• সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দৈনিক অধিকার নবান্ন সংখ্যা-১৯

গল্প : তাতাই উপাখ্যান

  কাজী সাবরিনা তাবাস্সুম

০৪ মার্চ ২০২০, ১৬:১৩
গল্প
একটু একটু করে ছায়াটা পরিণত হচ্ছে মানুষে (ছবি : সম্পাদিত)

শীতের সকালে আমগাছের চিকন কাণ্ড চিবুতে চিবুতে রোদ পোহাচ্ছিল তাতাই। হঠাৎ বহুদূরে চোখ পড়লো হেলতে দুলতে হেঁটে আসা বিশালদেহী একটা ছায়া! খুব পরিচিত সেই অবয়ব! কুয়াশা ভেঙে রোদের ঝাপটায় একটু একটু করে ছায়াটা পরিণত হচ্ছে মানুষে! দু’হাত ভর্তি রাজ্যের জিনিসে ঠাসা চটের ব্যাগ আর বুকের নিচে নেমে যাওয়া একগুচ্ছ দাঁড়ি। মাথায় টুপি, পরনে লম্বা জোব্বা। কোন পরিবর্তন নেই। সবসময় একরকম। তাতাই আমেগাছের ডাল ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করতে করতে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলো। নানাজান আইতাসে! আম্মা, নানাজান আইতাসে!

তাতাইয়ের চিৎকারে যেন ঘরে টেকা দায়! একে তো শীতের সকাল। বাড়ির পুরুষেরা আলস্য মাখা আবদারে এখনও বিছানায়। মহিলারা সন্তানদের উঠিয়ে গোসল করিয়ে রোদ পোহানোতে ব্যস্ত। বাড়ির চুলাটিও ধরানো হয়নি এখনও। সারা উঠান ঝাঁট দেওয়া বাকি। এমতাবস্থায় তাতাইয়ের হুল্লোড় যেন সবার সব কাজ থেকে মনোযোগ আকর্ষণে তৎপর! তাতাইয়ের হঠাৎ চিৎকার শুনে একজনের কলজে কেঁপে উঠলো! ধকধক শব্দে বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা তিড়িংবিড়িং করতে লাগলো। শিউলি, তাতাইয়ের মা তখন মাত্র রান্নাঘরে বড় উনুনটা ধরাতে ব্যস্ত! মেয়ের চিৎকার শুনে উনুন ফেলে এক দৌড়ে উঠানে হাজির! উত্তেজনায় আবিষ্কার করলো হৃৎপিণ্ডটা বুঝি লাফাতে লাফাতে বুক ফেটে বেরিয়েই আসবে! শিউলি ভেবে পেলো না সে কি আগে নিজের কলিজার নাচানাচি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি বাড়ির উঠোন পেরিয়ে পুকুরঘাট পর্যন্ত ছুটে যাবে বাপকে দেখার জন্য! বাপের পা ছুঁয়ে সালাম করবে নাকি বাপের বুকের ভেতরে মাথা রেখে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে? তাতাইয়ের কাছে দৌড়ে এসে বললো, ‘কদ্দূর আইলো?’

তাতাই উত্তেজনায় শুধু হাততালি দিচ্ছে। সে জানে নানাজান আসলে অনেক মজা হয়। নানাজানের নিজের হাতে লাগানো খেজুর গাছের রস, যা নানাজান সঙ্গে করে নিয়ে আসছে, তা দিয়ে আজ শিন্নী হবে বাড়িতে। শুধু তাতাই নয়, তার চাচাতো জেঠাতো ভাইবোনদেরও উত্তেজনার কমতি থাকেনা যেদিন তাতাইয়ের নানাজান বেড়াতে আসে। কেবল খুশি হতে পারেনা তাতাইয়ের দাদা দাদি, চাচা চাচিমা, জ্যাঠা জেঠিমায়েরা। শিউলির বাবা গ্রামের গণ্যমান্য বনেদী বংশের মানুষ। টাকা এবং সম্মান তার পূর্বপুরুষেরা যতটুকু অর্জন করে গেছে, তিনি সেটুকু রক্ষা করার সাথে সাথে সম্মান এবং সম্পত্তির প্রসার ঘটিয়েছেন প্রচুর।

এরকম একজন মানুষকে বাড়ি আসতে দেখলে খুশি না হবার কোন কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু মোল্লা সাহেবের উপস্থিতি তাতাইয়ের দাদাবাড়ির লোকজন কে খুব ভোগায়। তার কারণ হল অবস্থার তারতম্য। তাতাইয়ের বাপ চাচারা বনেদী পরিবার নয়। হয়ত তিন বেলা ভাতের বন্দোবস্ত হয়ে যায়, কিন্তু শীত আসলে রসের শিন্নী কিংবা কুরবানের ঈদ ছাড়া গরুর মাংসের কথা এই বাড়ির মানুষ চিন্তাও করতে পারেনা। ভরা বর্ষায় এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ তটস্থ থাকে কোনক্রমে এইবারের ঝড়ে মাথার উপরের চালটুকু যেন উড়ে না যায়! সেখানে বর্ষার মৌসুমে মোল্লা সাহেবের গ্রামের সকল লোক বিনা-দ্বিধায় আশ্রয় নেয় তাঁর নিজের দালানে!

এরকম সামাজিক আর্থিক অবস্থার পার্থক্যে বশীভূত দুটো পরিবারের মধ্যে সম্বন্ধ হওয়া গ্রামবাংলায় স্বাভাবিক নয়; রীতি নেই। কিন্তু শিউলি, মোল্লা সাহেবের একমাত্র মেয়ের সাথে ঘটেছে রীতি বহির্ভূত বিষয়টাই। ঘটনা খুব নাটকীয়। শিউলির জন্মের পর মোল্লা সাহেবের স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। স্বভাবতই দুধের শিশুর ভালমন্দের চিন্তা মোল্লা সাহেবকে দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে জোরেশোরে। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল করুণ। মোল্লা সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী শিউলিকে মায়ের আদর দিবে কি, নিজের শারীরিক অসুস্থতায় আজ মরে তো কাল! শিউলির বুদ্ধি হবার পর থেকে দেখেছে তার ছোট মায়ের কাশতে কাশতে রক্তবমি করে বিছানা ভাসানো রাতগুলো। আরও দেখেছে দাঁতের ব্যথায় চিৎকার করে সারা বাড়ির লোকদের ঘুম হারাম করা রাত। এমন অনেক দিন তো শিউলি নিজেও গরম পানি করে এনে স্যাঁক দিয়েছে সৎ মায়ের ফোলা মাড়িতে! ছোট্ট শিউলি মায়ের স্নেহ না পেয়ে উল্টো মায়ের সেবায় নিয়োজিত করলো নিজেকে!

দয়ালু মোল্লা সাহেব সব দেখতে লাগলেন। তাড়াহুড়ায় নেয়া সিদ্ধান্তটা ভুল বলে আফসোস না করে স্ত্রীকে নিয়ে গেলেন শহরের বড় বড় ডাক্তারদের কাছে। টাকা থাকলেও মোল্লা সাহেবের বংশের রীতি ছিল, জীবনযাপন করতে হবে বিলাসহীন, লোভমুক্ত, প্রয়োজনীয়তা রাখতে হবে সীমাবদ্ধ। তবু মোল্লা সাহেব স্ত্রীর চিকিৎসায় কোন কার্পণ্য করেননি। শিউলির যখন দশ বছর, তখন তার সৎ মা মারা যায়! শিউলির বাবা মোল্লা সাহেব আর কখনোই বিয়ের নাম মুখে আনেননি, কিন্তু সমাজসেবা, গ্রামবাসীরা উপকারে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে মেয়েকেও সময় দেওয়া হয়নি।

ঐ অবস্থায় শিউলির বয়স যখন পনেরো, পুকুরে গোসল করতে গেলে তাকে দেখে ফেলে তাহেরউদ্দীন, শিউলির স্বামী, তাতাইয়ের বাবা। তাহেরদের গ্রাম আর শিউলিদের গ্রামের দূরত্ব প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার, তাহের গিয়েছিল বন্ধুর বিয়ের বরযাত্রী হয়ে। শিউলিকে দেখে তাহেরের মাথা নষ্ট! বিয়ে করতে চাইলে তাহেরের বন্ধুর শ্বশুড়বাড়ির লোকেরা সাবধান করে দেয়! মোল্লা সাহেবের মেয়ের যোগ্য তাহের নয়! কিন্তু বুদ্ধিমান তাহের কুটুম হিসেবে শিউলিদের গ্রামে যাওয়া আসা করতো প্রায়ই। মোল্লা সাহেব সহজ সরল এবং দয়ার সাগর। উনার সাথে পরিচিত হয়ে উনার বাড়িতে প্রবেশ করাও পানিভাত হয়ে গিয়েছিল তাহেরের জন্য।

কয়েকবার শিউলিদের বাড়ি গিয়ে কাছারী ঘরে শিউলির সাথে চোখাচোখি দেখাদেখি হয়েছিল বেশ আবেগের সাথেই। ব্যাস, মোল্লা সাহেবকে প্রস্তাব দিয়ে বসলো তাহেরউদ্দীন। সামান্য কিছু জমিজমা, কয়েকটা ছাগল আর ছোট একটা পুকুরের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা তাহেরের বিশাল পরিবারে শিউলি কিভাবে মানিয়ে নিবে সেকথা মোল্লা সাহেব ভাবতে গিয়েও ভাবেননি। তিনি শুধু দেখেছেন তার মেয়ে তাহেরকে ভালবেসেছে! মাতৃহীন মেয়ের মনে দুঃখ দিতে চাননি। মহা উৎসাহে ধুমধাম করে বিয়ে দিলেন তাহেরের সাথে।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধল এরপর। তাহেরের পুরো পরিবার মনে করলো, মোল্লা সাহেব এতটা ধুমধাম করেছে কেবল তাদেরকে দেখানোর জন্য! তাদের অবস্থা যে কত ছোট, সেটা আঙুল তুলে দেখানোর জন্য এত ঢাকঢোল পিটিয়ে মেয়েকে শ্বশুড়বাড়ি পাঠিয়েছেন! যা ভাবা তাই সই! অতঃপর মোল্লা সাহেবের যে কোন কাজ শিউলির শ্বশুড়বাড়িতে আদিখ্যেতা মনে হতে লাগলো! বিয়ের পরের দিন মোল্লা সাহেব লোক দিয়ে শখানেক মুরগী পাঠিয়েছিলেন তাহেরের বাড়িতে। তাহেরের বাবা আজমউদ্দীন, এবং বড় ভাই জহিরউদ্দীন সব মুরগী ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাদের যুক্তি হলো, এইসব লোকদেখানো জিনিস তারা রাখেন না!

এরকম আরো অনেকরকম অপমানের স্বীকার হবার পর মোল্লা সাহেব তাহেরের পরিবারের সমস্যাটা বুঝলেন। তিনি দুঃখ পেলেন না। মেয়েকেও বোঝালেন যে এটা দুঃখ পাবার বিষয় নয়। মোল্লা সাহেব এরপর থেকে মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন খুব সাধাসিধা অবস্থায়। যেন তাহেরদের মনে না হয় যে তিনি টাকার গরম দেখাচ্ছেন! দু’হাত ভরে যতটুকু খাবার কিংবা উপহার আনা সম্ভব শুধুমাত্র ততটুকুই আনেন। অথচ তার নিজ গ্রামে কোন লোক তার হাতে ব্যাগ বইতে দেখলে হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে তারা মাথায় করে বয়ে নিয়ে যাবে। সেই মোল্লা সাহেব মেয়ের বাড়ি আসার সময় সঙ্গে কোন লোককেও আসতে দেন না।

শীতের তীব্রতা মোকাবেলায় তিনি জোব্বার ওপর কোট পরতে ভালবাসেন । কিন্তু পাছে শিউলির শ্বশুর বিষয়টাকে ভিন্ন চোখে দেখে, মোল্লা সাহেব শিউলির বাড়ি আসার সময় ভুলেও কোট পরেন না। জোব্বার ওপর পশমি চাদরটাও পরেন না। পাটের মোটা চাদরটাই খুব সুন্দর করে জড়িয়ে গায়ে মাখেন! নূরানি চেহারার মোল্লা সাহেবকে তাতেই কি অপূর্ব দেখায়! শিউলি তাতাইকে নিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বাপের আগমন দেখছে আর মনে মনে ইতিহাস হাতড়াচ্ছে। আজ যে তার কত বড় আনন্দের দিন। বাপকে নিয়ে ঘরে বসে পান খাবে আর খিলখিল করে হাসবে। আজ শিউলি কোনো কাজ করবে না। ঐ যে এসেই গেল! তাতাই নানাজান বলে লাফাচ্ছে। তাতাইয়ের জ্ঞাতি ভাইবোনেরাও এসে মিশেছে দলে। সবাই টগবগ করছে নানাজান বলে। মোল্লা সাহেব বাচ্চাগুলোর দিকে দু’হাত বাড়ালেন। সবগুলো বাচ্চাই ছোট ছোট, বয়স পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে!

সবাই নানাজানের হাতের চটের ব্যাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি! মোল্লা সাহেব ব্যাগগুলো বাচ্চাদের দিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। ঘোমটার আড়ালে শিউলি একটু করে তাকাচ্ছে, আবার মাথা নিচু করছে! যতবার সে তার আব্বাকে দেখে, তার মনে দুটো অবস্থার সৃষ্টি হ , এক মুহূর্তে বিশাল খুশি হয়ে যায়, পরোক্ষনেই লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়! এইবার অবশ্য লজ্জায় রাঙা হবার অন্য কারণও আছে! শিউলি দ্বিতীয়বারের মত অন্তঃসত্ত্বা। মোল্লা সাহেব এইজন্যই মেয়েকে দেখতে এসেছেন। শিউলি বাপকে কদমবুসি করে লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাতাই তো আর অত শত বোঝে না। সে নানাজানের কোলে ওঠার বায়না ধরলো।

মোল্লা সাহেব তাতাইকে কোলে করে বাড়িতে প্রবেশ করলেন। তাহেরের পরিবার মোল্লা সাহেবকে খুব একটা পছন্দ না করলেও খাতিরদারির কমতি করে না। এইবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। সারাটা দিন সবার খুব ভাল কাটলো। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা শিউলি বাপের পায়ে গরম সরিষার তেল মালিশ করে দিতে লাগলো। আরামে মোল্লা সাহেবের চোখ বুজে যায়! দু’হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানাতে ভোলেন না।

বিকেলের হিমেল হাওয়ায় আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ায় গা গরম করতে করতে মোল্লা সাহেব শিউলির শ্বশুড়বাড়ির সবার কাছে তার আর্জি পেশ করলেন। তিনি চান শিউলি এবার বাপের বাড়িতে সন্তান জন্ম দিক। তিনি শিউলি আর তাতাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। বৃদ্ধ বাপের এইটুকু আবদার দোষের কিছুনা। সবাই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিলো। আর সাধারণত প্রসূতি মায়েরা তো বাপের বাড়িতেই থাকে। শিউলির মা ছিলনা বলে সে প্রথম সন্তান জন্মের সময় শ্বশুড়বাড়ি ছিল। আজমউদ্দীন ভেবে দেখলেন, এই বাড়িতে এত মানুষ, ঠিকমত সবার খাওয়া খাদ্য জোটাতেও কঠিন অবস্থা। গর্ভবতীকে আবার বেশি খেতে দিতে হয়! তা যাক না শিউলি বাপের বাড়ি! আরাম করে বাপের পয়সায় খেয়ে দেয়ে নাতি জন্ম দিক!

তাহেরও সম্মতি জানালো। ঠিক হলো পরের দিন সকালে তাহের আর তাতাইসহ শিউলি বাপের বাড়ি যাবে। তাহের বৌ-বাচ্চাকে পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে। তারপর শিউলির প্রসবের সময় যাবে আবার। নবজাতক শিশু আর বৌ-বাচ্চা নিয়ে একসাথে ফিরে আসবে।

ঘটনা শুনে শিউলি যতটা খুশি, তার চেয়ে বেশি খুশি তাতাই! নানাজানের বাড়ি কয়েকমাস থাকবে! এত বড় সুখবর আট বছরের তাতাইয়ের জীবনে আর কখনো আসেনি! তার লাফালাফি দেখে উপস্থিত তার চাচাতো ভাইবোনেরাও বায়না ধরলো। তারাও মোল্লা বাড়িতে যাবে! খুব হাসাহাসি হলো এই নিয়ে। মোল্লা সাহেবই বুদ্ধি দিলেন, যখন শিউলির ব্যথা উঠবে তখন এই বাড়ির সবাই যেন দলবেঁধে মোল্লাবাড়ি যায়। সবার দাওয়াত। তারপর সবাই বাচ্চা নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরবে।

ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো হইচই করে উঠলো। নানাজান নানাজান বলে চিৎকারে সারা বাড়ি সরগরম। শীতের রাতে এত হাসাহাসিতে শীতটাও পালিয়ে গেল। শিউলির শ্বাশুড়ি আদরের ধমক দিয়ে সবকটিকে থামালো। রাতের খাবারের সময় হলো বলে। আজ রাতে রান্না হয়েছে মোল্লা সাহেবের আনা হাঁস। শীতের রাতে জমজমাট হাঁসের মাংস, ডাল আর ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমতে গেল সবাই। শুতে গিয়ে শিউলি তাহেরকে খুশি মনে বললো, ‘আব্বার সাথে সবাই অহন খুব ভালা ভালা কতা কয়! কেউ খোঁচায় না। আমি অনেক খুশি তোমাগো উপর!’

তাহের পরম ভালবাসায় স্ত্রীকে ধরে বলে, ‘তোমার আব্বা বহুত ভালা মানুষ! আব্বা আম্মা হেনারে দ্যামাগি মনে করসিলো। অহন আর করেনা। তুমি ঘুমাও বউ। কাইল তো নাইওর যাইবা।’ শিউলি আর তাহের ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু তারা জানলোনা, তাদের পাশেই লেপের ভিতর গুটিশুটি মেরে শুয়ে তাতাই সব কথা শুনছিল। সে জানতো না দেমাগ কি? পছন্দ অপছন্দের বিষয়টা কি? সে কেবল পরম আনন্দে ভাবছিল নানাজানের বাড়ি গিয়ে কি কি করবে! কেমন হবে নানাবাড়ির গল্প!

তারপরের মাসতিনেক কেমন দ্রুত চলে গেল! এত আনন্দ, এত মজা তাতাই তার জীবনে কল্পনা করেনি। তার নানা বাড়িতে আপন বলে কেউ নেই, কিন্তু পুরো গ্রামবাসীই তার নানাবাড়িতে আসা যাওয়া করছে। তাতাই এত লোকজনের কেউকে চেনেনা, তার চেনার দরকারও নেই। সে ছোট্ট মনে কেবল এইটুকু বুঝলো এরা সবাই ভাল! তার কারণ এরা তার মাকে ঘিরে রাখছে। সকালে ঘুম থেকে উঠার আগেই তার মায়ের শিওরে বসে আছে কেউ না কেউ; যদি শিউলির কিছু লাগে! দাদাবাড়িতে তাতাই বুঝতেই পারেনি যে তার মা অসুস্থ! কারণ তার দাদাবাড়ির ধ্যান ধারনায় অন্তস্বত্তা হওয়াটাকে অসুস্থতা ধরা হয়না। বিশেষভাবে যত্ন নেওয়ারও কোন বিষয় থাকেনা। তাতাই দেখেছে প্রতিটা দিন তার মায়ের সকাল একইভাবে শুরু হয়েছে, উনুন জ্বালিয়ে! তাই নানাবাড়ি এসে মায়ের যত্ন-আত্তি দেখে সে যারপরনাই অবাক হলো। তারপর বুঝলো তার মা নাকি অসুস্থ! কি অসুখ তা তো তাতাই বোঝেনা। সবাই বলে তার নাকি একটা ছোট ভাই আসবে! তাতাই এই বিষয়টারও প্রয়োজনীয়তা। খুশি হবে নাকি মন খারাপ করবে ভেবে পেলোনা। কারণ দাদাবাড়িতে একঝাঁক ভাইবোন তার। আরও একজন আসলে ভাল, দল বড় হলো। না আসলেও সমস্যা নেই!

কিন্তু নানাজানের সাথে তার সময়টা মহা মূল্যবান বলা চলে। তার নানাজান যেখানে যাচ্ছে, তাকে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা চাওয়ার আগেই কিনে তার হাতে দিচ্ছে। প্রতিদিন বাহারি পদের খাবারে নানাজানের দাওয়াইখানা ভর্তি থাকে। কিছু নানাজানের রসুইঘরেই রান্না হচ্ছে, তো কিছু গ্রামের কোনো না কোনো বাড়ি থেকে আসছে। মোল্লা সাহেবের মেয়ে আর নাতনী বাড়ি এসেছে, পুরো গ্রামেই আনন্দের বন্যা বইছে। সারা জীবন মোল্লা সাহেব গ্রামের ছেলে বুড়ো মহিলার সকল সমস্যা সাধ্যমত মোকাবিলার চেষ্টা করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিপদে আপদে আগলে রেখেছেন পুরো গ্রামকে। আজ এত বছর পর মোল্লা সাহেবকে খুশি হতে দেখে পুরো গ্রামবাসী আনন্দে দোল খাচ্ছে। কে কিভাবে মোল্লা সাহেবের মেয়ে আর নাতনীর জন্য কিছু করবে সেই নিয়ে গ্রামজুড়ে ব্যপক উত্তেজনা।

মোল্লা সাহেব বিলাসহীন জীবন কাটিয়ে অভ্যস্ত। কখনো প্রয়োজনীয়তার বাহিরে আভিজাত্য দেখাননি তিনি। আজ তিনিও মন খুলে বিলাসিতা করতে চাইছেন। পাশের গ্রামের যাত্রাদল থেকে হাতি আর ঘোড়া ভাড়া করে নিয়ে এসেছেন তার নাতনীকে চড়াবেন বলে!

তাতাই প্রতিদিন বিকেলে ঘোড়ায় চড়ে আর কল্পনায় গল্প বানায় কিভাবে তার দাদাবাড়িতে ঘোড়ার গল্প করবে। হাতি থেকে দূরে থাকে, হাতিকে সে ভয় পায়! নানাজানকে বলে ঘোড়ায় চড়ে তার অনুভূতি! মোল্লা সাহেব ঠিক করেছেন, শিউলির সন্তান হবার পরে তার শ্বশুড়বাড়ির সবার যেদিন দাওয়াত থাকবে সেদিন গ্রামের স্কুলমাঠে হাতি ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা রাখবেন। যাতে তাতাইয়ের চাচাতো জ্যাঠাতো ভাই বোনেরাও এই আনন্দ উপভোগ করতে পারে। শুধু তাই নয়, গ্রামের সকল বাচ্চাদের জন্য তিনি নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, আর নৌকাবাইচের ব্যবস্থাও করার কথাও ভেবেছেন।

আনন্দের সেই দিনগুলোতে মোল্লা সাহেব খেয়াল করলেন তাতাইয়ের স্কুল কামাই হচ্ছে। এই বিষয়টা আগে চিন্তা করেননি তিনি। গ্রামের সেরা পণ্ডিত বাসায় এসে দুই বেলা করে তাতাইকে পড়তে শুরু করলো। তাতাই তার দাদাবাড়িতে অন্য ভাইবোনদের সাথে স্কুলে ভর্তি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার পরিবারে মেয়েদের পড়ালেখার ব্যপারে তেমন কোন মাতামাতি ছিল না। তাতাই কখনোই পড়াশোনার ব্যপারে উৎসাহ পায়নি। নানাজানের দেখানো পথে হেঁটে সে বই ভালবেসে ফেললো। পড়াশোনা করতে লাগলো মন দিয়ে। আর তার পণ্ডিত তাকে পড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করলো তাতাই আশ্চর্যরকম মেধাবী!

মোল্লা সাহেব বিষয়টা জেনে মুগ্ধ হলেন। তাতাইকে কোলে তুলে বললেন আমার নাতনী ডাক্তার হবে। গ্রামের সবার জন্য বিনা পয়সায় চিকিৎসা করবে। নানাজানের কথার মর্মার্থ তাতাই বোঝেনি। সে কেবল নানাজানের আদরে ডুবে থাকার কথা ভাবছিল। সময় গড়িয়ে গেল। শিউলির এখন-তখন অবস্থা। পুরো গ্রাম উৎসবে মুখরিত। সবাই দিন গোনে। কিন্তু দিন গোনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলো না শিউলির গর্ভের সন্তান। সে পৃথিবীতে আসার জন্য জানান দিতে লাগলো ।

এরকম হঠাৎ পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলনা। মোল্লা সাহেব দাইমাকে খবর দিলেন। শহর থেকে ডাক্তার আনার জন্য লোক পাঠালেন। দ্রুত খবর পাঠানো হলো তাহেরের বাড়িতে। গরুর গাড়ি পাঠালেন, তাহেররা সবাই যেন জলদি আসতে পারে। গ্রামের মহিলারা শিউলিকে ঘিরে ধরলো। যত্ন করে আঁতুড়ঘরে নিয়ে গেল। তিনদিন আঁতুড়ঘরে অমানুষিক যন্ত্রণায় পার করলো শিউলি। ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে শিউলির শ্বশুড়বাড়ির সবাই। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যখন স্কুলমাঠে ঘোড় সরওয়ার হচ্ছে, তখন শহরের ডাক্তার, অভিজ্ঞ দাইমার চোখের সামনে শিউলি মৃত্যুবরণ করলো। তার গর্ভের বাচ্চাটিও পৃথিবীর আলো দেখতে পারলো না!

এত বড় শোকের মুহূর্তে সবাই যখন স্তব্ধ, তাহের তখন হুট করে রেগে গেল! তার ভাষ্যে সব দোষ শিউলির বাবার। তিনি শিউলিকে না আনলে আজ এই অবস্থা হতোনা! শিউলির মৃতদেহ তখনো আঁতুড়ঘরে, তাহেরের কথায় তাহেরের বাবাও যোগ দিল! ‘সব দোষ ঐ দ্যামাগি বুইড়ার। ট্যাহার গরম দেহাইতে যাইয়া মাইয়ারে মাইরা ফালাইসে!’ স্বয়ং ডাক্তার, মোল্লা সাহেব, এবং গ্রামবাসী কেউ বুঝতেই পারলো না তাহেরদের কথার যৌক্তিকতা! এই পরিস্থিতিতে কেউ একজনকে শক্ত থাকতে হয়! ডাক্তার সাহেব শিউলির শ্বশুড়বাড়ির লোকদের বোঝাতে চাইলেন, শিউলির মৃত্যুতে কারো হাত নেই! আর অনাকাঙ্ক্ষিত এই শোকের মুহূর্তে সবাই যেন একটু নিয়ন্ত্রণ করে কথা বলে!

কে শোনে কার কথা! মরা বাড়িতে রীতিমতো হইচই। ততক্ষণে তাতাই সহ অন্য বাচ্চারাও জেনে গেছে তাতাই এর মা বেঁচে নেই। তাতাই এর অনাগত ভাইটির আগমন ঘটেনি! তাতাই এই বিষয়গুলো বোঝেনি। সে বাবাকে চিৎকার চেঁচামেচি করতে দেখে ভয় পেয়ে আদরের আশায় নানাজানের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সে সেদিন পেল। এক চড় মেরে তার বাবা তাকে নানাজানের কাছ থেকে সরিয়ে নিল। তাকে বললো, আর কোনোদিন যদি নানাজানের কাছে যায়, তবে মেরেই ফেলবে! মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার বয়স তখন তাতাইএর হয়নি। সে তবুও বাপের কথা মেনে নিয়ে নানাজানের কাছে যায়নি পরের চড়টি খাওয়ার ভয়ে!

এমতাবস্থায় মোল্লা সাহেব একটি কথাও বললেন না । তাহেরের পরিবারের গালাগালি শুনে যেন তারও মনে হচ্ছিল মেয়ের মৃত্যুর কারণ বুঝি তিনিই। নিজেকে নিজে দুষবেন, নাকি আঁতুরঘরে গিয়ে মেয়ের চেহারাটি শেষবার দেখবেন, সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে তিনি মাথা ঘুরেই পড়ে গেলেন। উৎসব মুখর মোল্লা বাড়িতে যেন জুলুম নামলো। উপস্থিত ডাক্তার মোল্লা সাহেবকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তাহের আর তার পরিবারের তাতেও কিছু আসলো গেলোনা। তারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিজ গ্রামে পাড়ি জমালো। শিউলির জানাজা পর্যন্তও তারা অপেক্ষা করতে পারেনি। যাওয়ার আগে বলে গেল, মোল্লা সাহেব, মোল্লা বাড়ি, আর এই গ্রামের সাথে সম্পর্ক আজীবনের জন্য শেষ। তাতাইকেও আর কখনো অভিশপ্ত এই গ্রামে আসতে দেওয়া হবেনা।

বাস্তবিক অর্থে তাহের তার কথা রেখেছে। তাতাইকে কখনোই মোল্লা সাহেবের সাথে দেখা করতে দেয়নি। তাতাই অনেক কেঁদেছে, বায়না ধরেছে। কোন লাভ হয়নি। আর একটু বড় হয়ে তাতাই বুঝতে পারলো, এরকম অযৌক্তিক রাগ তারাই দেখাতে পারে, যাদের শিক্ষা বেশিদূর নয়। তাতাই বুঝলো তার নানাজান আসলে কখনোই অহংকারী ছিলনা, মূল অহংকারী ছিল তার বাবা, চাচা এবং দাদারা। নিজেদের মিথ্যা অহংকারে তার নূরানী চেহারার নানাজানকে একমাত্র নাতনীর সংস্পর্শ পেতে দিচ্ছেনা।

মা হারিয়ে, নানাজানের কাছ থেকে দূরে সরে তাতাই আর কোন কিছুতেই মন দিতে পারতোনা, পড়ালেখা ছাড়া। তার মনে পড়ে যায়, তার নানাজান চেয়েছিলেন যেন সে ডাক্তার হয়। ততদিনে তাতাইয়ের অবিশ্বাস্য মেধার পরিচয় পেয়ে গেছে তাহেরও। সে মেয়েকে পড়াশোনা করার ব্যাপারে উৎসাহ না দিলেও খুব একটা বাঁধা দেয়নি। দ্বিতীয় বিয়ে করে বউ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাতাই প্রথম স্থান অর্জন করতে করতে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যায়।

সরকারি বৃত্তির টাকায় শহরের একটা ভাল হোস্টেলে থেকে কলেজটাও শেষ করে। তাহের তখন মেয়ের ব্যাপারে একটু নজর দেয়। এইটুকু সহযোগীতাই দরকার ছিল তাতাইয়ের। রেকর্ডমূলক রেজাল্টের সাথে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করে সে। সময় কত দ্রুত পালায়। আজ ডাক্তারি করে যখন প্রচুর টাকা উপার্জন করছে সে, আজ আর কোন হুমকি পরোয়া না করে নানাজানের বাড়ির পথে এগুলো। তাহেরও ঐ ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করেনা। সবাই যেন গোপনে বুঝতে পেরেছে ভুলটা কার!

কিন্তু মানুষ তো চিরকাল বাঁচেনা। বেঁচে নেই তাতাইয়ের দাদা দাদি, যারা তার নানাজানকে অহংকারি ভাবতো। তাতাই খবর পেয়েছে তার নানাজানও অনেক আগেই মারা গেছেন। তাতাই আরো জানে, সেদিন মাথা ঘুরে পড়ে যাবার পর তার নানাজানের হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর প্যারালাইসড হয়ে বেঁচেছিলেন প্রায় সাত আট বছর। গ্রামের মানুষেরা সেবা করার ত্রুটি করেনি। কিন্তু বুড়ো মানুষটা যতদিন বেঁচে ছিলেন শুধু তাতাইকে ডাকতেন। একটিবার নাতনীকে আদর করার অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে মারা গিয়েছিলেন তিনি।

আজ তাতাই মোল্লাবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ দৃষ্টিতে দেখছে অতীত। তার জীবনের সেই মূল্যবান তিনটি মাস, সর্বচ্চো আনন্দের দিনগুলো, জীবনকে অনুধাবন করার শিক্ষা, ইতিবাচক চিন্তা করার শক্তি, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার শাসন, সব এই বাড়িকে ঘিরে। তাতাই হু হু করে কেঁদে উঠলো, মনে হলো বাড়ির সামনে একটা ঘোড়া দাঁড়ানো, নানাজান তাকে নিয়ে ঘোড়ায় উঠছে! ওদিকে বাড়ির ভেতর থেকে তার পেট মোটা মা উঁকি দিয়ে ঘোড়ায় নানা নাতনীকে দেখছে! নানাজানের ফোকলা দাঁতের হাসির শব্দ তাতাইয়ের কানে বাড়ি খেল। গ্রামবাসীর আনাগোনায় মুখরিত বাড়িটি আজ শূন্য! নানাজান নেই, নেই তার মা! শুধু বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে নানাজানের স্বপ্নপূরণ করা ডাক্তার তাতাই।

আরও পড়ুন : গল্প : লাইফ ইজ বিউটিফুল

সে চিৎকার করে ডাকলো, নানাজান, একবার এসে তোমার ডাক্তার তাতাইকে আদর করে যাও। তাতাইয়ের চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়, কেউ ফিরে আসেনা!

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড