• মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

কেমন আছে বাংলাদেশ : অর্থনীতি পরিপ্রেক্ষিত (পর্ব ১)

  জুবায়ের আহাম্মেদ ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:৪৩

অর্থনীতি

প্রতিদিন একটু একটু করে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। একসময় যা ছিল দূরাশা, ছিল দিবাস্বপ্ন আজ সেইদিকে বেশ ভালোভাবেই পা রাখছে বাংলাদেশ। নিজ অর্থায়নে পদ্মাসেতু থেকে শুরু করে অনেক কিছুই আজ হচ্ছে যা একদিন হয়তো ভাবাটাই দুষ্কর ছিল। মানবসম্পদ উন্নয়ন গ্রাফ, জিডিপি বৃদ্ধি সহ সবখানেই আজকে যদিও উন্নতির ছাপ তবু বাংলাদেশ কতটা ভালো আছে? অর্থনীতির দৃষ্টিতে কতটা ভালো আছে এখন ১,৪৭,৫০০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশ। বাংলাদেশ অর্থনীতির বিভিন্ন হালচাল নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

জিডিপি জিএনপির বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ বাস্তবতা

জিডিপি এবং জিএনপি কী?

দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রশ্নে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আসে সম্ভবত জিডিপির দিক থেকে। জিডিপি বা Gross Domestic Product যাকে বাংলায় বলা চলে মোট দেশজ উৎপাদন বলতে বোঝায়, দেশের ভৌগলিক সীমারেখায় উৎপাদিত পণ্যের মোট বাজারমূল্য। এখানে পণ্য বলতে কেবল বস্তুগত পণ্যই নয়, একইসাথে বোঝানো হচ্ছে সেবাখাতকেও। যেমন সড়ক উন্নয়নে ব্যয় কিংবা যেকোনো হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে ডাক্তারসেবা সবই যুক্ত হয় এই জিডিপির প্রশ্নে।

অন্যদিকে জিএনপি বা Gross National Product যার পারিভাষিক রূপ মোট জাতীয় উৎপাদন বলতে নির্দেশ করা হয় দেশ বিদেশের সকল নাগরিকদের কর্তৃক এক বছরের মোট উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য। জিডিপি এবং জিএনপির মূল ব্যবধানের প্রশ্ন ভৌগলিক দিক থেকে। জিডিপিতে দেশের ভৌগলিক সীমারেখায় সবই যুক্ত হলেও জিএনপিতে দেশে বসবাসরত বহিরাগত নাগরিকদের মাধ্যমে যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাদ দেয়া হয়। সেই সাথে যুক্ত হয় বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

জিডিপি, জিএনপি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

পরের প্রশ্নটা আরেকটু জটিল। জিডিপি এবং জিএনপি কেন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নতি এবং উন্নয়নের ধারারেখা?

জিডিপি সহজ ভাষায় বলতে গেলে দেশের মোট পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক সামগ্রিক ফলাফল। যে দেশে যত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে অর্থনীতি সেই দেশে ততটাই বেশি সক্রিয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কি জিডিপির বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির উন্নতি প্রকাশ করে? কিংবা জিডিপি বৃদ্ধি কি আসলেই দেশের জীবনযাত্রার মান নিয়ে সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম?

জিডিপি প্রবৃদ্ধি বনাম জীবনযাত্রার মান

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জিডিপির ধারাবাহিক বার্ষিক উন্নয়নকে ধরে নির্দেশ করা হয়। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন যত বেশি সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ততটাই ধরে নিয়ে বার্ষিক সমীক্ষা প্রকাশ করার কাজ সম্পন্ন করে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা এডিবির মত সংস্থা।

কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর বিরোধীতা করে আসছেন বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ। কারণ জাতীয় উৎপাদন বা আয় বাড়লেই সবক্ষেত্রে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি হয়না। যা বর্তমান বাংলাদেশে একেবারেই প্রকট হয়ে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতামত অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপি বৃদ্ধির শতকরা হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করবে। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারবে একেবারেই ক্ষুধা এবং দারিদ্রমুক্ত একটি অবস্থা? নাকি মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশ চলে আসবে শীর্ষস্থানে?

যখন কোন রাষ্ট্রের জাতীয় আয় অপেক্ষা দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেড়ে যায় তখনই এই সমস্যা দেখা দেয়। সেদিক থেকে কোন পথে এগুচ্ছে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশ জিডিপির শুরু থেকে বর্তমান

যেকোন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই শুরুর দিকে অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান থাকছে কৃষিখাতে। এটি বাংলাদেশ, জাপান থেকে শুরু করে ইউরোপ কিংবা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু সময় যতটা গড়াতে থাকে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করে। আর সে জায়গা দখল করতে থাকে সেবা খাত (service sector) এবং শিল্পখাত (Industry). উন্নত দেশের মধ্যে জাপানের অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যায়, ১৯০৪ সালে অর্থনৈতিক উন্নতির সূচনালগ্নে জাপানের মোট আয়ের প্রায় ৩৪ শতাংশ ছিল কৃষিখাতের অবদান যা ২০১০ সাল নাগাদ মাত্র ১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একইরকম প্রভাব আমরা দেখতে পাই মার্কিন অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। বিগত ২০১৮ সালে মার্কিন জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ছিল মাত্র ০.৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে শিল্পখাতের অবদান ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ। এবং সেবাখাতের অবদান ছিল ৮০ শতাংশ। দৃষ্টিটা এবার ফেরানো যাক বাংলাদেশের দিকে। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর দিকে জিডিপির ৬০ শতাংশ ছিল কৃষির অধীনে। ধীরে ধীরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে কৃষিখাতে প্রাধান্য কমে আসতে শুরু করে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সেটি ১৭.৮ শতাংশে নেমে আসে। যা বিগত বছরে আরো কমে এসে ১৮ দশমিক ২৩ শতাংশে পরিণত হয়। আর সেবাখাতের অবদান ছিল ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। আর এই দীর্ঘ পরিক্রমায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি দেখা যায় শিল্পখাতে। ২০১৮ সালে জিডিপির প্রায় ৩৩ শতাংশ ছিল শিল্পখাতের অবদান। দেশের জিডিপির দিকে তাকালেও অর্থনৈতিক অবস্থায় ধারাবাহিক উন্নতির এক গ্রাফ দেখা যায়। আশির দশকের ৩ দশমিক ৭১ শতাংশের জিডিপি ১০ বছরের ব্যবধানে ১৯৯০ সালে পৌঁছে যায় ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশে। যা বর্তমানে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এবং সরকারী বিভিন্ন সূত্র মতে, ২০১৯ সালে একে ৮ এর ঘরে নিয়ে যাবার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতির গতিপথ

বিগত দশ বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বললে বলা যায়, অর্থনৈতিক যাত্রার সেরা সময়ে আছে বাংলাদেশ। কেবল ৫ বছরের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দিয়েই অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্রের তালিকায় বাংলাদেশ উঠে এসেছে তালিকার ৪২ তম স্থানে। একইসাথে দেশ পরিণত হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশে। বর্তমানে বিশ্বে মাছ উৎপাদন ও রপ্তানিতে ৩য় স্থানে আছে বাংলাদেশ। উন্নয়ন কর্মকান্ডের মধ্যে আছে বৈপ্লবিক কিছু উদ্যোগ, যেমন পদ্মাসেতু এবং মেট্রোরেলের মত প্রকল্পও। তবে এতকিছু শেষেও সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু প্রশ্নের অবকাশ থাকে। সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হলেও ধীরে ধীরে দেশে ধনী গরীবের বৈষম্য বাড়ছে প্রকট আকারে। অতী ধণি বৃদ্ধির হারে বর্তমানে বাংলাদেশ ৩য় অবস্থানে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়েলথ এক্স। 

সংস্থাটির মতে, আগামী ৫ বছরে এই বৃদ্ধি হার হবে ১১ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি। অতি ধনী চিহ্নিত করার এই প্রক্রিয়ায় ১০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষেত্রেই জরিপ চালিয়েছে তারা। দ্রুত এই অতি ধনী বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে নিম্ম আয়ের মানুষের সংখ্যাও। কাগজে কলমে মিশ্র অর্থনীতি বললেও ধীরে ধীরে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। আর অতি ধনী বৃদ্ধির এই প্রভাব পড়েছে দেশের ক্রেতা সমাজ, বাজার ব্যবস্থা এবং জিডিপি খাতেও। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সামাজিক এক প্রতিযোগিতা বর্তমানে বাজারে বিদ্যমান। যা প্রতিনিয়ত দেশের উৎপাদন এবং আমদানি খাতে প্রতক্ষ্য অবদান রাখছে দেশে বর্তমানে মধ্যম এবং উচ্চ আয়ের ক্রেতা বাড়ছে বছরে প্রায় ১২ শতাংশ হারে, যা পার্শ্ববর্তী যেকোন দেশের তুলনায় বেশ দ্রুতগতির। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক গবেষণা অনুযায়ী প্রতিবছর ২ লাখ নতুন মানুষ এই মধ্যম এবং উচ্চ আয়ের ক্রেতা সমাজে প্রবেশ করে। বর্তমানে এই সংখ্যা মাত্র ১২ লাখ হলেও ২০২৫ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ৩৪ লাখ হতে পারে। বার্ষিক ১০ দশমিক ৫ হারে কেবল এই ক্রেতা সমাজেই জনসংখ্যা ঘনত্ব বেড়ে চলেছে। বর্তমানে দেশের ষোল কোটির মাঝে প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ এই ক্রেতা সমাজের অংশ।

ক্রয়ক্ষমতা এবং সামাজিক অবস্থার এমন উত্থানে দেশের অর্থনীতি কাগহে কলমে অনেকটা এগিয়ে গেলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর কতটা ইতিবাচক প্রভাবফেলবে তা নিয়ে আছে নানা সমীকরণ, নানা প্রশ্ন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম আকন্দ এর মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনীতির গতিপ্তহে বেশ ভাল এক অবস্থানে রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে যা একটি বিরাট ভূমিকা রাখবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। অর্থনীতির প্রবীণ এই অধ্যাপকের মতে, আগামী দশ বছরে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন হার আরো প্রায় দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে যাবে। একইসাথে ২০৫০ সাল নাগাদ অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে শীর্ষ ২৫ এ বাংলাদেশ অবস্থান করবে বলে ধারণা করছেন ড. আমিনুল ইসলাম।

তথ্যসূত্র: 

১। Macroeconomics Theory and Policy – Dr. H.L.Ahuja
২। অর্থনীতি অধ্যয়ন : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত – মঞ্জুর মোর্শেদ
৩। Economic Geography of Bangladesh – Harun ar Rashid
৪। Economic Issues of Bangladesh at 41 – M. Aminul Islam Akanda, PhD

লেখক: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় 

ওডি/এএন 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড