• রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

কেমন আছে বাংলাদেশ : অর্থনীতি প্রেক্ষিত (পর্ব : ২)

  জুবায়ের আহাম্মেদ ১২ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:৪৮

বাংলাদেশ কৃষির বর্তমান চালচিত্র
কৃষিতে বাংলাদেশের চালচিত্র (ছবি: ইকোবিজনেস)

পালাবদলের হাওয়াতে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সব স্বপ্ন পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এগুচ্ছে কৃষি, শিল্প কিংবা সেবাখাতের মান। বাড়ছে অর্থনীতির গতি। আবাদি জমির পরিমাণ কমলেও বাংলাদেশ দেশের বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরেও রপ্তানি করছে খাদ্যশস্য এবং অর্থকরী সব ফসল। কিন্তু তথ্য আর তত্ত্বের ভিড়ে কতটা ভাল আছে বাংলাদেশের কৃষি? বাংলাদেশ অর্থনীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ২য় পর্বে থাকছে কৃষি এবং বাংলাদেশ অর্থনীতির নানা দিক।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কাগজে কলমের সেই প্রবাদবাক্য মেনে চলেই যেন দিন চলে যাচ্ছে দেশের প্রায় বিশ কোটি মানুষের। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি কিংবা মোট কর্মশক্তির কথা বললে সিংহভাগ চলে যায় কৃষিখাতে। দেশের জিডিপিতে বর্তমানে প্রাধান্য হারালেও স্বাধীনতার পূর্ববর্তী তো বটেই স্বাধীনতা পরবর্তী তিনটি দশকও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে কৃষিখাত। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি আর অনুন্নত কৃষিপ্রধান প্রযুক্তিকে পুঁজি করে সাত কোটি নাগরিকের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত করা।

সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ কতটা পাশ করেছিল সেই প্রশ্নের জবাব অনেক হতে পারে। তবে কিছু পরিসংখ্যান উল্লেখ করা যেতে পারে। সে সময় দেশের প্রায় ১৪.৪ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে কেবল দুই তৃতীয়াংশ চাষযোগ্য করতে পেরেছিল সদ্য স্বাধীন দেশটি। সত্তরের দশকের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, দুর্বল এই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিই হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাধা। যদিও বাস্তবতা বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছিলো সেইসব তত্ত্ব কথাকে। যদিও দেশের ইতিহাসের বড় একটা অংশ পর্যন্ত বাংলাদেশকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে। তবুও জনসংখ্যার বড় একটি অংশের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।

এগ্রো বেজড ইকোনমি বা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি কী?

এগ্রো বেজড ইকোনমি যাকে সহজ বাংলায় বলা চলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বলতে বোঝায় যখন একটি দেশের মোট অর্থনীতির সিংহভাগ জুড়ে থাকে কৃষিভিত্তিক অবদান। এক্ষেত্রে কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড বলতে কেবল শস্য উৎপাদনকেই বোঝানো হয় না। বরং কৃষিখাতে বীজ উৎপাদন থেকে সেচ প্রকল্প হয়ে ফসল উৎপাদন এবং উৎপাদিত ফসলের মজুদকরণ, বিপণন সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া রপ্তানিযোগ্য হলে রপ্তানি প্রকল্পও অর্থনীতির কৃষিখাত অংশে যুক্ত হবে।

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি চিহ্নিতকরণের আরেকটি মানদণ্ড হলো দেশের শিল্পখাত। শিল্পখাতেও যদি প্রায় পুরোটাই কৃষিভিত্তিক হয়ে থাকে (যেমন – ধান থেকে চাল প্রক্রিয়াজাত, তুলা থেকে সুতা প্রস্তুতি) তবে সেটিও নির্দেশ করে দেশের অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে কৃষিনির্ভর। যা বর্তমান বাংলাদেশে বেশ ভালভাবেই লক্ষ্য করা যায়। আবার উন্নত অন্যান্য দেশের দিকে নজর দিলে লক্ষ্য করা যায়, শিল্প খাতে কৃষির অবদান অনেকটা কমে এসেছে যার পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তিগত শিল্পায়ন (যেমন- ল্যাপটপ, স্মার্ট লাইফ এপ্লায়েন্স, মোবাইল বা অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য)।

বাংলাদেশ এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ব্যবস্থা

এখন প্রশ্ন আসতে পারে জিডিপিতে যেখানে কৃষির অবদান প্রতিনিয়ত কমে আসছে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশ বলা কতটা যুক্তিযুক্ত? এ ব্যাপারে মতামত দিতে গিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মোঃ শামীমুল ইসলাম বলেন, ‘যদিও দেশে জিডিপি খাতে অবদানে কৃষির অবদান অনেকখানি কমে এসেছে, এমনকি কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর শতকরা হিসাবও কমে এসেছে তবুও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত কৃষিকে অস্বীকার করার কোন পরিস্থিতি নেই। কৃষিখাতের অবদান কমে আসলেও এখন পর্যন্ত কৃষিই অর্থনীতির বড় অংশ।’

দেশের কৃষিখাতের সবচেয়ে কম অবদান দেখা যায় আজ থেকে দুই বছর আগে ২০১৭ সালে। দেশের মোট অর্থনীতির মাত্র ১৩ দশমিক ৪১ শতাংশে অবদান ছিল কৃষিখাতের। পক্ষান্তরে ১৯৭৫ সালের দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ছিল ৬১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সবশেষ ২০১৮ সালের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যা ছিল ১৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষিতে সামগ্রিক উন্নতি ছিল ৩ দশমিক ০৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ কৃষির বর্তমান চালচিত্র

বাংলাদেশের কৃষিতে নজর প্রদান করার সুবিধার্থে পুরো কৃষিখাতকে তিনটি আলাদা ভাগে বিভক্ত করেছে বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষিজ পণ্য, বনায়ন এবং গবাদি পশু খামার এবং মৎস্যশিল্প। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপির প্রায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশে প্রত্যক্ষ অবদান ছিল এই তিন খাতের। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট জনশক্তির ৪১ শতাংশ সরাসরি কৃষিখাতের সাথে যুক্ত।

বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের মোট উৎপাদিত খাদ্য শস্যের পরিমাণ ছিল ৩৮৮ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এছাড়া বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে সেবার সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে আরোও ৫৮ দশমিক ২৩ লাখ মেট্রিক টনের শস্য আমদানি করা হয়।
এছাড়া দেশে বীজ উৎপাদন প্রকল্পেও বিশেষ এক লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ইকোনমিক রিভিউ অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১,৯৬,৯৬১ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন করা হয় এবং কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয় ১,২৫,৬৪০ মেট্রিক টন পরিমাণ বীজ। ভাল মানের বীজ সরবরাহের কারণে বিগত কয়েক বছরে ফসল উৎপাদন প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সরকারি একাধিক সূত্র। এছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সারের বিতরণ কার্যক্রমের কারণে বেড়েছে সারের ব্যবহারও। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে মোট সারের ব্যবহার ছিল ৩৮৮৬ মেট্রিক টন। যা ২০১৭-১৮ সালে এসে দাঁড়ায় ৪৯০৬ মেট্রিক টন।

আর এমন ব্যবস্থার সুফলও হাতে নাতে পাওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ। আশির দশকে যেখানে (কারখানভিত্তিক হিসাব) ধান উৎপাদন ছিল ৯ দশমিক ২ মেট্রিক টন। যা ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ২ মেট্রিক টনে। আর বর্তমানে বিশ্বে চাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে বাংলাদেশ। দেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ ধরে রেখেছে ধান সংক্রান্ত সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। এমনই উন্নতির ধারা রেখা আছে অন্যান্য সকল শস্যের ক্ষেত্রেও।

বিস্ময়কর উন্নতি ঘটেছে মৎস্য প্রজনন এবং মৎস্য শিল্প খাতেও। দেশের মোট প্রাণিজ আমিষ চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করা খাত থেকে জিডিপির প্রায় ৩.৬১ শতাংশ অর্জিত হয়। এছাড়াও মোট কৃষি কার্যক্রমের প্রায় ২৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ অবদান থাকে মৎস্যখাতের। মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অঙ্গনে ব্যাপক সুনাম থাকলেও সরকারি পর্যায় থেকে এই শিল্পের মূল লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে দেশের সকল প্রকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোকে। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের বর্তমান তালিকা অনুযায়ী বিশ্বে মৎস্য উৎপাদনে ৫ম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

কৃষি বনাম শিল্প : মুখোমুখি নাকি পাশাপাশি?

এক সময় দেশের জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা কৃষিখাত আজ তার জায়গা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। আবার উত্থান ঘটেছে শিল্পখাতের সবশেষ অর্থবছরে শিল্পখাতের ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশের বিপরীতে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ছিল ১৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। এমন অবস্থায় প্রশ্ন জাগতেই পারে, তবে কি শিল্পখাত এবং কৃষিখাত মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে?

ড. শামীমুল ইসলামের মতে, শিল্পখাতের অগ্রগতি হলেও তা কৃষিখাতের অবদান এবং প্রসারে খুব নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, ‘দেশে আবাদী জমির পরিমাণ কমলেও আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নানাবিধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।’ এছাড়া দেশের শিল্পখাতের বিস্তারিত ব্যবচ্ছেদে দেখা যায় কৃষিখাত এখন পর্যন্ত শিল্পখাতে কাঁচামালের চাহিদা পূরণে বিরাট অবদান রাখছে। তাই আপাতত কৃষি এবং শিল্পখাত মুখোমুখি না হলেও পাশাপাশি অবস্থান করছে।

বাংলাদেশ কৃষির ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী বিবেচনা করলে দুটো দিকে কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ণয় করা যেতে পারে। সামনের দিনগুলোতে দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে আসবে তা একপ্রকার নিশ্চিত হলেও থাকছে বেশ ভাল সম্ভাবনাও। উন্নত প্রজাতির বীজ, সার সরবরাহের পাশাপাশি বাড়ছে নিত্যনতুন উপায়ে ফসল উৎপাদন। একইসাথে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবহার। সে কারণে আসন্ন দিনগুলোতে পরিসংখ্যান আর শতকরা হিসেবে কৃষির কিঞ্চিৎ দুরবস্থা দেখা দিলেও উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বাস্তবতা মিলিয়ে কৃষিখাতে আরও অনেকখানি উন্নয়নের সুযোগ থাকছে বাংলাদেশের সামনে।

তথ্যসূত্র: 

1. Bangladesh Economic Review 2017 – Ministry of Finance
2. Process of Agricultural development in Bangladesh – M Aminul Islam Akanda, PhD
3. Economic Geography of Bangladesh – Haroun ar RAshid
4. Leading Issues in rural development (Bangladesh perspective) – Mahbub Hossain & Abdul Bayes

লেখা: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় 

ওডি/এএন 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড