• বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫  |   ২৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

বনভূমি হ্রাসে বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশ

  হাসান তামিম ০১ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪৮

বনভূমি
বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশ (ছবি : সম্পাদিত)

উদ্ভিদ, প্রাণি ও মানুষকে ঘিরে সার্বক্ষণিক যে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিরাজমান সে পারিপার্শ্বিক অবস্থাই হলো পরিবেশ। সুস্থ এবং সুন্দরভাবে জীবনযাপনের জন্য এই পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভালো হওয়াটা খুব জরুরি। তবে এই পারিপার্শ্বিক অবস্থা কখনো অনুকূলে, আবার কখনো অনুকূলে নাও থাকতে পারে।

পরিবেশ তৈরি হতে প্রয়োজন পানি, বাতাস, মাটি, উদ্ভিদ,  প্রাণি ও মানুষ। চারপাশে বিদ্যমান বিভিন্ন সজীব এবং নির্জীব উপাদান ও পরিবেশের অংশ হতে পারে। পরিবেশের ওপর প্রভাব সৃষ্টিকারী সবচেয়ে বড় উপাদান হলো প্রাকৃতিক পরিবেশ। কেননা প্রাকৃতিক পরিবেশই প্রাণিকূলের ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবেই প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। আর প্রাকৃতিক পরিবেশের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো উদ্ভিদ বা বনভূমি। অথচ আমাদের দেশে এই বনভূমি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। যা ভয়াবহ ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়।

প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশের মোট আয়তনের তুলনায় ২৫ ভাগ হওয়া অপরিহার্য, কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ খুবই কম। সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে আমাদের দেশের বনভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ১৭ ভাগ আর ইউনেস্কোর মতে মাত্র ১০ ভাগ।

ক্রমাগতভাবে বনভূমি আর অবাধে গাছ কাটার ফলে দিন দিন এর পরিমাণ আরও কমে আসছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্রের ওপর। পরিবেশে প্রাণিকূলের নিঃশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অক্সিজেনের স্বল্পতাও দেখা যাচ্ছে।

মানুষজন নির্দয়ভাবে গাছ কাটার জন্য বনাঞ্চল ধ্বংসের পথে। আবার ইটভাটাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কাঁচা গাছ পোড়ানো হচ্ছে। এতে করে একদিকে, যেমন জীববৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে। অপরদিকে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের ইটভাটাগুলোতে অবাধে ইট তৈরির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কাঁচাগাছ ও কাঠ। যদিও ইটভাটায় গাছ বা কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার নিষিদ্ধ, কিন্তু সরকার কোনোভাবেই তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে প্রায় ৩৩ শতাংশই কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে প্রায় ৮ হাজার ইটভাটা রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই সনাতন পদ্ধতিতে ইট তৈরি করছে। আর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে গাছ বা কাঠ। এতে দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে দেশের বনভূমি।

বন অধিদপ্তরের ‘বাংলাদেশ ফরেস্ট্রি মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭-২০৩৬’  শীর্ষক খসড়ায় ওঠে এসেছে,  বিগত ২৫ বছরে দেশে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমেছে। বনাঞ্চল রক্ষায় নেই সমন্বিত উদ্যোগ। বিদ্যমান প্রাকৃতিক বনের প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশই ধ্বংসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, দেশে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের মধ্যে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা সুন্দরবন ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলোই বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশে বনজ সম্পদের বর্তমান অবস্থা, বিরাজমান ঝুঁকির পাশাপাশি বন অধিদপ্তরের মহাপরিকল্পনায় বনভূমি ধ্বংসের তুলনামূলক তথ্য ওঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, গেল ২৫ বছরে সুন্দরবন কমেছে ১০ হাজার ৯৮০ হেক্টর। একই সময়ে শালবন ৬ হাজার ১৬০ হেক্টর এবং পার্বত্য বনাঞ্চল ৪৮ হাজার ৮১০ হেক্টর কমেছে। একইভাবে বাঁশবাগান কমেছে ৭৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর।

খসড়া মহাপরিকল্পনায় বন অধিদপ্তর বলেছে, দেশে যে বনাঞ্চল রয়েছে, সেগুলোও ধ্বংসের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিদ্যমান বনাঞ্চল রক্ষা করা ছাড়াও ৬ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে।

আমাদের দেশের বনাঞ্চল বা বনভূমি প্রাকৃতিক সম্পদের এক মহামূল্যবান উপাদান। প্রতিটি বন তার নিজস্ব স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, বরং এই বনভূমি এবং বনজ সম্পদের ওপর ভিত্তিহীন করেই বেঁচে আছে এদেশের লাখো কোটি মানুষ।

আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য  রক্ষায় বনভূমি বা গাছপালা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমানহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ুগত পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, তামাক চাষ, ভিনদেশী আগ্রাসী উদ্ভিদের কারণে বনাঞ্চলের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এছাড়া, বেশি ফসল উৎপাদনের প্রবণতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্প কারখানার বিকাশ, সনাতনী ইটভাটা, রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলেও উজাড় হচ্ছে বনভূমি। এর ফলে দেশেজুড়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করছে।

অবারিত সবুজের সমারোহ বৈচিত্র্যেময় বনভূমি মিলেমিশে সবুজ শ্যামলে পূর্ণ আমাদের বাংলাদেশ। পাহাড়ি চিরসবুজ, মিশ্র চিরসবুজ বন, উপকূলীয় সুন্দরবন এবং শালবন নিয়ে এদেশের বনাঞ্চল বিস্তৃত। তবে আশার বিষয় হচ্ছে গাছের ব্যাপারে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। নিজে থেকেই মানুষ গাছ লাগায়। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারের উচিত জরুরিভাবে দেশের বনভূমি বাড়ানোর জন্য ন্যাড়া পাহাড়গুলোকে কাজে লাগানো।

এজন্য এ বিষয়ে গবেষণার পরিধিও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থা নিতে হবে গবেষণার মাধ্যমে পরিবেশ-উপযোগী এবং জলবায়ু প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম এমন জাতের বৃক্ষ উদ্ভাবন করে তা রোপণের। তবেই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড