ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে, ঠোঁটে ঠোঁটে এরা প্রেম বিলোয় ভর দুপুরে! 

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৫০

  জীবন আহমেদ

কোটা আন্দোলন, টিএসসি চত্ত্বরের চুম্বনের ছবি, ব্লগার অভিজিৎ হত্যার ছবিসহ বিভিন্ন সময় ছবি তোলার জন্য আলোচনা ও সমালোচনার নায়ক জীবন আহমেদ।  

জীবন আহমেদ মনের কথাগুলো বলার চেস্টা করলেন তার ফেসবুক আইডিতে। পাঠকদের জন্য তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হলো দৈনিক অধিকারের পাতায়।  

আমি অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষ! কিন্তু আমার দেশের প্রতি আমার দ্বায়বদ্ধতা বিশাল! আমার নেশা পেশা এবং ভালোবাসা সবই ছবি তোলাকে ঘিরে! বহমান সময়কে ফ্রেমে আবদ্ধ করে দেয়াকেই আমার একমাত্র স্বার্থকতা! আমার জীবন যুদ্ধে আমার ক্যামেরাই আমার এক মাত্র অস্ত্র! এই অস্ত্র দিয়েই সত্যের গুলি ফুটাতে চেয়েছিলাম অসত্যের বুকে! যখন যেখানে অন্যায়ের কালো হাত থাবা মেরেছে, যেখানে নিপিড়ন হয়েছে, অত্যাচার, অবিচার, রক্ত ঝরেছে আমি আমার অস্ত্র উচিয়ে ধরেছি জীবনের পরোয়া না করে! আমি সত্যকে বড় ভালোবাসি! সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরতে এক হাতে আমার কলিজা আরেক হাতে আমার অস্ত্র একের পর এক গুলি ছুড়েছি অন্ধকারের দিকে!

ঘটনা ২০১৫

আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ব্লগার অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড! সেদিন রাতে আমি একজন সাধারন মানুষ হিসেবেই দৌড়ে গিয়েছিলাম দুজন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে। মানবিক দায় থেকে আপ্রাণ চেষ্টা ছিল একজন মানুষকে বাঁচানোর। আমি সেদিনও ভুলিনি আমার অস্ত্র দিয়ে সত্যেকে মোকাবেলা করতে। ছবি তুলেছিলাম। আর এই ছবিই আমার জীবনকে এক দুর্বিষহ অবস্থায় এনে বিক্ষিপ্ত করেছিল, সে গল্প কম বেশি সবারই জানা!

নানা হুমকি ধমকি আর জীবন সংশয় নিয়ে ঘুরে ফিরেছি জীবনের এ গলি ও গলি। আমি ভয় পাইনি। আমি দমে যাইনি। আমি নিভে যাইনি। বরং জ্বলে উঠেছি সত্যের আলোতে!

নিজেই যখন খবরের ছবি

ঘটনা ২০১৮

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর তানজিন স্যারকে ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঞ্চনার দৃশ্য তুলে আনলাম৷ পাছে সবাই বলতে লাগল এত সাহস ভালো নয়, সব কিছু নিয়ে ঘাটতে নেই। আমি শুনিনি। আমি ছাপিয়ে দিলাম সত্যকে! এর পর হুমকি একের পর এক সয়ে গেলাম।

এরপর নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কিছু ভালো সময় পার করতে থাকলাম। প্রেমের জোয়ারে ভাসলাম। আমার ক্যামেরায় শুধু গুলি নয়, অনেক ফুলও ফুটেছে।

ঘটনা ২০১৮

এই তো সেদিন, টিএসসির বর্ষা মঙ্গল কাব্য রচনা হল! আহা! কি সুন্দর! এক জোড়া ভালোবাসাময় যুগল চুম্বনরত ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে, ঠোঁটে ঠোঁটে এরা প্রম বিলোয় ভর দুপুরে! এমন দৃশ্য কি ধারণ না করলে চলে? এমন দৃশ্য কি সবার মাঝে না বিলিয়ে দিলে চলে? এই ভালোবাসা ছড়িয়ে গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে! 

এর পরের ঘটনাও কারো অজানা নয়! এক দল নোংড়া লোক নিন্দা ছড়াতে লাগল, আরেকদল চটে গেল, আমার চাকরি চলে গেল! কিছু মানুষ সহমর্মিতা জানানোর বদলে বিপক্ষে গিয়ে দাড়ালো! মারধর করল! অপমান অপদস্থ লাঞ্চনা সয়ে গেলাম দিনের পর দিন। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী প্রবলভাবে সাহস আর ভালোবাসা দিয়ে গেলেন৷ তাদের কাছে আমি ঋনী।

এরপর আবার ঘুরে দাড়ালাম। মানবজমিনে চাকরী হল! ক্যামেরা নিয়ে আবার ছুটলাম সত্যের পিছু! লোভ লালসা বিসর্জন দিয়ে অস্ত্র হাতে ছুটলাম।
আসলো নির্বাচনের বছর ২০১৮,, কাছের মানুষেরা বলল জীবন সাবধান। এবার তুমি একটা ধাক্কা খাবে মনে হচ্ছে। পেশার চেয়েও নিজের জীবন বড়। জীবনকে ভালোবাসো৷ কিন্তু আমিতো সত্যকে ভালোবাসি। ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম, একের পর এক ছবি সমালোচনার ঝড়।

ঘটনা ২০১৮

কোটার পক্ষে শাহবাগের রাজপথে চার পাঁচজন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে আন্দোলনকারীর ঘুমন্ত অবস্থার দৃশ্য, মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত হলে আলোচনা সমালোচনার ঝড় ওঠে। আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

ঘটনা ২০১৮

কিছুদিন আগে বিএনপির কর্মীদের পুলিশের গাড়ি ভাংচুর, ম্যাচের কাঠি দিয়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন, গাড়ির উপরে লাফিয়ে গাড়ি ভাঙ্গার দৃশ্য এবং বিএনপি নেত্রীর দগ্ধ গাড়ির সামনে সেল্ফি তোলার দৃশ্য বেশ সমালোচনার ঝড় তুলেছিল।

ঘটনা ২০১৮

এরপর ইজতেমা মাঠে ছোট ছোট শিশুদের মাদ্রাসা থেকে ধরে এনে ছেড়ে দেয়া হয়। দুদলের সংঘর্ষের মধ্যে। এই রকম ছোট্ট একটি শিশু সংঘর্ষের ভিতর থেকে ছুটে এসে পুলিশকে জাপটে ধরে বাঁচার আকুতি জানায়। এমন দৃশ্য ভাইরাল হবার পরে ছবি নিয়ে ওঠে আলোচনা সমালাচনা।

৩০ তারিখ দুপুরে অন ডিউটিতে ছিলাম। খবর পেলাম মিরপুর-১০ এ ককটেল বিস্ফোরণ। ছুটে গেলাম। ছবি তুললাম। অন্যান্য চ্যানেলের সহকর্মীরাও যে যার ডিউটিতে। একজন এসে বাঁধা দিলেন। ক্যামেরা ছিনিয়ে নিতে চাইলেন। কিন্তু আমি দিলাম না। আমার শক্ত হাতে আমার শক্তির এক মাত্র উৎসকে রক্ষা করতে চাইলাম। আমারে ধরে নিয়ে যাওয়া হল একটা জায়গায়। বদ্ধ জায়গায়। আবার ধস্তাধস্তি ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার। আমার হাত আরো শক্ত করে ধরল ক্যামেরা। এর পর শুরু হল একের পর এক আঘাত। হাতের উপর শক্ত লাঠি দিয়ে পিটানো হল। ৪০/৫০ জন মানুষ মারতে থাকল একের পর এক। চোখে আঘাত করল, ভেবেছিলাম অন্ধ হয়ে যাব। চোখে রক্ত জমে গেল! ভেবেছিলাম মেরে ফেলবে আমায়৷ কিন্তু আমাকে ধরে আনার সময় আশে পাশে লোকজন দেখে ফেলেছে, তাই মেরে ফেলাটা উচিত হবে না বলে ওরা আমায় জানে মারল না।

আমি ছবি তুলি, ছবিতে রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত দৃশ্য ছাপে। তবে কি আমিও কখনো ক্ষত বিক্ষত ছবি হয়ে ছেপে যাব পত্রিকার পাতায়?

বিদায় ২০১৮। দেখা যাক ২০১৯ নতুন বছর আমার জীবনে নতুন কি ঘটনা নিয়ে আসে।