হতাশার মরণ ছোবল

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:৫৩

  রেহেনা আক্তার রেখা

প্রতিটি মানুষের মনে হতাশা কাজ করে। কেউ কেউ সেই হতাশাকে লালন করেন বছরের পর বছর। আবার কেউ কেউ এই হতাশাকে প্রশ্রয় দেন না, সারাদিনের কর্মব্যস্তায় হতাশাকে ছুটি দেন অনেকে। যারা হতাশাকে লালন করে থাকেন তাদের মাঝে দিনের পর দিন এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। হতাশার মরণ ছোবলে একপর্যায়ে সে হারিয়ে যায় অন্ধকার জগতে। কেউ প্রেমে ব্যর্থ হলে হতাশ হন, কেউ চাকরি না পেয়ে হতাশ হন, কেউ নিজের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নপূরণ করতে না পেরে হতাশ হয়ে উঠেন।

সাম্প্রতিককালে খবরের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে এত জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। অমুক জন চাকরি না পেয়ে শেষমেষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিছে। বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা বেশিভাগ আত্মহত্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ‘হতাশা’।

অনেকে আবার না পাওয়ার বেদনা সহ্য করতে না পেরে সারাজীবন হতশায় ভুগেন। হতশা বড় ভয়ঙ্কর, অনেকটা মরণব্যাধির মতো। মনের মাঝে হতাশাকে জায়গা করে দিলে সে কখনও সামনের দিকে এগোতে পারে না। মানুষ নিজেই হতাশার জন্ম দেয়, নিজের অর্জনকে বেশিরভাগ মানুষ কোনো অর্জন বলে মনে করে না। কথাই আছে না- যে যতই পায়, সে ততই চায়। মানুষের উচ্চাভিলাষী মন, আর অসন্তুষ্টি প্রকাশের কারণে হতাশার জন্ম হয়।

অনেকে আছেন জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার পরও শুধু আফসোস করে না পাওয়ার। তাই তো বলা হয়, এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভুরি ভুরি রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি। ব্যক্তি নিজের অর্জনে সন্তুষ্ট না হওয়ায় তার মাঝে হতাশা কাজ করে। কেউ কেউ নিজের পরিবার নিয়ে হতাশ, অনেকে আবার বাচ্চাকাচ্চাকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে না পারা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। যেমন, পাশের বাড়ির করিমের মেয়ে স্বর্ণা এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়েছে অথচ আমাদের ছেলেটা কোনো মতো টেনে টুনে পাস করল। অনেক পরিবারের অভিভাকদের এই ধরনের মন্তব্য করে হতাশা প্রকাশ করে থাকেন।

খুব অল্প বয়সে অনেক শিক্ষার্থীদের মাঝে হতাশা ভর করে। যেসব শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত কম ভালো রেজাল্ট করে অথবা পড়ালেখায় তেমন মনোযোগী নয়, তারা হাঁটতে, বসতে, খেতে পরিবারের অভিভাবকদের কাছে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। এরপর এসব শিক্ষার্থীদের মনে খুব অল্প বয়সে হতাশা চলে আছে। দিন দিন হতাশার বেড়াজালে বন্দি হয়ে সে একপর্যায়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। একসময় এই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহননের মতো জঘন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরের দিন আমরা খবরের পাতায় চোখ রাখতেই দেখি স্কুল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা।

বিশেষ করে কোনো শিক্ষার্থী যখন পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করে তখন শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়। আত্মহত্যার পরিমাণ বিশ্বব্যাপী ক্রমে বেড়েই চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (এইচডাব্লিউও) বলছে, বিশ্বের যত মানুষ যুদ্ধবিগ্রহে মারা যায়, তার চেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এক গবেষণায় ওঠে এসেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করেন, এদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। বয়সের হিসেবে বেশি আত্মহত্যা করছেন তরুণ-তরুণীরাই।

আমাদের চারপাশের পরিবেশ মানুষকে হতাশাগ্রস্ত হতে বাধ্য করে। চারপাশের মানুষের কটু কথায় মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে। মানুষ যখন ব্যর্থ হয় তখন হতাশ হয়ে পড়ে। তখন তার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সে ভাবে আমার দ্বারা কিছু করা সম্ভব নয়। অনেক পরিবারে অভিভাবকদের সন্তানকে বলতে শোনা যায়, ‘তোকে দ্বারা কিচ্ছু হবে না’। এই ‘কিচ্ছু হবে না’ তিন অক্ষরের ছোট্ট বাক্যটি সন্তানের মনে গেঁথে যায়। ফলে তার মনে খুব সহজে হতাশা ভর করে।

হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে সবার আগে দাঁড়াতে হবে পরিবারের সদস্যদের। পরিবারের সবার সহানুভূতিই পারে ব্যক্তির হতাশা কাটাতে। তবে হতাশা দূর করতে ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত ঘুমানোর, নেতিবাচক আলোচনা থেকে নিজেকে যতটুকু সম্ভব দূরে রাখা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, নিয়মিত শরীর চর্চা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

লেখক : সাংবাদিক