• বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

'নদীমাতৃক' বিশেষণটি যেন হারিয়ে না যায়

  সম্পাদকীয় ১৮ মার্চ ২০১৯, ১৪:৩৩

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশকে বলা হয় 'নদীমাতৃক দেশ'৷ অথচ দেশে নদীর প্রকৃত সংখ্যাই এখনও আমাদের অজানা৷ ভিন্ন ভিন্ন সূত্র থেকে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, সেখানেও কোনো সামঞ্জস্য নেই৷ সকল প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয় করলে দেখা যায় সংখ্যাটি ২৩০ থেকে ২০০০ এর মধ্যে৷ তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর সর্বশেষ অনুসন্ধান বলছে, দেশে নদী আছে ৪০৫টি৷ এর মধ্যে গত চল্লিশ বছরে ১৭৫টি নদী প্রায় বিলুপ্তই হয়ে গেছে বলা চলে৷ এ বিলুপ্তির কারণ মূলত উজানে পানি কমে যাওয়া, পলি ভরাট, দখল ও দূষণ। বাকি ২৩০টি নদীও রয়েছে ঝুঁকির মুখে। দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটারে, যা শুষ্ক মৌসুমে ৪ হাজার কিলোমিটারে এসে দাঁড়ায়৷

উজান থেকে এ দেশে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে পলি নেমে আসে৷ কিন্তু নদীগুলোর ওপর অসংখ্য সেতু ও বাঁধ নির্মাণ করার ফলে নদীর গতিপথে যে শৃঙ্খলাহানী ঘটছে, তার দরুণ এ পলি আগের মতো সহজে সাগরে মিশে যেতে পারছে না৷ অগণিত সেতু ও বাঁধ নির্মাণে নদীর দুপাশের এলাকায় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ৷ কেবল এটুকুই নয়, নদীগুলো নানাবিধ দূষণের শিকার হবার ফলে আমাদের নানান নেতিবাচক ফল বহন করতে হচ্ছে, যার প্রধানতম প্রভাব পড়ছে মাছের উৎপাদনে৷

মাছকে কোনো সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না৷ ফলে দেখা যায়— সাগরের মাছ মোহনায়, মোহনার মাছ উজানে, নদীর মাছ বিলে উঠে, সমতলের মাছ পাহাড়ের পাদদেশে ও পাহাড়ের মাছ ঝরনার কাছাকাছি এসে ডিম ছাড়ে। সুতরাং কোনো একটি এলাকার নদী ক্ষতিগ্রস্ত বা দূষিত হয়ে গেলে উপকূলে বসবাসকারী মানুষ ও পশুসহ জলজ জীবের নানামুখী ক্ষতির কারণ হয়। তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগরের নদ-নদীগুলোর দূষণের দরুণ ঢাকাসহ এর আশপাশের কয়েকটি জেলায় আমরা বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মাছ থেকে বঞ্চিত হই। কেবল বুড়িগঙ্গার হিসাবই যদি ধরা হয়— এ নদীর তলদেশে ১৩ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর৷ কল-কারখানার ৬০ ভাগ বর্জ্য, ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের ৩০ ভাগ এবং নৌযানের শতভাগ বর্জ্যই নদীতে ফেলা হয়।

এছাড়া আবাসন প্রকল্প ও বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রতিনিয়ত নদী ভরাট করা হচ্ছে। ব্যাপক জনসংখ্যার এ দেশে তাই নদী রক্ষা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ৷

সম্প্রতি ঢাকার চারদিকের নদ-নদী দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে কয়েক হাজার স্থাপনা ভেঙে দেয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদী রক্ষায়ও উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ৷ কিন্তু এ কার্যক্রমের বিপক্ষে নানা রকম হস্তক্ষেপ-প্রচেষ্টার কথাও শোনা যাচ্ছে৷ সকল প্রকার প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় যে কোনো মূল্যে এ কার্যক্রমটি চলমান রাখতে হবে৷

নদী রক্ষায় সরকারের নানাবিধ প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে৷ ইতোমধ্যেই ১০ কিলোমিটার নৌপথ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে৷। এটি বাস্তবায়িত হলে এর মাধ্যমে মৃতপ্রায় নদীগুলোতে আবারো নৌযান চলাচল সম্ভব করা যাবে৷ ফলে নৌবাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটার পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবন-জীবিকার উন্নয়ন ঘটানোও সম্ভব হবে৷

স্বল্পমেয়াদী নানা তৎপরতা চলমান রেখে বন্যা, নদীভাঙন, নদীশাসন, নদী-ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ ও বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে৷ দেশের নদ-নদী ও জলাভূমি দখল ও দূষণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন, নৌপথকে সচল রাখতে নদীগুলো খননের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দূষণরোধে সব কলকারখানায় শিল্পবর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণেও সরকারকে অনতিবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে।

নদীর দূষণ রোধে সংশি­­ষ্ট সব স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতাপ্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে৷ নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যালয় পাঠ্যসূচিতে নদী-সচেতনতা বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্তি এবং বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে৷ এছাড়া ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের মধ্যে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে বাধ্য করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে৷

আর এ সকল কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো রক্ষায় পাহাড়, সমতল, মোহনা ও আন্তঃদেশীয় নদ-নদীগুলোকে পৃথকভাবে বিবেচনায় এনে কাজ করতে হবে৷

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড