• মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

মানসিকতা কতটা পাল্টাতে পেরেছে একুশ শতকের সমাজ?

  অধিকার ডেস্ক    ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪২

নারী_অধিকার
ছবি : প্রতীকী

নারী মানেই যেন না বোধক কোনো কিছু! সব কিছুতেই কী যেন এক সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আমরা আবদ্ধ এখনও। নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশে হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে নারীর প্রতি আদি কালের মানসিকতা কতটুকু আমরা পাল্টাতে পেরেছি? আমাদের মগজে কি নারী শব্দটি এখনও মানুষ শব্দের বিপরীত নয়? আমরা কি এখনও ভাবতে শুরু করতে পেরেছি; আমরা একেক দিক থেকে, একেক জন শক্তিশালী, সামগ্রিক দিক থেকে কোনো নারী কিংবা কোনো পুরুষ পিছিয়ে নয়? প্রশ্নগুলো একবিংশ শতাব্দীর নারী এবং পুরুষ সব মানুষের কাছেই!  

প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে নারীকে মনে করা হতো গঠনগত দিক দিয়ে দুর্বল, তারা তাদের পূর্বজন্মের পাপের ফল হিসেবে নারী হয়ে জন্মায়, এটা তাদের হীনতা, তাদের লজ্জা! আমরা কি এখনও মনে করি নারী মাত্রই কঠিনতম কাজ এবং শারীরিক পরিশ্রম সংক্রান্ত কাজ তাদের দ্বারা সম্ভব না? নারী মানেই স্নেহপরায়ণ, কোমল ও হৃদয়স্পর্শী!  

এর ব্যতিক্রম কিছু ভাবার মানসিকতা আমাদের এখনও তৈরি হয়ে উঠেনি। এই মানসিকতার আদলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে, নারীর অক্ষমতা আর দুর্বলতার দিকগুলো; কোমলতা, আর স্নেহপরায়ণতাকে আমরা শক্তিহীন কিছু ভেবে নিই! কিন্তু আসলে কি তাই? সব নারীই কি কোমল, হৃদয়স্পর্শী? আবার সব নারীই কি কঠিন এবং শ্রমসাধ্য কাজ করতে পারে না?

সব নারীই কোমলতার অধিকারী নয়, কিন্তু যেসব নারী এই কোমলতাকে ধারণ করে না, তাকে আমরা কটূক্তি করি, অস্বাভাবিকতা ধরে নেই, মোট কথা তাকে নারীর জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি, নারীর কোমলতা থাকবে না কোনোভাবেই আমাদের মগজ মেনে নিতে পারে না!  

তেমনি নারী শ্রমসাধ্য কোনো কাজ করলে, তাকেও আমরা অস্বাভাবিকতা হিসেবে ধরে নিই। মনে করি যে, এটা তো ওর দ্বারা সম্ভব নয়, নারী হয়ে এত কঠিন কাজটা কীভাবে করলও! এই যে সীমাবদ্ধ মানসিকতা আমাদের এখনও দূর হয়নি। আমরা মনে করতে পারি না, আমাদের শক্তি, সামর্থ্যের তেমন পার্থক্য নেই, শুধু একেক পরিবেশে, একেক গণ্ডিতে বেড়ে উঠার কারণেই আমাদের ভিন্নতা মনে হয়!

একজন নারী যদি কোনো সহনশীল সমাজে বড় হয়, তাহলে সেখানে এই নারীই, পুরুষের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠতে পারে, কারণ সহনশীল সমাজ নারীর কোনো সংজ্ঞায়ন করে দেয়না যে, তুমি এটা করতে পারো, এটা নারী দ্বারা সম্ভব না, নারী জোড়ে দৌড়াতে পারবে না, নারী অধিক কায়িক শ্রম করতে পারে না। 

সমাজের ধারাপাত অনুসারেই মানুষ ভিন্ন হয়, ভিন্ন মানসিকতায় বেড়ে উঠে। আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার জন্যই, মানুষের অধিকার সীমাবদ্ধ, মানুষে মানুষে বিশাল ব্যবধান। সমাজই নির্ধারন করে দেয়, কে কী করবে। পুরুষকে সবসময় সব দিক থেকে শক্তিশালী ভাবা হয়,  কিন্তু আসলে সবাই সব দিক থেকে নয়, একেক ক্ষেত্রে একেক জন এগিয়ে, কোনো জায়গায় নারী, আবার কোনো জায়গায় পুরুষ। যে কাজটা নারী করতে পারে, সে কাজ পুরুষ করতে পারবে না, কিংবা যে কাজ পুরুষ করতে পারে সে কাজ নারী করতে পারবে না, এ ধারণা একুশ শতকে এখনও বিদ্যমান আমাদের মানসিকতায়, আমাদের সমাজে।

নারী তার অধিকার আদায় করে নিতে পারলেও, সেটা মোক্ষম নারীর প্রতি ছাড় দেয়া কিংবা দয়া বোঝানো হয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনার দিক থেকে তাদের আলাদা সত্ত্বা হিসেবে এখনও মেনে নিতে পারেনি বাঙালি সমাজ। 

আধুনিকতার ছোঁয়া অবকাঠামোগত ভাবে হলেও, মননে আধুনিকতার বহু দূর রয়ে গেছি আমরা। আঠারো শতকে নারীকে যেমন ভাবা হতো একুশ শতকে তার চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারছি না। নারীকে এখনও মানুষ হিসেবে নীচ জাতি ভেবে নিই। আঠারো শতকে নারীকে শয্যাসহচারীর চেয়ে বেশি কিছু মনে করা হতো না, বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী তাদের সব কিছু নির্ধারন থাকত, অভিশাপ মনে করা হতো নারী জীবনকে, যার প্রায়শ্চিত্ত নারীকে করতে হতো বিনা দোষেই!  

বৈধব্য জীবন অতিবাহিত করতে হতো, তার সামনে সারা জীবন পরে থাকলেও, স্বামী মারা যাওয়ার কারণে বৈধব্য গ্রহণ করে উপাসনালয়ে কাটাতে হতো নারী জীবন, এই বৈধব্যকে পাপ মনে করতো সমাজ, সমাজের অন্য মানুষের মতো সে সবার সাথে মিশতে পারতো না, সব জায়গায় যেতে পারতো না, ধিক্কার শুনে একা ঘরেই কাটাতে হতো জীবন!  

শুধুমাত্র নারী বলেই এ দুর্দশা, নারী বলেই মেনে নিতে হতো সব অপবাদ, আর অপঘাত। সেই নারী আজও স্বাধীন সত্তা হতে পারেনি আমাদের সমাজে। নারীর অভিশাপ থাকলেও পুরুষের অভিশাপ কোথায় গেলো? পুরুষকে কেন অপবাদ আর অপঘাত সহ্য করতে হয় না?

অথচ সৃষ্টি সবার একভাবে, সবাই রক্ত মাংসের গড়া! মানব সৃষ্ট আইন দিয়েই মানবতাকে আটকে রাখি, ভাবনার জগতকে আটকে রাখি আমরা। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে, অন্যকে নিকৃষ্ট করে তুলে, অথচ আমরা একই।

সময় এসেছে সব বদলে দেওয়ার, নারী মানে নারী নয়, নারী মানে মানুষ এই উপলব্ধি জাগ্রত করতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে, যতই ক্ষমতায়ন আর সমতায়ন হোক না কেন, মূল ভিত্তিটাই অপরিবর্তিত থেকে যাবে নারীর প্রতি। 

সমাজের প্রত্যেক অবস্থান থেকে নারীকে আলাদা সক্রিয় সত্তা হিসেবে তুলে ধরতে হবে, নারীকে শুধু অধিকার নয়, তাকে ভাবতে শিখতে হবে সমাজ নিয়ে। ভাবনার জগতকে আলোড়িত করে প্রমাণ করতে হবে- নারী হেরে যায় না, নারী লড়তে জানে। নারী পুরুষের মতো নয় বরং নারী মানুষের মতো।

লেখক : সোহাগ মনি, গণ-যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। 
 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড