। এই কঠোর পরিশ্রমী কৃষকদের পেটে লাথি মেরে চলা কোন সভ্য জাতির আচরণ হতে পারে না। আমার মনে হয় এদের উপর এমন নির্যাতন হয়তো সৃষ্টিকর্তাও মেনে নেবেন না। 

আজ মোট কৃষকের ৯৫% কৃষক রাগে ক্ষোভে কাঁদছেন। প্রত্যেকটা দ্রব্যমূল্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের কষ্টে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য কোথায়? এভাবে আর কতদিন চলবে? 

চলুন দেখে নেই ৩৩ শতাংশ জমিতে ধান উৎপাদনের খরচ ও আয় কেমন-

৩৩ শতাংশে ধান উৎপাদন খরচ (ছবি : সংগৃহীত)

যাই হোক, অনেকে হয়তো বলতে পারেন তাহলে চালের দাম এত বেশি কেনো! কৃষকরা ধান থেকে চাল তৈরি করে বিক্রি করলেই হয়! আপনি কি জানেন ধান থেকে কিভাবে চাল তৈরি হয়? অটো রাইস মিলের কথা বাদ দিলে ম্যানুয়ালি বড় বড় চুলার প্রয়োজন হয় ধান সিদ্ধ করার জন্য। তারপর সিদ্ধ ধান দুই–তিন দিন ধরে শুকানোর জন্য বড় বড় চাতাল (ধান শুকানোর জায়গা) এর প্রয়োজন হয়। এরপর ভালোভাবে শুকানোর পর সেটাকে মিলে ভাঙতে হয়। এর মধ্যে প্রতিকূল আবহাওয়ার উপদ্রব তো আছেই। এই সমস্ত কাজ করার জন্য অনেক লেবার দরকার হয়। যেটা বৃহৎ পরিসরে একজন গরীব কৃষকের পক্ষে সম্ভব নয়। 

কৃষকদের বড় সমস্যা তাদের কোন সংগঠন নেই। যদিও নামে মাত্র দুই একটা সংগঠন আছে সেগুলোর কার্যক্রম প্রায় অকেজো বললেও ভুল হবে না। যত অত্যাচার কৃষকের উপর। মজার বিষয় হল যতই কষ্ট হোক না কেন কৃষক সম্প্রদায় সরকারি চাকুরিজীবীদের মত ধর্মঘট বা কর্মবিরতি পালন করতে পারে না। তারা প্রেসক্লাবে এসে মানববন্ধন করতে পারবে না, গার্মেন্টস শ্রমিকদের মতো রাজপথে আসতে পারবে না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এদেশের প্রধান খাদ্য ভাত। সরকারি চাকুরীজীবীরা কর্মবিরতি পালন করলেও বেতন নিতে ঠিকই কুণ্ঠাবোধ করে না। এদিকে প্রচণ্ড রোদে গরমে মাঠে ফসল ফলাতে যে কি রকম কষ্ট হয় সেটা একজন কৃষকই ভাল জানেন। 

আমি একজন কৃষকের সন্তান হাওয়ায় তাদের কষ্টটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। ছোট বেলায় নিজ হাতে অনেক কৃষি কাজ করেছি। যদিও আমি এখন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আল্লাহর রহমতে কৃষির উপর আমার পরিবারকে আর নির্ভর করতে হয় না, তারপরেও কৃষকদের সেই কষ্টগুলো এখনো হাড়ে হাড়ে অনুভব করি। ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ্রপাত শুরু হলে আপনি আপনার ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকেন। কিন্তু কৃষকদের কথা চিন্তা করেন। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা বজ্রপাত কোন কিছুতেই তাদের ঘরে বসে থাকলে চলে না। তাদের এতো পরিশ্রম শুধুমাত্র আমাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য। বিনিময়ে তারা তাদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে কি? 

যুগ যুগ ধরে কৃষকেরা অবহেলিত। শুনেছি প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রতিবছর বহু কৃষক আত্মহত্যা করে। আমার মনে হয় বাংলাদেশেও সেদিকে এগোচ্ছে। কৃষকেরা অনেকের মত ব্যাংকের ঋণ নেওয়ার পর নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারে না, শেয়ারবাজারে ফটকাবাজি করতে পারে না, সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে পারে না, বিল্ডিং বানাতে গিয়ে রডের বদলে বাঁশ দিতে জানে না। তারা শুধু তাদের কষ্টে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য চায়। দুমুঠো ডাল ভাত খেয়ে পরে বাঁচতে চায়। কৃষককে মেরে শুধু বসে বসে জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) ক্যালকুলেশন করলে দেশ উন্নত হয় না। কৃষকের দিকেও সুনজর দেওয়া প্রয়োজন। আমি অনুরোধ করবো বাংলাদেশ সরকার অতি সত্বর যেন এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ওডি/এমএ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড