• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

ধর্ষণের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ!

  মতামত ডেস্ক ২২ এপ্রিল ২০১৯, ০৪:৪০

ধর্ষণ
ছবি : প্রতীকী

বাংলাদেশে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে মানুষের মুখে মুখে, আলোচনার টেবিলে টেবিলে কিংবা পথে ঘাটে যে শব্দটি স্থান করে নিয়েছে সেটি হচ্ছে 'ধর্ষণ'। সভ্য এই দেশে ধর্ষণ শব্দটি তার ব্যবহারযোগ্যতা হারিয়ে অভিধানের পাতায় শেষ ঠিকানা করে নেওয়ার কথা থাকলেও ঘটেছে তার উল্টো। প্রতিদিন ধর্ষণ নামক যৌন আক্রমণের শিকার হচ্ছে শিশু থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীরাও। ঘরে বাইরে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র কিংবা গণ-পরিবহন কোথাও যেন বাঙালি নারী-শিশুরা নিরাপদ ন‍য়। সর্বোপরি বাংলাদেশ যেন ধর্ষণের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে।

পরিসংখ্যানের কথায় একটু পর আসব। আগে একটু চোখ ফিরিয়ে আসি কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া জাহান রাফি নামক ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর নির্মম হত্যার ঘটনার দিক থেকে। বাংলাদেশের ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী তারই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিবাদ করতে যায়। আর এতেই কেরোসিনের আগুনে পুড়তে হয় তাকে। অবশেষে ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে হেরে গিয়ে এই দূষিত পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সে। এ ঘটনায় পুরো দেশ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। ফুটপাত থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর সবখানেই প্রতিধ্বনিত হয় নুসরাত হত্যার বিচারের আর্তি। ফেনীর নুসরাতের পর রাজধানীর মুগদার হাসি। একজন মাদ্রাসাছাত্রী, অপরজন গৃহবধূ। দুজনই কেরোসিনের আগুনের নির্মম বলি। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ঘটে আলোচিত এই দুই ঘটনা।

পরিসংখ্যান বলছে চলতি বছরের শুরুর তিন মাসে ৩৯৬ জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। অপরদিকে বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ-চেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের জরিপ ধর্ষণের ভয়ানক চিত্র তুলে ধরেছে। তারা বলছে, চলতি বছরের তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬৪ জন শিশু। এ সংখ্যা জানুয়ারিতে ছিল ৫২, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ৬০ এবং মার্চে ফের ৫২ জনে দাঁড়ায়। গত তিন মাসে গণ-ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৯ জন। এর মধ্যে ৭ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণ-চেষ্টা হয়েছে ৮ জনের ওপর। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জনকে। এ ছাড়া অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জনকে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৬ জন। ২০১৮ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ শিশু নির্যাতন, দুই শিশু ধর্ষণ এবং এক শিশু হত্যার শিকার হতো। ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে অন্তত ৩৪ শতাংশ।

চাইল্ড পার্লামেন্ট নামক একটি সংস্থা বলছে, গত বছর ৮৭ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গণপরিবহনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ শতাংশ। কর্মজীবী ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিশুদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২৯৮ শিশু আত্মহত্যা করে, ২০১৭ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ২১৩।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) থেকে প্রকাশিত ‘ধর্ষণ – পরবর্তী আইনি লড়াই’ বইয়ে দেয়া পরিসংখ্যানে ২০০৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করে প্রস্তুত পরিসংখ্যানটিতে উল্লেখ করা তথ্যানুযায়ী এই ১৪ বছরের মধ্যে ২০১২ সালে ধর্ষণের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ওই বছর ধর্ষণের শিকার হন ১১৪৯ জন। পরের বছর ২০১৩ সালেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল প্রায় এক হাজার। ওই বছর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৯৯৮টি।

পরিসংখ্যান অনুসারে ২০০৪ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৯৭৭টি। পরের ৪ বছর ক্রমান্বয়ে সংখ্যাটি কমেছিল। ওই সময় ২০০৫ সালে ৮৩০, ২০০৬ সালে ৭৩৮, ২০০৭ সালে ৬৩৪ ও ২০০৮ সালে ৪৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০০৯ সালে ৫৬০, ২০১০ সালে ৬১৯, ২০১১ সালে ৯৩৯ ও ২০১২ সালে ১১৪৯টি, ২০১৩ সালে ৯৯৮, ২০১৪ সালে ৭০৭, ২০১৫ সালে ৮৪৬, ২০১৬ সালে ৭২৪, ২০১৭ সালে ৯২২ ও সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৮৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

পরিসংখ্যানে ধর্ষণের এসব চিত্র দেখলে যে কোন সুস্থ মানুষের গা শিউরে উঠবে। কেন বাংলাদেশে এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হয়তো অনেক সমাজবিজ্ঞানীর ঘুম উড়ে যাচ্ছে। গ্রামের সহজ সরল নারী-শিশু থেকে সমাজের উঁচু দালানের নারী-শিশুরা কারো যেন ছাড় নেই। স্কুলে-কলেজে শিক্ষকদের যৌন আক্রমণ থেকেও রেহাই নেই ছাত্রীদের। গণ-পরিবহণের নারী যাত্রীরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষণ কিংবা অন্যান্য যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও বস্ত্রনারী কিংবা কারখানার নারী শ্রমিকদেরও রয়েছে ধর্ষিত হবার ভয়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এবং ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে শিশু-ধর্ষণ। বিকৃত রুচির একশ্রেণির মানুষের বিকৃতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও। দেশের মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কোনোভাবেই যেন এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে।

ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েও ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে এমন খবরও পত্রিকার পাতায় স্থান পেয়েছে। সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে ধর্ষণের শিকার হয়েও অনেককে মুখ খুলতে দেখা যায় না। এছাড়া ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানির কারণে অনেকে কোন অভিযোগই দাখিল করে না। ধর্ষণের এমন লাগামহীন চিত্র বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাসহ শিক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। একটি দুটি বিচার সম্পন্ন করে ধর্ষণের কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ রেহাই পাবে না সে কথা চোখের সামনে অনেকটাই পরিষ্কার। সু-সংস্কৃতিহীন ঘুণে ধরা এই সমাজের মগজ পরিষ্কার না করলে ধর্ষণ নির্মূল কোনো ভাবেই সম্ভব না তাও পরিষ্কার।

বাংলাদেশের জন্মের ৪৮ বছর চলছে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্য, ক্ষুধা, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহীনতা ছিল এক চরম সত্য। এছাড়া গড় আয়ু, মাথাপিছু আয়, জিডিপির অবস্থা ছিল বেশ খারাপ। শিক্ষার হার ছিল নিম্নপর্যায়ে। বাংলাদেশের জনগণের বড় একটা অংশ হয়ে পড়েছিল বেকার। সে অবস্থা থেকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে সে কথা ভাবেনি কেউই। একদিকে বাংলাদেশ বিভিন্ন সূচকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে অন্যান্য দেশকে। আবার অন্যদিকে ধর্ষণের লাগাতার ছবিও যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উন্নয়নের মোড়ে মোড়ে।

লেখক : রকিবুল সুলভ, সংবাদকর্মী

ওডি/আরএইচএস

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড