• শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

কেমন আছে বাংলাদেশ : অর্থনীতি প্রেক্ষিত (পর্ব: ৩)

  জুবায়ের আহাম্মেদ ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০৮:৫৩

শিল্পখাত

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে নতুনভাবে। কৃষিপ্রধান দেশটির সিংহভাগ আজ চলে যাচ্ছে শিল্পখাতের উন্নয়নে। স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে অবহেলিত শিল্পখাত এখন অর্থনীতির বড় অঙ্গ হতে চলেছে। শিল্পখাতের এই উত্থান, পরিসংখ্যানের নানা দিক, সম্ভাবনা এবং বাস্তবতা নিয়ে অর্থনীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ৩য় পর্ব।

শিল্পখাত এবং বাংলাদেশ

স্বাধীন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত যতটা ক্ষতি দেখা গিয়েছিল তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ছিল সম্ভবত শিল্পখাতেই। একটা জিনিস বলে রাখা ভাল, স্বাধীন বাংলাদেশে অবাক করা ব্যাপার হলেও সবচেয়ে ভাল অবস্থানে ছিল কৃষিই। প্রচুর জমি আবাদযোগ্য ছিল। এবং সে সময় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে স্বাধীনতাপূর্ব শ্রমিক শ্রেণীও শিল্পক্ষেত্রে ফিরে যাবার চেয়ে কৃষিতেই অধিক মনোযোগী হতে চেয়েছে। যার ফলাফল আমরা তৎকালীন অর্থনীতিতে দেখতে পাই।

স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী দশকে দেশের অর্থনীতির বড় অংশ, বলতে গেলে প্রাত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জুড়ে ছিলো কৃষিখাত। কিন্তু ৮০’র দশকে এসে প্রথমবার দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করে শিল্পখাত। ১৯৮০ সালের দেশের জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান ছিল ১৬ শতাংশ যা নিয়মিত বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৩.৩৩ শতাংশে উপনীত হয়।

এখানে উল্লেখ করার ব্যাপার হলো, শিল্পখাতে উন্নতির ধারারেখা বা গ্রোথ রেট সবসময়ই কৃষি থেকে বেশি ছিলো। দেশের উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের সবসময়ই বড় একটি বিনিয়োগ ছিল শিল্পোন্নয়নের প্রতি। সেকারণেই ৮০’র দশকে কৃষি ব্যাপক প্রচলিত হলেও যেখানে কৃষি উন্নয়ন ছিল ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, বিপরীত দিক থেকে শিল্পখাতে উন্নয়নের ধারা ছিল ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এক দশক পর যা দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ০৬ শতাংশে।

শিল্পখাতের অতীত ও বর্তমান

শিল্পখাতের কথা বলতে গেলে বলা যায়, এদেশের সাপেক্ষে শিল্পখাতের ব্যাপক উন্নয়ন দেখা গিয়েছে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে। সেবছর দেশের মোট জিডিপির ২৮ শতাংশে প্রত্যক্ষ অবদান রাখে শিল্পখাত। শিল্পখাতের বিভিন্ন উপশাখার মাঝে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের। ম্যানুফ্যাকচারিং বলতে বোঝায় যে সকল পণ্য কারখানা থেকেই সরাসরি ব্যবহার উপযোগী হিসেবে তৈরি করা হয়। যেমন, তৈরি পোশাক কিংবা ওষুধ। যদিও ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এর ধারারেখা ছিল একেবারেই শ্লথ। বার্ষিক উন্নয়ন হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক আট শতাংশ। যা ২০০৯-১০ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কেবল মাত্র ম্যানুফ্যাকচারিং এর অবদান ছিলো মোট শিল্পখাতের ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

শিল্পখাতে প্রথম দিকে উন্নয়নের ধীরগতির মূল কারণ হিসেবে চিইহ্নিত করা যায় দেশের পুঁজিবাদী, সমাজের নিরাপত্তাজনিত ভয়। সামাজিক এবং ব্যবসায়িক উভয় দিক থেকেই পুঁজিবাদী সমাজের বিনিয়োগ নিয়ে বেশ একটি দ্বিধাদ্বন্দে সময় পার করতে হতো। এমনকি বছর খানেক আগেও বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন অযুহাতে বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল বেশ কিছু উন্নত দেশ। এর মূলে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে। যদিও সেইসব জটিলতা সাম্প্রতিক সময়ে ভালভাবেই কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাট এর তথ্য অনুযায়ী দেশে নব্বইয়ের দশক থেকে বিনিয়োগ এবং আমদানী দুইই বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক হারে। ১৯৯০-০০ অর্থবছরে শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় আমদানী ছিল ৩১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৯২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সংখা বর্তমানে যে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এছাড়া একই সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের সবচেয়ে বর্ধনশীল শিল্প উপখাত তৈরি পোশাক বা রেডি গার্মেন্টস। ২০১০ সালে তৈরি পোশাক ছিল ২১০০ মিলিয়ন যা ১৯৯৬ সালে ছিল ৫৬৬ মিলিয়ন।

তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ যুক্ত হয়। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরেই তৈরি পোশাক থেকে বাংলাদেশের আয় ছিল ৩৩৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া পাট, তুলা, ওষুধ, লৌহজাত ভারী শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস, চা দেশের শিল্পক্ষেত্রে বড় কিছু নাম হয়ে থাকবে। ২০১৬ সালের এক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের শিল্পখাতের রপ্তানির শীর্ষ ৫ গ্রাহকের মাঝে আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৩ দশমিক ১ শতাংশ), জার্মানি (১২ দশমিক ৭ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (৮ দশমিক ৬ শতাংশ), ফ্রান্স এবং স্পেন (৫ শতাংশ)।

শিল্পখাতে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করলে অন্যান্য দেশ থেকে শিল্পক্ষেত্রের উন্নয়নে বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। কিন্তু এধরণের পিছিয়ে থাকা কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই বলতে হয় কাঁচামাল সংকট এবং আমাদের আমদানী ব্যবস্থা। দেশের রপ্তানী আয়ের ৭৩ শতাংশ তৈরি পোশাক শিল্প থেকে অর্জিত হলেও দূর্ভাগ্যজনক ভাবে এই খাতের কাঁচামাল আমদানীর ব্যয় নির্বাহ করতেই মোট লভ্যাংশের ৪৫ থেকে ৮৩ শতাংশ খরচ করতে হয়। আর এক্ষেত্রে বেসরকারী মালিকানায় ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেলেও সরকারী বিভিন্ন নীতিমালার কল্যাণে মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রায় ক্ষেত্রেই অনেকটা পিছিয়ে আসতে হয়।

এছাড়া বন্দরে বিভিন্ন আয়কর জটিলতা এবং অসাধু চক্রের খপ্পরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সেইসাথে বিদেশি বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের সাথে দেশীয় উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ সম্পর্কিত ব্যবধান আমাদের শিল্পখাতের উন্নয়নের জন্য বড় এক বাঁধা বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। দেশের ইপিজেড গুলোতে এখন প্রায় পঞ্চাশের অধিক দেশ সরাসরি বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এমন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৮০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।

এছাড়া দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব, প্রযুক্তিগত ব্যবহারে অনভ্যস্ত থাকা, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য যথাযথভাবে না পাওয়া সবকিছু মিলিয়ে সমসাময়িক দেশগুলোর তুলনার বাংলাদেশ শিল্পখাতে খানিক পিছিয়ে থাকছে।

শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ

দেশের মূল চালিকা শক্তি কৃষি হলেও আগামী দুই থেকে তিন অর্থবছরে শিল্পক্ষেত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অঙ্গ হতে চলেছে। বিশিষ্ট জনদের মতে বর্তমানে সরকারী নীতিনির্ধারকদের উচিত শিল্পখাতে আরো বেশি পরিমাণে মনোনিবেশ করা। যদিও অর্থনীতিবিদদের আশা ২০২১ সাল নাগাদ দেশের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্জিত হবে শিল্পখাত থেকে। আর শিল্পখাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে আমাদের কৃষিখাত এবং বেকার সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রেও। ইতিমধ্যে শিল্পখাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে কারিগরী শিক্ষায় ব্যপক বাস্তবমুখী পরিবর্তন আনা হয়েছে যা দেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা যায়।

তথ্যসূত্র:

1. Economic Issues of Bangladesh at 41 – M Aminul Islam Akanda PhD

2. Economic Geography of Bangladesh – Haroun Ar Rashid

3. Bangladesh Economic Review 2017 – Ministry of Finance

4. Bangladesh bureau of Statistics

5. www.indexmundi.com

6. The Daily Sun

ওডি/এএন

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড