• বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

আমাদের ইতিহাস ও চলচ্চিত্র

  জাকারিয়া ইসলাম ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৫৩

ইতিহাস
ছবি : প্রতীকী

জীবনকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন ও দেখবার সব থেকে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোর মধ্যে চলচ্চিত্র বোধ হয় সবার ওপরের দিকটার একটি। কেননা বই-পুস্তকের পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতিসহ সমাজ ও জীবনের যে কোনো জানা কিংবা অজানা গল্পকে খুব কম সময়ে একটি ভিন্ন আঙ্গিকে নতুনভাবে তুলে ধরবার জন্য আমাদেরর ব্যস্ত শহুরে জীবনে চলচ্চিত্রের জুড়ি মেলা ভার। আর এই চলচ্চিত্রের গল্পের এক বিশাল আধার বলা চলে যে কোনো দেশের বা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে, বিশেষত রাজনৈতিক ইতিহাস।

সবারই জানা কথা, মুখস্ত বুলি, কিন্তু আমরা কতটুকু সদ্ব্যবহার করতে পারছি তার? বাঙালির ইতিহাসে সব থেকে গৌরবোজ্জল অধ্যায়টি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ঘটনাবহুল সময়কালকে আমি বলব আমাদের ‘ইতিহাস রচনার সময়কাল’ যেখানে একটি জাতি হিসেবে আমাদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা সুগঠিত হয়েছে, পেয়েছে পরিণতি। রচিত হয়েছে ‘আমাদের ইতিহাস’– আমাদের গৌরবগাঁথা। আবারও আগের প্রশ্নটি ফিরে আসে, কতটুকু জানি আমরা বা জানাতে পেরেছি অন্যদের?

আমাদের দেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সমসাময়িক দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে নব্বইয়ের দশকের স্নায়ুযুদ্ধ যেখানে এখনও সারা বিশ্বের লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রসদ যোগায় সেখানে আমাদের দেশে সত্তরের দশকের পর শুধু হুমায়ূন আহমেদ আর ড. জাফর ইকবালের কথা বাদ দিলে ১৯৯৭-এ চাষী নজরুল ইসলামের তৈরি ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ ছাড়া আর কোনো ছবির নাম মনে পড়ে না। এসব ছবিও অধিকাংশই কেবল কিছু কল্পনাপ্রসূত উপন্যাসের ওপর ভর করে আমাদের সামনে হাজির হয়।

বিশ্বজুড়ে যেখানে স্টালিনগ্রাডের মতো বৃহৎ রণকৌশলের প্রদর্শনী দেখানো ছবি থেকে শুরু করে ডানকার্ক কিংবা ল্যান্ড অব মাইন (‘আন্ডার সানডেট ইন জার্মান’) এর বিশেষ ঘটনা, স্থান বা চরিত্রনির্ভর ছবিগুলো সর্বজন সমাদৃত হচ্ছে সেখানে আমাদের কি কিছুই নেই নতুন করে দেখার কিংবা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার? এক্ষেত্রে একজনকে উল্লেখ না করলে অকৃতজ্ঞ হব- সৈয়দ আরিফ ইউসুফ, যিনি তার ‘ব্লকেড : এ নন ভাইওল্যান্ট রেসিসট্যান্স টু স্টপ জেনোসাইড’ শীর্ষক তথ্যচিত্রে তুলে এনেছেন আমাদের অতি স্বল্পালোচিত বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনাবিষ্কৃত এক ঘটনাকে– কিভাবে ১৯৭১-এ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো অস্ত্রশস্ত্রের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কিছু বেসামরিক ক্যান্যু-কায়াকের মুখে পড়ে শেষে খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়।

এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার কোনো বালাই নেই এদেশে, ইউসুফ সাহেবও যে এটি তৈরি করেছেন তাও ঐ একই শিরোনামে রিচার্ড কে. টেইলরের (ব্লকেড কর্মসূচির ‘ডিঙিচালক’দের একজন) লেখা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে। এমনকি ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করেও আমাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র হয়েছে বলে অন্তত আমার জানা নেই। আমাদের ইতিহাস ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত না করলেই নয়- ঐতিহাসিক নথিপত্রের অপ্রতুলতা তো আছেই সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে তথ্যের বিকৃতি।

আর চলচ্চিত্রের অতি বাণিজ্যিকীকরণের এ যুগে কিছু গৎবাঁধা গল্পধারার বাইরে অন্য কিছুও যে থাকতে পারে তা তো আমরা ভুলেই যাচ্ছি। ঠিক এই অজ্ঞতা আর অলসতার সুযোগেই কেউ কেউ একাত্তরকে নিছকই একটি পাক-ভারত যুদ্ধ বলেই চালিয়ে দিচ্ছেন তাদের নিজেদের স্বার্থে। এমনকি ‘চিটাগং’ নামক ছবিটিও ভারতেরই বানাতে হলো যার কাহিনী আর প্রেক্ষাপট দুটোই চট্টগ্রামের। ভারত-পাকিস্তানও তাদের চলচ্চিত্রে শুরু থেকেই ইতিহাসে নিজেদের বীরত্ব সমানভাবে একই তালে জাহির করে এসেছে, কই তাদের বক্তব্য তো পরিবর্তন হয় না! আর আমরা এখনও সত্য-মিথ্যার গোলকধাঁধায় পাঁক খেয়ে যাচ্ছি অনবরত।

এতসব গোলযোগপূর্ণ কথা-বার্তার একটিই সার- ‘পৃথিবীর ইতিহাস মাত্রই সংগ্রামের ইতিহাস’ যা যুগে যুগে পরিণত করেছে মানব সভ্যতাকে আর সংস্কৃতি তার অংশমাত্র। কারণ সংগ্রামই সংস্কৃতিকে স্বকীয়তা দিয়েছে যুগে যুগে, দেশে দেশে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে আমাদের জাতীয় প্রভাব কী তার বিচার দর্শক আর বিশ্লেষকদের হাতে, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে আমাদের গাফিলতির পরিণতি মারাত্মক হতে পারে– তা হোক সাহিত্যে, হোক চলচ্চিত্রে। কারণ অনেকেই হয়ত নিচের কথাগুলোয় সায় দেবেন-

‘ইফ ইউ নো ইউর হিস্ট্রি

দেন ইউ উড নো হোয়্যার ইউ কামিং ফ্রম

দেন ইউ উড নট হ্যাভ টু আস্ক মি

হু দি হেক ডু আই থিংক আই এম?’

-বব মার্লে

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, সাধারণ সম্পাদক বিইউপি ফিল্ম অ্যান্ড ড্রামা ক্লাব (বিইউপিএফডিসি)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড