• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দৈনিক অধিকার নবান্ন সংখ্যা-১৯

খয়েরী কুঁড়ির ফুল

  রোকেয়া আশা

২৮ জানুয়ারি ২০২০, ১৭:০৮
গল্প
ধানগাছের টিয়া রঙের পাতায়ও শিশির জমে রাতভর (ছবি : সম্পাদিত)

অঘ্রাণী গন্ধ পুরো খেতের আইল জুড়ে। সারারাত ধরে টুপটাপ করে শিশির পড়ে। সেই আকাশের জলে ভিজে যায় মাটি, খেতের আইল। আবার দু’ধারে সোনালী ধান। ধানগাছের টিয়া রঙের পাতায়ও শিশির জমে রাতভর। ধান ধান গন্ধ। মাটি মাটি গন্ধ। হেমন্ত এসেছে।

মায়া স্যান্ডেল খুলে ফেলে। খালি পায়েই আইল ধরে হাঁটতে থাকে। পেছন থেকে ছোট চাচী চেঁচামেচি করছে, আইলের দু'ধারে জায়গায় জায়গায় লজ্জাবতী গাছ৷ কাঁটা৷ খালি পায়ে এখন কাঁটা ফুটলে মায়ার চাচা রেগে যাবে। বলবে, মায়ার খেয়াল রাখেনি কেউই৷ মায়ার ছোট চাচী সেই ভয়েই তটস্থ হয়ে আছে। মীরা। মায়ার স্কুলের বান্ধবী। ছিলো।

এখন চাচী হয়। মীরা সুন্দরী। দুধসাদা গায়ের৷ রঙ। পাতলা গোলাপি ঠোঁট। টিকালো নাক। ঘন পাপড়িতে ঢাকা বড়ো বড়ো চোখ৷ মায়ার ছোট চাচা বিপত্নীক ছিলেন, মীরা তখন ক্লাস নাইনে উঠেছে। চৌদ্দ বা পনেরো বছর বয়স। মায়া দু’বছর আগেই চলে যায়। ময়মনসিংহে। ক্যাডেট কলেজে। মীরা গ্রামের স্কুলেই ছিলো। মায়ার বাবা নেই৷ মা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। ওই পক্ষে দুটো ছেলে। যমজ। মায়ার সাথে যোগাযোগ হয়। গোপনে অবশ্য। মায়া দাদুবাড়িতে আদরেই আছে। মেজো চাচা আর ছোট চাচা দুজনই মায়াকে ভালোবাসে। বাড়ির একমাত্র মেয়ে মায়া। চারপুরুষ পরে এবাড়িতে একটা মেয়ে জন্মেছে। সে মায়া। মায়াবতী নাম তার।

‘মীরা, তোর রূপমকে মনে পড়ে না?’ মায়ার প্রশ্নে পুরো শরীর ঝিমিয়ে ওঠে মীরার। রূপম! রূপম! রূপম মৈত্র। ক্লাস সিক্সে হাইস্কুলে ভর্তির পর পরিচয় ঘটা সেই লাজুক ছেলেটা! মায়ার সাথে বরাবরই যোগাযোগ ছিলো মীরার। জানিয়েছিলো, জেএসসি পরীক্ষা শেষ হবার দিন সেই ছেলেটা মীরার হাতে দু’টো সাদা গোলাপসহ একটা চিরকুট দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। তারপর?

তার দুমাস বাদে মীরার বিয়ে হয়ে যায়। মায়ার ছোট চাচার সাথে। দুবছর হয়ে গেলো। মায়া এসএসসি দিয়ে ক্লাস ইলেভেনে। মীরা আর পড়াশুনা করেনি। বাড়ির বউ মীরা। অনেক দায়িত্ব। অনেক।

‘মায়া, নাম ধরে ডাকিস না আমায়। লোকে হাসাহাসি করে। বাড়ির সবাই রাগ করে। স্যান্ডেল পরে নে। বাড়ি চল।’ মায়া অবাক হয় না আর। বিয়ের পরে মীরা আর মীরা নেই। আর আগের মতো খিলখিল করে হাসে না। প্রজাপতির মতো ওড়ে না। মায়া দ্বিরুক্তি করে না আর৷ স্যান্ডেল পরে নিয়ে দীর্ঘ ঘোমটা টানা মীরার হাত ধরে। শীতের ছুটিতে কতকাল পরে মায়া বাড়ি এসেছে। ওর চাচা দুজন তাই এই ক’দিন বাড়িতেই থাকে বেশিরভাগ। মায়া কি খাবে, কোথায় ঘুরতে যাবে - সব যেন চাওয়ার আগেই পেয়ে যায়। আগের সন্ধ্যায় মায়া বলেছিলো ওর ছৈলা ফুল চাই। মৌ জমাবে। মৌ খাবে৷ পুরো গ্রাম খুঁজে অনেক ফুল আনা হয়েছিলো তাই। সারারাত সেই কলিগুলো একটু একটু করে খুলেছে। নিচে বাটিতে মৌ জমেছে। বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করছে মায়ার জন্য। উঠোনে চৌকি পাতা। তার ওপর জাজিম বিছানো। মায়া এসে ওখানেই বসবে। মৌ খাবে। মেজো চাচী বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছেলেটা মৌ খাবার বায়না করছে বারবার। কিন্তু ওর বাবার কড়া নির্দেশ। আগে মায়া।

ভোরে হাঁটতে বেড়িয়েছে মেয়েটা। মীরাকে সাথে নিয়ে। ক্যাডেট কলেজে অভ্যাস হয়েছে ভোরে ওঠার। মায়াকে দেখা যায় দূর থেকেই৷ গ্রামে এসেও জিন্সের প্যান্ট আর লম্বা শার্ট পরেছে। শার্টের ওপর কালো রঙের হুডি। বড় আদুরে মেয়ে। ওকে কেউ কিছু বলে না। ওর হাত ধরে আসে মীরা। হলুদ শাড়ির ওপর খয়েরী চাদর। উঁচু পেটটা বোঝা যাচ্ছে। ওরা সমবয়সী। অথচ ভিন্ন জীবন।

মায়া এসে মৌয়ের বাটি হাতে নেয়। মীরাকে দেয় খেতে। কেউ অবাক হয় না। মীরা আর মায়া খুব বন্ধু। মীরা মৃদু আপত্তি করলেও ধোপে টেকে না। মায়ার কথায় কেউ না বলে না।

কিন্তু মায়ার কথায়ও কেউ না বলে। রূপম মৈত্র। রূপমের পছন্দ মীরা। মায়াই তাই দু’বছর আগে বিপত্নীক ছোট চাচার সংসার গুছিয়ে দিতে মীরাকে পছন্দ করে। তারপর?

রূপম হারিয়ে গেলো। ছেলেটা বড্ড বোকা। ওদের ধর্ম আলাদা। মুসলিম মীরা তো কখনোই রূপমের হতোই না। তাহলে?

এত অভিমান তাও? মায়ার ছুটি শেষ। পয়লা জানুয়ারি ক্লাস শুরু। সবাই ব্যস্ত৷ মায়ার ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। দুই চাচা আগের সপ্তাহেই মায়াকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে জামাকাপড় কিনে এনেছে নতুন। চাচীরা রান্নাঘরে। মীরার সাথে করে কিছু টিফিনবাক্স গুছিয়ে দেবে। মীরাকে দেখা যায় না কোথাও। ওকে খোঁজার সময় নেই। মায়া চলে যাবে কিছুক্ষণ বাদে। মায়া ধানক্ষেতে যায় ঘুরে আসতে। আর তো কিছুক্ষণ। তারপর তো চলেই যাবে।

খেতে একটা নোনতা মিঠে ঘ্রাণ। মায়া নিচে তাকায়৷ খয়েরী দাগ। রক্তের। একটু দূরে মীরা। ওর বাচ্চাটা মরে গেছে। মীরার নিথর হাতে একটা লজ্জাবতীর ফুল। ওতেও রক্ত। খয়েরী হয়ে গেছে ফুলটা। মায়া অবাক হয়। চিৎকার করে কাঁদে। মীরা এখানে কেন? কাঁদতে কাঁদতে মীরার পাশে বসে পড়ে৷ সূর্যের প্রথম রোদ গায়ে পড়ে মায়াকেও মীরার মতন সুন্দর লাগছে।

আরও পড়ুন : মানুষ

ওডি/এসএন

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড