• মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৬  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

শিরোনাম :

থেরেসা মে : ব্রেক্সিট ইস্যুতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভোট জানুয়ারিতে||'নির্বাচনে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের পদক্ষেপ আহ্বান'||রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রস্তাব আলোচনা বর্জন করেছে চীন ও রাশিয়া||৩০০ কোটি টাকায় দুটি রুশ হেলিকপ্টার কিনছে বিজিবি||বরখাস্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ হোসে মরিনহো||সু চি’কে দেওয়া পুরস্কার প্রত্যাহার করল দক্ষিণ কোরিয়া||নির্বাচনি পরিবেশ স্বাভাবিক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডও বিদ্যমান : সিইসি||জামায়াতের ২২ নেতার ‘ধানের শীষ’ বাতিলে আদালতে রুল||যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে বিএনপি   ||প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধের অঙ্গীকার করল বিএনপি 

বাবা হেরে গেলে সন্তানও হেরে যায়!

  অধিকার ডেস্ক    ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১০:০৮

বাবা
ছবি : প্রতীকী

তখন বুঝতাম না। বাবার ওপর অভিমান হতো। রাগ হতো। এখন বুঝি, কোনো বাবাই তার সন্তানের কাছে নিজের পরাজিত মুখের ছবি দেখাতে চান না। বাবা হেরে গেলে যে সন্তানও হেরে যায়!
    
ঋদ্ধির জন্য রোজ বাসায় ফেরার সময় কিছু না কিছু নিয়ে যাই। সেটা ১০০ টাকা দামের জিনিসই হোক, এক টাকার চকলেট, ঋদ্ধি যে খুশিটা হয়, সেটার দাম কোটি টাকারও বেশি।

সে দিন ঋদ্ধি হুট করে তার দাদাকে বলে বসল, ‘আমার বাবা আমার জন্য কত কিছু এনে দেয় দেখেছ। চককেট দেয়, চুংগাম দেয়...।’ দৌড়ে গিয়ে স্কুলের জুতাটা নিয়ে এলো, ‘দেখেছ, বাবা আমাকে কত সুন্দর জুতা কিনে দিয়েছে। আমার বাবার তো জুতা নাই। তুমি বাবাকে জুতা কিনে দাও না কেন?’

ছোটবেলায় আব্বার কাছে তেমন কিছুরই আবদার করতাম না। আব্বা তখন পুরোপুরি বেকার। ব্যবসা বন্ধ, আয় বন্ধ। মাসের পর মাস বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ছে। রোজ বাসায় বাড়িওলার হুমকি–ধমকি। পাওনাদারদের অস্বস্তিকর আনাগোনা। ছোট ছিলাম, কিন্তু বুঝতাম ঠিকই।

আব্বা কিন্তু তবু এতটুকু নুয়ে পড়েননি আমাদের সামনে। কারেন্টের লাইন কেটে দিল। আব্বা তখন আমাদের বিদ্যাসাগরের গল্প শোনাতেন। কীভাবে চাঁদের আলোয় বিদ্যাসাগর পড়াশোনা করতেন। 

শহুরে চাঁদ বড় কৃপণ। আমরা তাই বাসার সামনের ল্যাম্পপোস্টের আলোতে পড়েছি। আব্বা বলতেন, তিনি ১০–১২ মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন। আমি ক্লাস ফোর–ফাইভে পড়ার সময় থেকেই ৫–৬ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে গেছি। খাতা দূরের কথা, নিউজ প্রিন্টই কেনার টাকা নেই। আমরা আব্বার দোকানের প্যাড–ক্যাশ মেমোগুলো চুরি করে করে বের করে ওখানেই অংক করতাম।

আব্বা এক সময় জানালেন, কৃষি কাজের চেয়ে বড় কোনো কাজ নেই। ক্লাস এইটে পড়ার সময়, এসএসসি থেকে মাত্র দুই বছর দূরে থাকতে ভালো ছাত্রের পরিচয় মুছে ফেলে চলে গেলাম গ্রামে। 

টানা আট মাস আমি, আব্বা আর আমার বড় ভাই তিনজন মিলে কৃষকের কাজ করেছি। সারা দিন রোদ মাথায় নিয়ে ক্ষেতে কাজ করার পর সন্ধ্যায় দুই ভাই মিলে রান্নাও করতাম।

আব্বা তখনও আমাদের কাছে হেরে যেতে চাননি। নিজের ব্যর্থতা আড়াল করে রাখতে চেয়েছেন। আমরাও কোনো আবদার করিনি কখনো। বরং নিজের কাছে খারাপ লাগত, এসএসসির ফরম ফিলআপের টাকা দিতে আব্বাকে পুরো এক বস্তা চাল বেচে দিতে হয়েছে। যে এক বস্তায় আমাদের বাসার সবার তিন মাসের খাবার জুটে যেত!

এসএসসি পরীক্ষা আমার কাছে আক্ষরিক অর্থেই তাই ছিল জীবনের লড়াই, জীবনের পরীক্ষা। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি ছয়টা মুখের তিন মাসের ভাতের টাকায়!

এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করেছিলাম বলে আব্বা অবাক করে দিয়ে আমাকে জোর করে ক্যাসিও ঘড়ি কিনে দিল। নিতামই না। কিন্তু নিয়েছিলাম। ক্লাস থ্রিতে রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তির সময় আব্বা আমাকে চাকাওলা জুতো কিনে দেবে বলে বলেছিল। দেয়নি, এর বদলে আশাহি নামের খুবই সস্তা একটা ঘড়ি কিনে দিয়েছিল। 

আব্বা হয়তো মনে রেখেছিলেন। তাই এই ক্যাসিও ঘড়ি। কিন্তু ৭০০–৮০০ টাকা দামের ঘড়ির টাকা জমাতে আব্বাকে কার কাছে হাত পাততে হয়েছিল, আমি জানি না!

আমরা অনেকেই বাবাদের এই কষ্টটা বুঝি না। যে বাবা ভাঙা একটা সাইকেল চালান, তার কাছেই জোর করি পালসার কিনে দিতে হবে। না হলে যে বন্ধুদের কাছে প্রেস্টিজ থাকছে না! যে বাবা ছয় মাস আগে নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিসপ্লের অন্ধ মোবাইলটাই ব্যবহার করছে, তার কাছে দামি একটা ফোন কিনে দিতে বলি। না দিলে কত অভিমান, অনুযোগ, রাগ!

‘কী দিসো তুমি আমাকে? কিছুই তো দাও না’ বলে গাল ফুলিয়ে দুই দিন ভাত খাওয়া বন্ধ। 
পরে বাবাই এসে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। প্যাকেট খুলতেই বেরিয়ে পড়ে চকচকে নতুন মোবাইল, ল্যাপটপ!

ভাঙা সাইকেলে প্যাডেল চালানো বাবা ঠিকই কী করে যেন ছেলেটাকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দেন! 
বাবারা যে সন্তানের কাছে নিজের পরাজিত মুখ দেখাতে চান না। বাবারা হেরে যাওয়ার ভয় পান। ভয় পান, আমি হেরে গেলে আমার ছেলেটা, আমার মেয়েটা লড়াইয়ের সাহসও হারিয়ে ফেলবে।

আমাদের বাবারা যতই ব্যর্থ–অসফল মানুষ হন, আমাদের প্রত্যেকের কাছেই আমাদের বাবা হিরো। সুপার হিরো।
সব সুপার হিরোর স্পাইডার ম্যান, সুপারম্যানদের মতো বাহারি রকম রঙের জামা থাকে না। সাধারণ একটা লুঙ্গি, তিলে পড়া একটা গেঞ্জি পরারাও সুপার হিরো হয়।

আর সত্যিকারের সেই সুপার হিরোরা কখনো হারে না। হারতে পারেই না!

(লেখক ও সাংবাদিক রাজীব হাসানের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত) 
 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড