• বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

সত্যায়নের নামে হয়রানি!

  মো. নূরুল বশর ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:৫৭

সত্যায়ন
ছবি : প্রতীকী

‘কাগজপত্র গুছিয়ে বাইরে নিয়ে গেলাম চায়ের দোকানে। চা নাস্তা করিয়ে বুঝিয়ে বললাম এইসব সাইন করতে টাকা লাগে এইসব ধারণা ভুল। আর উনার বাপকেও যেন উনি এটা বলেন। আর যে কোনো প্রয়োজনে নির্দ্বিধায় নক করতে বললাম।’
 

বিড়ম্বনা, ঘটনা -১ 

সদ্য চাকরিতে প্রবেশ করেছি। পোস্টিং ভাগ্যগুণে (দোষেও হতে পারে) নিজ এলাকায়। প্রায় আমার সমবয়সী এলাকার এক হাফেজ হুজুর একদিন আমাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমি কখন ফ্রি থাকি। কলেজ টাইম বাদে বাকি সময় ফ্রি থাকি, তাই বললাম দুপুরের পর যে কোনো সময়।

শহরের ভাড়া বাসায় থাকি তাই উনি এলাকা থেকে আসার আগে আমার সময় জেনেই একদিন দেখা করতে আসলেন। হাতে থাকা একটা কাগজের ছোট প্যাকেট থেকে দুই তিনটা কাগজ বের করে বললেন সাইন লাগবে এই কাগজগুলোতে (সীলের কথা বলেননি)। উনার কী একটা কাজে যেন লাগবে। আসল কপিগুলো দেখে সত্যায়ন করে দিলাম। যাওয়ার আগে আমার দিকে কিছু কাগজের টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। উনার বাবা নাকি বলেছেন ক্যাডার সাহেবরা সাইন করলে টাকা দেওয়া লাগে।

উনি আমার সমবয়সী আর হাফেজদের আমি সবচেয়ে বেশি সম্মান করি। এদেরকে আমার সুপার হিউম্যান বলেই মনে হয়। এদের চেয়ে বেশি মেধাবী আমার অন্য কাউকে মনে হয় না। কাগজপত্র গুছিয়ে বাইরে নিয়ে গেলাম চায়ের দোকানে। চা নাস্তা করিয়ে বুঝিয়ে বললাম এইসব সাইন করতে টাকা লাগে এইসব ধারণা ভুল। আর উনার বাপকেও যেনো উনি এটা বলেন। আর যে কোনো প্রয়োজনে নির্দ্বিধায় নক করতে বললাম। 

ঘটনা -২

আমার ছোট মামার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়ের এক হুজুর কোনো এক মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে আবেদন করবেন। তাই উনার কিছু কাগজে সত্যায়ন করতে হবে। উনার সাথে পূর্ব পরিচয় না থাকলেও উনিও একদিন কল দিয়ে সময় চাইলেন দেখা করার। সোজা বাসায় চলে আসতে বললাম। কাগজপত্র সব সত্যায়ন করার পর উনি আমাকে ডিনারের দাওয়াত দিলেন। উনি এখনও বেকার আর শুধু কিছু কাগজে সাইন করার কারণে টাকা দিতে লজ্জা লাগছে বলেই এই অফার। কিছু না বলে উনাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে নাস্তা করালাম আর বললাম এই ধরনের ধারণা যেন মন থেকে মুছে ফেলেন। উনি লজ্জায় কিছু বলতে পারলেন না। এরপর উনি আরেকবার উনার আরেক সহপাঠীসহ এসেছিলেন কাগজ সত্যায়িত করতে। সেইবার উনি আর এই ধরনের অফার দেননি।

ঘটনা -৩

বুধবার (৫ ডিসেম্বর) বিকালে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করে বাইরে থেকে নাস্তা করে এসে বাসায় সন্ধ্যায় একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ। বাসায় থাকা ভাতিজি দরজা খুলতেই এক মেয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমি বাসায় আছি কি না। কলেজের ইউনিফর্ম গায়ে থাকায় আমার ভাতিজি বুঝে নিল মেয়েটি কলেজের ছাত্রী। ভাতিজি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল আমার নাকি কলেজের ছাত্রী এসেছে দেখা করতে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।

বাসায় আমরা দুই ভাই থাকি। সঙ্গে একদম বড় ভাইয়ের দুই মেয়ে। বড় ভাই সরকারি বালিকা স্কুলের শিক্ষক। উনি দীর্ঘদিন এই স্কুলে থাকায় আর এই বাসায় থাকার কারণে উনার কিছু স্টুডেন্টকে মাঝেমধ্যে স্যারের সাথে দেখা করতে আসতে দেখা যায়। আমার ভাতিজিগুলো তাদের আপ্যায়ন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় কেননা বড়ভাই আবার আপ্যায়নে ঘাটতি রাখেন না।

আমি মহিলা কলেজে চাকরি করার প্রেক্ষিতে কাউকে আমার বাসার ঠিকানা দিই না। সবসময় দূরত্ব বজায় রাখার একটা প্রচেষ্টা আমার মধ্যে থাকে। তাই হঠাৎ কলেজের কেউ বাসায় আসছে শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খাইলাম। গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে রুম থেকে বের হলাম। মেয়েটি সালাম দিয়ে বলল সে আমার কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালে কলেজ থেকে পাশ করে গেছে। এখন অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

কোনো এক এনজিওতে আবেদন করবে তাই কিছু কাগজে সত্যায়ন করতে হবে। আমার ঠিকানা নাকি বাড়িওয়ালার মাধ্যমে জানছে। বাড়িওয়ালা নাকি উনার আত্মীয়। আর কিছু জিজ্ঞেস না করে তাদের ভাষায় সাইন দিয়ে দিলাম। বাসায় থাকা পিচ্ছিগুলোকে বলে চা আর ফ্রিজে থাকা মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করলাম। যাওয়ার সময় ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কিছু কাগজের নোট টেবিলে রেখে চলে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে ডেকে বললাম, ‘আপনি মনে হয় ভুলে কিছু ফেলে যাচ্ছেন।’

উনি প্রত্যুত্তরে জানালেন, ‘ডাক্তারদের চেম্বারে গেলে দুই এক মিনিট দেখেই উনারা বড় অঙ্কের ভিজিট নেন। আপনারা তাদের চেয়ে কম মেধাবী নন। তাই কিছু.... রেখে গেলাম।’ হালকা বকাঝকা করলাম আর এইভাবে ভুলেও কখনো কোনো শিক্ষককে অপমানিত না করার পরামর্শ দিয়ে উনাকে বিদায় দিলাম। 

ঘটনা-৪

২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ৩৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম। এরপর ৩৬ ও ৩৭ তম বিসিএসেও ভাইভা দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে ৩৬তম বিসিএসের যখন ভাইভা দিই তখনো আমার জয়েনিং হয়নি। শুধুমাত্র সুপারিশপ্রাপ্ত। তাই ভাইভা দেওয়ার আগে ডকুমেন্টগুলো যখন সত্যায়নের প্রয়োজন পড়ল তখন বিপদে পড়ে গেলাম। আশেপাশে পরিচিত ক্যাডার কাউকে পাচ্ছিলাম না সত্যায়ন করতে।

শুনলাম কাটাবনের পাশে পরিকল্পনা কমিশনের ওখানে যারা অফিস করেন সেখানে ক্যাডার কর্মকর্তাও আছেন। তাদের দ্বারা সত্যায়িত করব চিন্তা করে সেখানে গেলাম। ঢুকতেও দেননি। এরপর খবর নিলাম ক্যাম্পাসের মধ্যে থাকা ব্যানবেইসে শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকেন। সেখানে গেলাম। সত্যায়নের কথা শুনে অনেক কর্মকর্তা দরজা খোলার প্রয়োজনবোধ করলেন না। দরজার বাইরে থেকেই বিদায় জানালেন। নিরাশ হয়ে ফিরে আসলাম।

ঢাকা কলেজ পাশে ছিল। চিন্তা করলাম সেখানে যাব। নিরাশ হলাম যখন শুনলাম ১টার পর কলেজে কাউকে নাকি পাওয়া যায় না। অবশেষে ৩৪তম বিসিএসের হলের এক বড় ভাই উনার কী এক কাজে ঢাকায় আসছেন শুনে উনার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। উনি নাকি সীল নিয়ে আসেননি। অবশেষে নীলক্ষেত থেকে উনার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে উনার নামে একটা সীল বানিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করে পরিত্রাণ মিলল।

লেখক : ৩৫তম বিসিএস ক্যাডার (সাধারণ শিক্ষা), প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড