• শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ৫ মাঘ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

ছবি তোলার আইনি প্রক্রিয়া

  হিমেল শাহরিয়ার ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:১৫

ছবি তোলা
ছবি : প্রতীকী

মনে করুন আপনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গেলেন। এখানে প্রতি দিন ঘুরতে আসে হাজার হাজার মানুষ। এই কক্সবাজারে আপনি সমুদ্রে ভিজে গোসল করছেন, সেখানে আছে আরও অনেকে। সবাই নিজের মতো করে উপভোগ করছেন এই বিশাল সমুদ্র থেকে আসা ঢেউগুলো। নিজের ভ্রমণের স্মৃতি রক্ষায় প্রত্যেকে ছবি তুলছেন ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন সাজে।

সেই ছবির ফ্রেমে চলে আসছে আরও অনেকের ছবি। যেহেতু জায়গাগুলো খুবই অল্প, সেহেতু ফ্রেমে একজনের ছবি অন্যজনের আসা স্বাভাবিক। তারা আপনাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে যে আপনি খারাপ ধারণা নিয়ে গোপনে তাদের ছবি তুলছেন বা আপনি দেখছেন কেউ গোপনে আপনার ছবি তুলছে। এমন কিছু ঘটলে কেমন হবে ব্যাপারগুলো?

হয়তো তারা এই ছবিগুলো ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারে কিংবা আপনি কারো ছবি তুলছেন সেই অভিযোগে আপনি বিব্রত বোধ করতে পারেন। কি করবেন তখন? আসলে কার অপরাধ হচ্ছে এখানে?

বর্তমানে ব্যাপক বিস্তৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাধে সবাই নিজের কাজগুলো তুলে ধরতে চায়। নিজেকে ভিন্ন জায়গায় ভিন্নভাবে প্রকাশ করতে চায়। নিজের কাজগুলো সবাই শেয়ার করতে চায় ভার্চুয়াল কমিউনিটির সঙ্গে। প্রামান্য চিত্র দিয়ে বিশ্বাস যোগ্যতা আর সবার মাঝে নিজের স্মৃতি রেখে দিতে চায়। তাই বর্তমানে চলছে ছবি তোলার অন্যরকম এক মহড়া। আবার মানুষ চায় কোনো অনিয়ম বা অস্বাভাবিক বিষয়গুলো সবার সঙ্গে শেয়ার করতে, চায় এর সমাধান।

অবাধ তথ্য শেয়ার এর এই যুগে সবাই নিজের আশেপাশের বিষয়গুলো আকর্ষণীয়ভাবে প্রকাশ করতে চায়। চায় মানুষকে মুগ্ধ করার মতো কিছু প্রকাশ করতে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অনেকে বিভিন্ন রকম বিষয় তার খরিদদারকে দিতে চায়। আজ তথ্যগুলো যখন সঠিকভাবে প্রকাশ করতে চায় তখন তার প্রমাণ বা অকর্ষণীয় করার মূলে রয়েছে স্থির চিত্র বা ছবি।

এছাড়া, প্রযুক্তির এ যুগে এই ছবি তোলা সহজসাধ্য এবং কাযর্কর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই চাহিদা বাড়ছে বিভিন্ন রকমের ক্যামেরার। বর্তমানে ব্যাপকহারে বিক্রি হচ্ছে ক্যামেরা। আবার অনেকে ক্যামেরার এই বিশেষ উপযোগিতা আলাদাভাবে খুঁজছেন। এখন মোবাইল কোম্পানিগুলো ভালো ক্যামেরা নিয়ে তাদের ফিচারগুলো সাজিয়েছে।

ছবি তোলার চাহিদাকে সবাই মূল্যায়ন করছে বিভিন্নভাবে। কেউ নিরাপত্তা, কেউ বিনোদন, কেউ ব্যবসায়িকভাবে, কেউ কেউ আরও অনেক সুবিধার জন্য। তাই এই ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে এর অবমূল্যায়ন হচ্ছে কি না তা নিয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এই বিষয়ে প্রয়োজন আইন তৈরি করা। আমাদের এই দেশে এখন পর্যন্ত এই নিয়ে কোনো আইন তৈরি হয়নি। তবে বর্তমান সময়ে এটা নিয়ে আইন করা খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে ফটোগ্রাফি নিয়ে তেমন কোনো আইন বা নীতিমালা নেই। তবে আমি এখানে কয়েকটি উন্নত দেশের আইনগুলো কেমন তা তুলে ধরার চেষ্টা করব।

প্রথমেই বলে রাখি ছবি তোলার ক্ষেত্রে আইনের চেয়ে নৈতিকতাকে বেশি মূল্যায়ন করতে হবে বেশি। তবে সবাইকে সেই নৈতিক বিষয়ে সচেতন হতে হবে। প্রায় প্রত্যেক দেশে এই নিয়ম আছে, যে কোনো পাবলিক প্লেসে ছবি তোলা যাবে। এতে কেউ আপত্তি করতে পারবে না। মূলত যা চোখে দেখার অনুমতি আছে তাই তোলার অনুমতি আছে। এতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। তবে পাবলিক টয়লেট, লকার ও অনান্য গোপনীয় জিনিসের আওতায় নেই। তবে অনেক দেশে পাবলিক প্লেসকে ছবি তোলার জন্য বৈধতা দিলেও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ছবি তুললে অবশ্যই অনুমতি নিতে হয় এবং শর্ত পূরণ করতে হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাজ্যে ট্রাফালগার স্কয়ার, পার্লামেন্ট স্কয়ার। এছাড়া, রয়েল পার্কে কোনো ফিল্ম করলে অনুমতি নিতে হবে। এরকম আইন আছে যুক্তরাষ্ট্রেও। সেখানে ওহিও ক্যানেল ন্যাশনাল হিস্টোরিকাল পার্কে ছবি তোলার ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে হয়। সাধারণত ওই সব এলাকায় ‘নো ফটো’ এই টাইপ ট্যাগ লাগানো থাকে। এই ধরনের ছবি যে কোনো জায়গায় লাগানো থাকলে সেখানে ছবি তোলা যাবে না, হোক সেটা পাবলিক প্লেস বা প্রাইভেট।

আবার প্রাইভেট প্লেস এ ছবি তুলতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। অন্যথায়, আইনি ঝামেলায় পড়তে হয়। তবে অনুমতি নিয়ে ছবি তোলা যাবে এবং শর্ত যদি থাকে তাহলে তা পূরণ করতে হবে। তবে প্রাইভেট প্লেস যদি পাবলিক প্লেস থেকে দেখা যায়, তাহলে কোনো অনুমতি ছাড়াই ছবি তোলা যাবে। তবে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে আইনে বলা আছে, বেড রুম বা বাথরুম তোলা যাবে না। তবে এরকম কিছু নেই যুক্তরাজ্যে। হয়তো ছবি তোলার সময় কি খেয়াল থাকে কোন টা কি? তবে এ ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে একটু কাজে লাগাতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে করলে আইনি ঝামেলা হতে পারে আবার নাও হতে পারে যা কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে।

পাবলিক প্লেসে কেউ যদি জোরপূর্বক বা অস্বাভাবিকভাবে যদি কারও ছবি তোলে তাহলে তা হ্যারাচমেন্ট হিসেবে গণ্য হবে। তবে কেউ যদি ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে কারও ছবি তুলতে চায় তাহলে অনুমতি নিতে হবে।

আবার কয়েকটা দেশে ভিন্ন রকম নিয়ম আছে। যেমন, যুক্তরাজ্যে আগে ছিল যে পাবলিক প্লেসে কর্মরত পুলিশের ছবি তুলা যাবে না, তাদের নিরাপত্তার জন্য। তবে এখন আর সেই নিয়ম নেই। তবে এই নিয়ম এখনও আছে স্পেনে। আবার অনুমতি নিয়ে তোলার নিয়মটা রেখে দেওয়া আছে সব দেশে। আবার, আছে যে কোনো পাবলিক কাজের ছবি তুলা যাবে তবে কাজে বাধা দেওয়া যাবে না। যেমন,  ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল ও ইমার্জেন্সি কাজের ছবি।

ছবি তোলার সঙ্গে জড়িত আছে কারও ছবি নিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার বিষয়টি। এই কপি রাইট আইনটি চালু আছে অনেক দেশে। তবে যুক্তরাজ্যে কোনো ছবি ৭০ বছরের পুরোনো হলে তা যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে। আর কানাডায় এই বয়সসীমা হচ্ছে ৫০ বছর।

আর আগেই বলা হয়েছে, যেখানে ছবি তুলতে নিষেধ করা হয়েছে বা ওই স্থান এমন চিহ্নিত করা হয়েছে সেসব স্থানে ছবি তোলা যাবে না। ছবি তোলার এই রকম নিয়ম প্রায় সব দেশে একই রকম। আমাদের দেশে এই ব্যাপারে আইন করলে এমনই হবে। আর এমনটাই হওয়া উচিত।

এই ছবি তুলা নিয়ে যেমন ভালো কাজ হচ্ছে তেমন খারপও ঘটতেছে। তাই আমাদের কেই সতর্ক থাকতে হবে। তাই পাবলিক প্লেসে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করছে মানুষ তা কারও ক্যামেরায় চলে গেলে বলার কিছু থাকবে না। তাই নিজের বিষয়টা নিজেই খেয়াল রাখতে হবে। আবার, পাবলিক প্লেস থেকে প্রাইভেট প্লেসে ছবি তুলার অনুমতি আছে তাই নিজের প্রাইভেসি নিজেই রাখতে হবে এমনভাবে যে যেন পাবলিক প্লেস থেকে নিরাপদ থাকা যায়।

আর বর্তমানে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে গোপন ক্যামেরাসহ বিভিন্ন জালিয়াতি করছে এই ব্যাপারে নিজেকেই সতর্ক থাকতে হবে। আর সেই সঙ্গে ফটোগ্রাফির আইন করলে এবং তা প্রয়োগ করলে এর প্রতিকার করাও সহজ হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড