• মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঐতিহ্যের শেকড়ে আঘাত ৷৷ দায় কার?

  সম্পাদকীয়

২০ মার্চ ২০১৯, ১৫:২৬
সম্পাদকীয়

উনিশ শতকের মাঝামাঝি (১৮৪২-৪৫) সময়ে কালীপ্রসাদ পোদ্দার নামে একজন জমিদার ছিলেন যিনি মায়ের গঙ্গাস্নানের জন্য রাস্তা বানিয়ে তার দুপাশে সারি করে তিন শতাধিক মেঘশিরীষ গাছ রোপণ করেন৷ ১৭৪ বছর বয়সী গাছগুলো যে রাস্তাটিকে আজও পাহাড়া দিচ্ছে, তার নাম 'যশোর রোড'৷

বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ৷ ১৯৭১ সালের শেষ দিকে কলকাতায় এলেন৷ উঠলেন তাঁর বন্ধুপ্রতীম সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে৷ সে সময় বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছিলো৷ ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সংযোগকারী সড়ক হিসেবে কাজ করতো যশোর রোড৷ প্রচুর বৃষ্টির কারণে রাস্তাটি পুরোপুরি ডুবে যাওয়ায় সড়কপথে না পেরে বন্ধু সুনীলকে সাথে নিয়ে বনগাঁ পেরিয়ে যশোর সীমান্তে পৌঁছলেন গিন্সবার্গ৷ সেখানে তাঁরা যশোর সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে অবস্থানকারী শরণার্থীদের দুর্দশার চিত্র প্রত্যক্ষ করলেন৷ সে দৃশ্য অ্যালেন গিন্সবার্গের হৃদয়কে চরমভাবে আন্দোলিত করলো৷ সে অনুভূতি ঢেলে দিয়ে তিনি রচনা করলেন অমর কবিতা 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড'৷

দীর্ঘ সে কবিতার শরীরে সুর বসিয়ে তৈরি হলো একটি চিরজীবন্ত গান৷ গাইলেন বিখ্যাত আমেরিকান সংগীতশিল্পী বব ডিলান৷ গানে গানে এ দেশের যুদ্ধাবস্থা ও মানুষের দুর্দশার খবর পৌঁছে দিলেন বিশ্বব্যাপী; কনসার্ট আয়োজন করে বাংলাদেশের মানুষের জন্য অর্থসাহায্য তুলে পাঠালেন৷
যশোর রোড নিয়ে লেখা সে গানের বঙ্গানুবাদ না জেনেই পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক তাঁর জাদুকরী কণ্ঠে ধারণ করলেন; সমগ্র বাঙালির হৃদয়ে সে পুরোনো ইতিহাস নতুন করে রক্তক্ষরণ ঘটালো৷

যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত ৩৮ কিমি দৈর্ঘ্যের যে রাস্তাটি, এটিই মূলত 'যশোর রোড' নামে খ্যাত৷ সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ রাস্তার দুপাশে ২৩১২টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক গাছ রয়েছে যেগুলোর বয়স ১৭০ বছরের বেশি।

সরকারের উন্নয়নপ্রকল্পের অংশ হিসেবে রাস্তাটি সম্প্রসারণের একটি প্রকল্প পাশ হয় ২০১৭ সালের মার্চ মাসে। কিন্তু যেভাবে প্রকল্পটি পাশ হয়, তাতে করে সেটি বাস্তবায়ন করতে গেলে দুপাশের গাছগুলোর অপসারণ অবধারিত হয়ে পড়ে৷ এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তৎকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে এক ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠলে নানান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়৷ সার্বিক দিক বিবেচনায় আদালত গাছগুলোকে অপসারণের ওপর স্থগিতাদেশ দিলে সেগুলো না কেটেই সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন কর্তৃপক্ষ৷

প্রকল্পের আওতায় সড়কটির উভয় পাশে ৫ ফুট করে মোট ১০ ফুট সম্প্রসারণের কাজ বর্তমানে চলমান৷ এ কাজে রাস্তার মাটি প্রায় তিন ফুট গভীর পর্যন্ত কাটা হয়েছে৷ রাস্তার মাপ ঠিক রাখতে কোনো কোনো স্থানে গাছের গোড়ায় কিছু অংশ চেছে ফেলতে হয়েছে৷ সঙ্গত কারণেই শত বছরের এ গাছগুলোর শেকড় সড়কের নিচে বেশ জায়গা নিয়ে বিস্তৃত ছিল যা ইতোমধ্যেই কাটা পড়ে গেছে বলে জানা যায়৷ যদিও সম্প্রসারণ-কাজটি আদালতের নির্দেশনা মোতাবেকই করা হচ্ছে, তথাপি প্রশ্ন—  রাস্তার উভয় পাশে ৫০ ফুটের মতো সরকারি জমি পড়ে থাকা সত্তেও গাছগুলোর সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা না ভেবে কেন এভাবে প্রকল্পটি দাঁড় করানো হলো? সদিচ্ছা থাকলে দুপাশের গাছগুলোর কোনোরূপ ক্ষতিসাধন না করেও সড়ক সম্প্রসারণ সম্ভব ছিল৷ প্রকল্পের কাজ অনেক দূর এগিয়ে আসার পর এ প্রশ্নগুলোর আর তেমন কোনো তাৎপর্য না থাকলেও নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে৷

শতবর্ষী এ গাছগুলোর শিকড় কাটা পড়ে যাওয়ায় এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এগুলোর কোনো কোনোটি যে কোনো সময় উপড়ে যেতে পারে৷ ইতোমধ্যেই কলাগাছিতে দুটো গাছ উপড়ে পড়েছে৷ এতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও রাস্তার দক্ষিণ পাশের কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ সামনে কিছুদিন পরেই বৈশাখের আগমন ঘটবে৷ কালবৈশাখীর তোড়ে কোনো গাছ উপড়ে পড়বে না এমন কোনো নিশ্চয়তা তো নেই-ই, বরং সে আশঙ্কা প্রবল৷ প্রশ্ন হচ্ছে— এ সকল গাছের কোনোটি উপড়ে পড়ে যদি হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটে, তাহলে তার দায় কে নেবে? বৃক্ষনিধনের এ কর্মযজ্ঞ শেষে দুপাশের সরকারি জমিগুলো অবৈধ দখলদারিত্বের কবলে পড়লে তার দায় কার ওপর বর্তাবে? বিকল্প উপায় থাকতেও প্রকল্প পরিকল্পনায় এত বড় ঝুঁকি কেন নেয়া হলো? দায়িত্বশীল কোনো পক্ষ এ প্রশ্নগুলোর দায়িত্বশীল উত্তর দেবেন— সে প্রত্যাশায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকলের৷
 
 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড