• বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫  |   ২৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

প্রজন্ম ভাবনা

বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন বা Climate change

  পল্লব সাহা ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫৬

প্রজন্ম ভাবনা
ছবি : পল্লব সাহা

বর্তমান বিশ্বে একটি অত্যন্ত আলোচিত বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন বা Climate change। 

প্রথমে জানা যাক জলবায়ু প্রকৃতপক্ষে কী বা জলবায়ু বলতে আমরা কি বুঝি?
প্রকৃতির একটি অনন্য উপাদান ‘আবহাওয়া।’ আবহাওয়া বলতে সাধারণত কোন নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট অঞ্চলের আকাশের অবস্থা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে সকাল ৬টায় ঢাকার আকাশে আর্দ্রতা বেশী, দুপুরে আর্দ্রতা কম। এভাবে কমপক্ষে ৩০-৪০ বছরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের আবহাওয়ার যে গড় নির্ণয় করা যায় তাই হলো জলবায়ু। সারাবিশ্ব এভাবে বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে বিভক্ত যেমন: মৌসুমি জলবায়ু,  ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু ইত্যাদি। প্রতিটি জলবায়ু অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য রয়েছে, কোন অঞ্চলে গরম বেশী আবার কোন অঞ্চলে ঠাণ্ডা বেশী।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত উদ্বিগ্নের সাথে যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হলো ‘আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তন’!

এবার আসা যাক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ প্রসঙ্গে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো পর্যালোচনা করলে কিছু প্রধান কারণ আমরা দেখতে পাই তার ভেতরে অন্যতম গ্রীণ হাউস প্রতিক্রিয়া, বনাঞ্চল ধ্বংস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। এবার আসা যাক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কারা?

আমরা  সবাই মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ আবিষ্কারক স্যার আইজ্যাক নিউটন এর নাম শুনেছি নিশ্চয়ই! স্যার আইজ্যাক নিউটনের একটি উক্তি আছে ‘Every action has opposite equal reaction’ অর্থাৎ প্রত্যেক ক্রিয়ারই সসমমুখী বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

এবার জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু কারণ সমূহের দিকে তাকাই-

গ্রিন হাউস: গ্রিণ হাউজ বলতে সাধারণত বুঝায় ‘সবুজ ঘর’ শীতপ্রধান দেশগুলোতে মূলত অত্যধিক শীত থাকার কারণে গাছ জন্মাতে পারেনা। গাছ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাঁচের ঘরে থেকে বেড়ে ওঠে, কারণ আমরা সবাই জানি কাচ তাপের অপরিবাহী এবং আলোর সুপরিবাহী।  

এবার আসা যাক গ্রিন হাউজের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে-
যে কাঁচ তাপের অপরিবাহী এবং আলোর সুপরিবাহী সে সূর্যের আলো প্রবেশের মধ্যে দিয়ে গাছ তার বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করতে পারে কিন্তু কাঁচ তাপের অপরিবাহী হওয়ায় অক্সিজেন নির্গত করতে পারেনা। তাই পৃথিবীতে কার্বন- ডাই অক্সাইড বেড়ে যেতে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন -ডাই অক্সাইড বৃদ্ধির কারণে ওজোনস্তর ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পড়ে যা থেকে চর্ম ক্যান্সার, চোখে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস সহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হয়,  এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় কারণ বনাঞ্চল ধ্বস প্রসঙ্গে-

আমরা সবাই জানি যে, বনাঞ্চল একটি দেশে মাতৃছায়াস্বরুপ। আমরা এটাও সবাই অবগত আছি যে, একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় মোট আয়তনের ২৫% বনভূমি থাকা বাঞ্ছনীয়।

কিন্তু যদি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট চিন্তা করি তাহলে আমরা কি দেখব?
বাংলাদেশের মোট বনভূমি পরিমাণ মাত্র ৭.৫%( তথ্যসূত্র বনবিভাগ)। 
আমাদের দেশে অতিদ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নগরায়নের জন্য বনভূমি ধ্বংস করা হয়। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ মুনাফা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে শুধুমাত্র উন্নয়নের তকমা ব্যবহার করে, বাংলাদেশো তার ব্যতিক্রম নয়!

আমরা সবাই ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র’ এর কথা সবাই জানি। বাংলাদেশের প্রাণ প্রকৃতির আঁধার ম্যানগ্রোভবন সুন্দরবনকে ধ্বংস করে তৈরি করা হচ্ছে এ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যে সুন্দরবনকে সপ্তাচার্যের প্রথম অবস্থানে তালিকাভুক্ত করার জন্য এত প্রচার-প্রচারণা করা হলো তবে আজ কেন তা ধ্বংস করা হচ্ছে?

এবার দেখা যাক একনজরে সুন্দরবন-

★ ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর UNESCO সুন্দরবনকে বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
★ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্মস্থান সুন্দরবন।
★ আয়তনঃ ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার।
★ মোট ভূমির ৪২% ও মোট বনভূমির ৪৪%।
★ ভৌগলিক অবস্থান: ভারত ও বাংলাদেশে এর অবস্থান। ২/৩ অংশ বাংলাদেশে।

কিছু প্রশ্ন অতি বিনয়ের সাথে উপস্থাপন করছি:
১. সুন্দরবনের কোন বিকল্প আছে কী?
২. বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৮০০০ মেগাওয়াট এরপরো কেন ভারতের সাথে ৯০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি?

এবার দেখা যাক রামপাল প্রকল্পের লাভ ক্ষতির হিসাব:

যা হারাব:

১.কৃষির উপর নির্ভরশীল ৭০০০ মানুষের জীবিকা।
২.বছরে ১২৮৫ ধান ও ৫৬৯ ম্যাট্রিক টন মাছের  উৎপাদন।
৩.দুর্লভ ডলফিন সহ জীব বৈচিত্র্য এর জন্য সুপেয় পানি।
৪. পরবর্তী ১০-১৫ বছরের মধ্যে উজাড় হয়ে যাওয়া বনাঞ্চল।
৫.৫ লক্ষের বেশী মানুষের জীবিকা।
৬.বছরে ৫০০০ কোটি টাকা(সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি জীবনের ক্ষতি অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না)

যা পাব:

১.৬০০ মানুষের কর্মসংস্থান।
২. দূষিত পশুর নদী।
৩. ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
৪. বছরে ৩০০০ কোটি টাকা।
৫. ৫ লক্ষ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত মানুষের জীবন।
(তথ্যসূত্র: বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ)।

আবারো ১টি প্রশ্নের অবতারণা করতে হয়, যাদের কর্মসংস্থান হবে তারা কোন দেশের নাগরিক?
অনেকেই বলবেন ভারতের! হ্যাঁ তাই ভারতের। যেখানে ভারতের গুজরাট প্রদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের বনভূমি ধ্বংস করে ভারতপ্রীতি দেখানো কতটা যৌক্তিক? 
বিশ্বের ৪২% কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র লোকসানে,চলতি বছর এপ্রিল-জুন প্রান্তিক ৮২৫ কোটি রুপি নিট লোকসান করেছে ভারতীয় পাওয়ার প্লান্ট।
(তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা)

UNESCO  সহ বিশ্বব্যাপী গণ আন্দোলনকে উপেক্ষা করে রামপাল প্রকল্প কেন করা হচ্ছে?

এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি পুঁজিবাদের নগ্ন ধর্ম সম্পর্কে! পুঁজিবাদের একমাত্র ধর্মই হচ্ছে মুনাফা অর্জন।

মুনাফার সূত্র যদি আমরা সহজভাবে বলি তবে তা এমন দাঁড়ায়: বিনিয়োগকৃত অর্থ - অন্যান্য খরচ+ শ্রমিক শোষণের ফলে প্রাপ্ত অর্থ।

আবারো ফিরে আসা যাক জলবায়ু পরিবর্তনের তৃতীয় কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রসঙ্গে: প্রশ্ন হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কেন বাড়ে? প্রতিউত্তরে বলবেন যে, বরফ গলার জন্য।
এক বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতিবেদনে দেখা যায়, যে হারে বরফ গলছে সেভাবে গললে ২০৪৮-৫০ সালের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কী জলবায়ু পরিবর্তনের দায়কে এড়িয়ে যেতে পারি? যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করি তাহলেও দেখা যাবে যে, মহানবী (সা:) হাদিসে বলছেন, পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হবে মানুষ।

এখান থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিশ্বশাসকদের মুনাফা সর্বসকরণ নীতির জন্যই পৃথিবী ধ্বংসের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড