• সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন

স্মৃতিচারণা

সেই যে আমার নানান রঙের দিনগুলো

  অধিকার ডেস্ক    ২৫ অক্টোবর ২০১৮, ১২:৫১

তামান্না জেনিফার
সব একই থাকলেও বদলে যায় জীবনের গল্প (মডেল : তামান্না জেনিফার)

আমি বড় হয়েছি একটা গরপরতা মধ্যবিত্ত ঘরে। যেখানে স্বপ্নগুলোও দেখতে হতো খুব ভেবেচিন্তে। আমার ছেলেকে একটা খেলনা কিনে দিলে সেটা বড়জোর দুদিন টেকে, আর আমরা একটা পূজোর মেলায় হাড়িপাতিল কিনতাম আর পরের পূজোর মেলা পর্যন্ত সেগুলো দিয়ে খেলতাম। নিজের হাতে পুতুল বানিয়ে মায়ের পুরোনো শাড়ির আঁচল ছিড়ে সেই পুতুলের শাড়ি বানাতাম।  

আমার আব্বু আম্মুর মধ্যে খুব ভালোবাসা ছিল। ছুটির দিনগুলোতে দেখতাম আম্মু শাড়ি কোমরে জড়িয়ে ঘর পরিষ্কার করা শুরু করত। আমার আম্মু চেয়ারে দাঁড়িয়ে ঘরের ঝুল ঝারতো আর আব্বু চেয়ারটা ধরে রাখত। আর কিছুক্ষণ পর পর হেসে উঠতো। আমরা দুবোন ঘরময় ছোটাছুটি করতাম। আম্মু মাটির চুলায় রান্না করতো আর আব্বু পাশে চেয়ারে বসে থাকতো আর আমি আব্বুর কোলে।  

আম্মু অফিসে গেলেই আমরা দুবোন ঘুরতে বের হয়ে যেতাম। এখন আমার পাশের ফ্লাটে কে থাকে আমি জানি না।  আর তখন আমরা সারা পাড়া বেড়াতাম। সবাই ছিল আত্মীয়ের মতো। মাত্রাছাড়া দুষ্ট ছিলাম বলে বাড়িতে ফিরে মারও খেতাম। 

তবে আমরা যারা নব্বই দশকের পোলাপান এখনকার ওয়াইফাই বাচ্চাগুলার চেয়ে একটু আলাদাই ছিলাম। আমরা মাংস খাবার বায়না করার আগেও দুবার ভাবতাম আর এরা তো আইফোন চাওয়ার আগেও ভাবে না। আমাদের প্রেম মানে বাঁচবো মরবো একজনের সাথেই আর এখন ব্রেকআপ মেকআপ পান্তাভাত হয়ে গেছে। 

আমাদের সময় আমরা ছিলাম বইপোকা। লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়ার মজা আজকালকার ছেলেমেয়েরা বুঝবে না। কী সব দিন ছিল! হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল অথবা সাহস করে পড়ে ফেলা সমরেশ মজুমদার। আর ক্যাসেটে বাজতো কিশোর কুমার, মান্না দে, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা। কী মধুর ছিল সেই সুর! 

শুক্রবার তিনটায় বাংলা সিনেমা শুরু হতো বিটিভিতে। আমাদের উঠান ভরে যেত সেই সিনেমা দেখতে। তখন চ্যানেল ছিল ওই একটাই বিটিভি। পতপত করে ওড়া জাতীয় পতাকা দেখতেও কী যে ভালো লাগত! তখন একটা চ্যানেলে যে আনন্দ ছিল এখন শত চ্যানেলের ভিড়ে সে আনন্দ কই?

কুদ্দুস বয়াতি মাথা দুলিয়ে গাইতো এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে। এই দিনেরে নিয়ে যাইবো সেই দিনেরো কাছে— সেই দিন যে কোথায় এসে ঠেকেছে সেটাই এখন ভাবি। 

কী অদ্ভুদ ছিল দিনগুলো! আমরা কলাপাতা ঝিরিঝিরি করে চুল বানাতাম। সেই চুলগুলো আবার চিরল বিরল বেনী করতাম। তারপর আম্মুর ওড়না পেঁচিয়ে শাড়ি পরতাম।  

ইশ... কী সুন্দর ছিল দিনগুলো! মাটির হাড়িপাতিল, জুতোর বাক্সে পুতুলের সংসার, বান্ধবীর পুতুলের সাথে নিজের পুতুলের বিয়ে— সব মায়া ভালোবাসা বুকে চেপে নিজের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে পুতুলটাকে শ্বশুরবাড়ী পাঠানো। 

কী অনাবিল শান্তি ছিল! টইটই করে ঘুরে বেড়ানো, রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এদোকাদা পুকুরে ডোবাডুবি, গা দুলিয়ে নামতা পড়া... 

আহারে! আলিফ লায়লার সেই সুর এখনো কানে বাজে। আমাদের উঠান ভরে যেতো আর আব্বু টিভিটা বাইরে সেট করে দিত। আমার কান খাড়া হয়ে থাকতো। সুরটা কানে এলেই বই ফেলে দৌড়। 

কতো দুস্টুমি! আম্মুর জগ, ঝাড়ু, সেন্ডেলসহ অদ্ভুদ সব জিনিসের মার, রংধনু দেখলেই ছোটাছুটি, প্রজিপতি ফড়িং এর পিছু ছোটা... 

ইশ! সুন্দর দিনগুলো শুধুই স্মৃতির পাতায় হাহাকার করে। 

ছোটবেলায় পুতুল দিয়ে খেলতাম। আজ দুটো জীবন্ত পুতুল আমার ঘরে। ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলতাম, আজও রান্নাবান্না খেলেই যাচ্ছি। 

সব একই আছে শুধু গল্পটা বদলে গেছে। 

লেখক : তামান্না জেনিফার, গৃহিণী
 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড