• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

বিদায় গানের কারিগর; কে শোনাবে আর রূপালি গিটার?

  অধিকার ডেস্ক    ২০ অক্টোবর ২০১৮, ২২:০২

সবে স্কুলের গন্ডি শেষ করব করব। আজ বাদে কালই এসএসসি। সহপাঠীদের সবাই তখন বই কলম নিয়ে ব্যস্ত, আর বাউন্ডেলে মন ডানা চড়ে বেড়ায় পেপসির কনসার্টে। বগুড়ায় বিশাল এক আয়োজন। ঘরের জানালা খুললেই শব্দ আসছে। অবশেষে যাওয়ার জন্যই মনঃস্থির করলাম। 

ভিতরে ঢুকেই শরণাপন্ন হলাম আবদুল্লাহ ভাই। আবদুল্লাহ ভাই আমাদের অনেক সিনিয়র এবং তিনিই এই কনসার্টের আয়োজক। তার কাছে গিয়েই বায়না ধরলাম আমি গ্রিনরুমে যাবো। আমার বলার ভঙ্গিমায় ভাই হাসছিলেন। তার একগাল হাসিতেই বুঝেছিলাম। এরপর ভাইয়ের হাতের ইশারায় চললাম তার পিছু পিছু। গ্রিনরুম, একটা লোক মাথায় ঝাকড়া চুল, পাশে একটা গিটার, সুন্দর সে লোকটা বিড়বিড় করে কি যেন বলছে আর মিনারেল ওয়াটারের বোতলে ডাবের পানি ঢালছে। চোখ আমার ততক্ষণে প্রায় চড়কগাছ। আবদুল্লাহ ভাই এগিয়ে গিয়ে- “বাচ্চু ভাই, আমার ছোট ভাই, একটু দেখা করতে আসছে”। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিল। আমিও হেসে দিলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম কিছু সময়ের জন্য। অতি মুগ্ধতায় আমি সব ভুলে গেছি, আমি শুধু তাকে দেখছি। সেদিন দু’ একটা কথা আমাকেও বলেছিল, তাও ঠিক করে মনে নেই। শুধু মনে আছে, বিদায় নেবার সময় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। ফর্সা রঙের সুঠাম দেহী ঝাকড়া চুলের এক লোক তার ব্রেসলেট ভর্তি হাত আমার মাথায় রেখে মুচকি হেসেই চলে গেল- ও হাত এক রকস্টারের হাত, খাঁটি রকস্টারের হাত। 

ক্যাসেটের যুগ, ভিসিডি তখনো বাজারে আসেনি। ক্যাসেটের দুইপাশেই গান থাকত, টেনে টেনে গান শুনতাম।  বাংলা সংগীতের তখন রমরমা দিন। দু এক সপ্তাহ পরপরই কোন না কোন এ্যালবাম বাজারে আসতো। কখনো জেমস, কখনো আইয়ুব বাচ্চু, কিংবা যুগল অথবা হাসান নাহলে বিপ্লব। স্কুল ফেরার পথেই ক্যাসেটের দোকানে খোঁজ নিয়ে আসতাম নতুন এ্যালবাম আসছে কবে। টিফিনের টাকা থেকে একটু একটু বাঁচিয়ে ৩৫ টাকা রেডি রাখতাম। সবার আগের কপিটা আমার চাই এজন্য মাঝে মাঝে অগ্রিম টাকাও দোকানে দিয়ে আসতাম। তবে বিকালে খেলার মাঠে জেমস গ্রুপ আর বাচ্চু গ্রুপ আলাদা আলাদা হয়ে যেতাম। তুমুল তর্ক বাঁধিয়ে দিতাম, কে সেরা এই নিয়ে। মাঝে মাঝে দুই দলের খেলাও হতো। 

জীবনের টানে একসময় মফস্বল ছেড়ে ঢাকা।  কতই না কনসার্ট এ গিয়েছি শুধু আইয়ুব বাচ্চু কে দূর থেকে দেখবো বলে। স্কুলের সেই কৈশোরের প্রেমে ব্যর্থতা আমার মত কত যুবকের চোখ অশ্রুসজল করেছে ঐ মায়াবী কন্ঠ কে জানে? কত রাত্রি জাগরণে, কার সঙ্গী হয়েছে এই গান- তার নিকাশই কে’বা করবে? কে অমন করে সুরেলা হয়ে গভীর রাতে খোলা আকাশের নিচে হাটাবে? কে ভাগ বসাবে তোমার আকাশে গুনে রাখা তারায়? 

মহান সে মানব। কি-বোর্ড  বাদক এস.আই টুটুল ব্যান্ড ছেড়ে চলে গেলে তিনি বলেছিলেন, এলআরবি’তে আর কখনোই কি-বোর্ড বাদক থাকবে না। এই জায়গা টুটুলের জন্যই থাকবে। না, আর কেউ এলআরবি’র হয়ে আর কেউ কী-বোর্ড বাজায়নি। আমার  মনে আছে ঢাকা ভিত্তিক এক ব্যান্ড  শিল্পী সোস্যাল মিডিয়ায় তাকে দিনের পর দিন তীর্যকভাবে আক্রমণ করেছেন। অনেক আজে-বাজে কথা ব্যঙ্গ করে লিখেছেন। বাচ্চু ভাই কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু কিছু বলেননি।  দেশের অনেক বিখ্যাত শিল্পী আজ এ পর্যন্ত আসছে বাচ্চু ভাইয়ের ছত্র ছায়ায়। 

এমন একজন মানুষও পাওয়া দুষ্কর যার কাছে বাচ্চু ভাইয়ের গান ভাল লাগেনি কিংবা তার নাম কান অবধি পৌঁছায়নি। ছোট বাচ্চাকে পর্যন্ত বাচ্চু ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে কটকট করে বলে দিবে- সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে? কিংবা হাসতে দেখ, গাইতে দেখ... 

শুধু তার গাওয়া গানের জন্যই তিনি বিখ্যাত নন। তিনি এ উপমহাদেশের সেরা গিটারিস্ট ছিলেন। তার গিটার বাজানো শুনে আমরা কনসার্টে উম্মাদ হয়ে যেতাম। সত্যি বলছি উম্মাদ হয়ে যেতাম। কি জাদু, কি নেশা ছিল তার বাজানোতে!

আইয়ুব বাচ্চু নামটা শুধু মাত্র একজন সংগীত শিল্পী উপমা দিলে ভুল হবে। আইয়ুব বাচ্চু মানে একটা সময়, একটা কাল। খুব খেয়াল করে দেখবেন বাচ্চু ভাই এর কোন গান শুনলে হয়ত আপনাকে নিয়ে যাবে শৈশবের স্মৃতির দেয়ালে, হয়ত আপনার একাকীত্ব মনে জাগিয়ে দেবে আগের প্রেমের বর্নিল দিন, অথবা প্রথম প্রেমে ব্যর্থ বিরহীর মতো, নয়ত স্মৃতিকাতর করবে উদ্দাম বন্ধুত্বের মোহতায়, মনে হলে হতেও পারে আপনার সেদিনে আপনার বড় ভাইয়ের শ্যালিকার বিয়েতে নেচে উঠে মন ভড়ানো দিনের কথা। তার মানে  দাঁড়াচ্ছে আইয়ুব বাচ্চু আমাদের জীবনের কোন না কোন একটা সময়কে ধরে ফেলেছে। যা মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের মনে থাকবে।

এমন কিংবদন্তী বার বার আসেনা ওপারে ভালো থাকবেন আপনি। অনেক ভালো থাকবেন। বিনম্র সালাম আপনার কীর্তিতে। বেচে থাকুক এ সৃষ্টিগুলো, আর এর মাঝে বেচে থাকুন আপনিও।

Andy

 

লেখক-
অ্যান্ডি আদনান
লেখক ও নাট্য নির্মাতা

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড