• সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন

বঙ্কিমচন্দ্র ও বর্তমান বাস্তবতা

  পারভেজ আহমেদ ২৯ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪৬

পারভেজ
পারভেজ আহমেদ (ছবি : সম্পাদিত)

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল এক নাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। তার হাত ধরে বাংলা সাহিত্য তার পূর্ণ মর্যাদা লাভ করেছে। কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, তার কাছে ঋণী বাংলা সাহিত্যের প্রত্যেক সাহিত্যিক। বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিকের জন্য আশির্বাদ স্বরুপ। কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ প্রবন্ধে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যাহারা সাহিত্য ব্যবসায়ী তাহারা বঙ্কিমের কাছে কী যে চিরঋণে আবদ্ধ তাহা যেন কোন কালে বিস্মৃত না হন।’

বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাস্যরসকে বাংলা সাহিত্যের মাঝে এনে তাকে উচ্চ শ্রেণিতে উন্নীত করেন। এর পূর্বে কেবল প্রহসনের মাধ্যমে হাস্যরসের দেখা পাওয়া যেত। তা রচনায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র সর্বপ্রথম প্রমাণ করে দেন যে, প্রহসন জাতীয় রচনার মাঝে হাস্যরস আবদ্ধ নয়, বরং এ হাস্যরস সাহিত্যের প্রত্যেক শাখায়, প্রত্যেক বিষয়ে আলোকিত হয়ে ওঠতে পারে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসের জনক, প্রথম রোমান্টিক সংলাপের রচয়িতা হিসেবে যতটা পরিচিত একজন বাস্তববাদী লেখক হিসেবে তিনি ততটা পরিচিত নন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাস্তববাদী লেখক হিসেবে তাকে গণ্য করা যেতে পারে।

বাংলা সাহিত্যের মাঝে তিনি কতটা বাস্তববাদী লেখক তা তার লেখার মাঝে ফুটে উঠেছে। মূলত তিনি তার উপন্যাস ও প্রবন্ধের মাঝে তার সাহিত্য প্রতিভাকে বিকশিত করে তুলেছেন। আর এগুলোর মাঝেই ওঠে এসেছে তার বাস্তবধর্মীতা।

গত কয়েক বছর ধরে সমগ্র বাংলাদেশে শিক্ষার মুক্তির আন্দোলন নিয়ে খুবই হইচই চলছে। বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এ দেশের শিক্ষাকে রক্ষা করার জন্য সময়ে সময়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। কিন্তু এতে তারা কোনো সুফল পাচ্ছেন না। বরং জনসম্মুখেই বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টি বাবুদের জয়রথ ছুটেই চলছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার লোক রহস্য রচনা ‘বাবু’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘যাহারা বিনা উদ্দেশ্যে সঞ্চয় করিবেন, সঞ্চয়ের জন্য উপার্জন করিবেন, উপার্জনের জন্য বিদ্যাধ্যয়ন করিবেন, বিদ্যাধ্যয়নের জন্য প্রশ্ন চুরি করিবেন তাহারাই বাবু।’

বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে এমনটা হয়েছে কী না তা ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যা শিক্ষার যে রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি তা বঙ্কিমচন্দ্রের দেখানো কিনা যে, এভাবে উপার্জন করতে হবে? না কি বিদ্যা শিক্ষা আর উপার্জন সম্পর্কে এটা তার ভবিষ্যদ্বাণী?

বাংলাদেশে বিদ্যা শিক্ষার নেপথ্যে প্রশ্ন চুরির মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। সর্বশেষ ১২ অক্টোবর ২০১৮-এ ২০১৮-২০১৯ সেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে এবং তার সত্যতাও পাওয়া যায়। এ কারণে ৬ জনকে আটক দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হয়, এসব প্রশ্ন জালিয়াতির পেছনে বড় কোনো ধরনের হাত আছে। আর এ জন্যই বুঝি বঙ্কিমচন্দ্র তাদেরকে নিয়ে লিখতে তিনি নিজেও অসম্মান করেন নি। যথাপ্রাপ্য সম্মানের সাথে তাদের বর্ণনা করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের গত কয়েক বছরের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোর থেকে এ বছর ফলাফলের হার প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গছে।

প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এবারের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ হাজার ৪৬৩ জন। এ বছর ভর্তিচ্ছু আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ৯৫ হাজার ৩৪১ জন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ৭০ হাজার ৪৪০ জন শিক্ষার্থী। যা শতকরা হারে পাস করে ২৬ দশমিক ২১ শতাংশ।

এর আগে ২০১৩-১৪ সেশনে ‘ঘ’ ইউনিটে পাসের হার ছিল ১১ দশমিক ৪ ভাগ, ২০১৪-১৫ সেশনে ছিল ১৬ দশমিক ৫৫ ভাগ, ২০১৫-১৬ সেশনে ৯ দশমিক ৯১ভাগ, ২০১৬-১৭ সেশনে ৯ দশমিক ৮৩ এবং ২০১৭-১৮ সেশনে ১৪ দশমিক ৩৫ ভাগ। অনেক বলে থাকেন, ‘চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা।’ যে বিদ্যা মহান তার ফল কেন কম যাবে!

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাস্তবধর্মীতার এখানেই শেষ নয়। তার লেখা রম্যরচনা পুরোপুরি বাস্তবতায় ভরপুর। ‘কমলাকান্তের জবানবন্দী’ সম্পর্কে আমরা কে না জানি? আদালতের অভ্যন্তরে যে ভুলগুলো হয়ে থাকে তা আয়নার মতো কী সুন্দর অবয়ব ওঠে এসেছে এ রচনায়। এছাড়াও আরো বাস্তবধর্মীতার দেখা পাওয়া যায় তার রচিত রম্যরচনা ‘পলিটিকস’ এর মাঝে।

এখানে তিনি হাস্যরসের মাধ্যমে যে রাজৈতিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা আমাদের বর্তমান বাস্তব সমাজের রাজনৈতিক চরিত্রের মাঝে বিদ্যমান। তাই যদি কেউ বলে, এসব রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বঙ্কিমের লেখা পড়ে রাজনীতি শিখেছে এ কথায় ভুল বলা হবে না।

বিশ্বের প্রত্যেক সরকার জাতীয় রাষ্ট্রে সরকারি দল আর বিরোধী দলের মাঝে সংঘর্ষ লেগেই থাকে। স্বভাবতই সরকারি দল শক্তিশালী এবং তার প্রতিরোধ আর প্রতিবাদ করার ক্ষমতা তুঙ্গে। তাদের কৌশলের চেয়ে গায়ের জোরটাই দেখার মতো। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও এমনটা বলে দিয়েছেন উনিশ শতকের শেষের দিকে। বর্তমান বাংলাদেশে তার উজ্জল এক দৃষ্টান্ত আমরা নিজ চোখে দেখছি।

বঙ্কিমের ‘পলিটিকস’ রচনায় দু’ ধরনের পলিটিশিয়ানের দেখা পাই। একদল কৌশল প্রেমী আর অন্যদল শক্তিপ্রেমী। একদল হলো কুকুর জাতীয় আর অন্যদল হলো ষাঁড় জাতীয়। রাজনীতির ময়দানে কৌশলী বা কুকুর জাতীয় পলিটিশিয়ানরা অসহায় যা একটা দেশের বিরোধী দলের মতো। এরা কৌশলে কাজ উদ্ধার করতে গিয়ে যখন নাকানি-চুবানি খেয়ে লেজ গুটিয়ে পালায় তখন ঘেউ ঘেউ করে পাড়া জানিয়ে দিয়ে যায় কার্য উদ্ধারে বাধাবিপত্তি আসার কারণে। তারপরেও এরা যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট।

ষাঁড় জাতীয় পলিটিশিয়ানদের থাকে লড়াই করার মতো ক্ষমতা ও সম্পদ। তার শরীর হলো গণ্ডারের চামড়া প্রতিরোধের ঢাল হলো শিং। যতই কথা আর আঘাত আসুক এদের গায়ে লাগে না। সে তার কাজ উদ্ধার করে অবকাশে হাই তুলে তবে সে প্রস্থান করে। কলুর স্ত্রীর মতো প্রাণীরা কুকুরকে ইট দিয়ে আঘাত করে তাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু ষাঁড়ের মতো পলিটিশানদের পারে না। কারণ, এরা শিং তুলে তাড়া করে আসে কলুর স্ত্রীর দিকে।

লেখক : শিক্ষার্থী, এম সি কলেজ, সিলেট।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড