• শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দৈনিক অধিকার নবান্ন সংখ্যা-১৯

ডাইম নিকেল উপন্যাসে পুঁজিবাদের প্রভাব

  সৈয়দা ফারজানা হোসাইন কলি

৩০ জানুয়ারি ২০২০, ০৯:৫৯
প্রচ্ছদ
প্রচ্ছদ : উপন্যাস ‘ডাইম নিকেল’

পুঁজিবাদ আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আলোচিত শব্দ। পুঁজিবাদের উৎপত্তিস্থল উন্নত বিশ্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে তৃতীয় বিশ্ব অব্ধি বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় জীবন সংলগ্ন প্রতিটি জিনিসকে ডলার তথা টাকার মূল্যে মূল্যয়িত করা হয়। ডলার সাম্রাজ্যে মানবিক মূল্যবোধগুলো ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায়। এই ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয়ে টাকা তথা অর্থেও প্রাচুর্য গড়ে তুলে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অবক্ষয়িত বা বিকৃত রূপ দেখতে পাওয়া যায় তৃতীয় বিশ্বে। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় আর ডলার সাম্রাজ্যেও হাতছানিতে প্রতিবছর অসংখ্য লোক পাড়ি জমায় মার্কিন মুলুকে। সেখানে টাকা আর মানবিক মূল্যবোধের পারস্পারিক বিপরীতমুখী অন্তঃদ্বন্দ্বে মানুষ যন্ত্র বনে যায়।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস (১৯২৭-২০১৪) তার এক আত্মজীবনীতে বলেছিলেন- এমগন একটি গল্প বলতে চাই যা সবার জানা, তারপরও বলছিন কারণ জানা গল্পগুলো একেক জনের মুখে একেক রকম শুনায়।

পুঁজিবাদের কারণে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীদেরও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আসে আমূল পরিবর্তন নিয়ে অসংখ্য উপন্যাস রচিত হলেও রিজিয়া রহমানের (১৯৩৯-২০১৯) ডাইম নিকেল (২০০৬) উপন্যাসে ব্যতিক্রমীয়তা প্রকাশের প্রয়াস পেয়েছে। শীলা নামক আটপৌরে বাঙালি নারীর প্রবাসী জীবনকে ডলার সাম্রাজ্যের প্রকট প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাই দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মেয়ে শীলা। বিয়ের পর স্বামী হাসানের সাথে পাড়ি দেয় নিউইয়র্কে। একটু উন্নত জীবন আর অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই ছিল শীলার চাওয়া। তবে স্বামী হাসানের মাঝে ডলারের প্রতি মোহ জেগে ওঠার কারণে শীলাকে বাধ্য হয়ে ডলারের পিছনে ছুটতে হয়। শাড়ি পড়া শীলা বেমানান লাগে নিউইয়র্কে। তাই প্যান্ট-শার্টকেই বেছে নিতে হয়। ডলার দেশের নারী লরা ও ডনার মতে শীলা হলো ট্রিপিক্যাল বাঙালি নারী। যারা শুধু লজ্জা করতে জানে। উপার্জন করতে অক্ষম এসব নারীরা। লরা, ডনার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে শীলাও ডলারের পিছনে ছুটতে শুরু করে। দেশে থাকতে যে শীলা কারও সামনে কথা বলতে পারতো না, সেই শীলাই নিউইয়র্কে এসে পিজা ডেলিভারি দিচ্ছে। উপন্যাসের ভাষায়-

শীলা ঠিক হয়ে গেল। বাসন ধোয়া, ফ্লোর সুইফিং, শপিং আর কাউন্টারে ট্রে সাজাতে শীলার আনাড়ি হাত ক্রমে চটপটে হয়ে উঠল। কেটে গেল শীলার ইংরেজি বলার অভ্যাস। টোবিন্টরি বলল একদিন- শেইলা তুমি এবার ফোনের অর্ডারগুলো নিতে শুরু কর। ফোন ধরল শীলা। শেখা বুলি আওড়াল- পিজা ইন। মে ইউ হেল্প ইউ স্যার?

এদিকে হাসান নিউইয়র্কে এসেছিল পি এইচ ডি করার জন্য। পি এইচ ডির স্বপ্ন বাদদিয়ে সেও চলেছে টাকার তথা ডলারের খোঁজে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শ্রমিকদের উৎসাহী করে তোলা, যাতে করে উৎপাদন ব্যবস্থা বৃদ্ধি পায়। এই উপন্যাসে দেখা যায় হাসান, শীলা, বুলু, ডনা এরা সবাই অর্থ উপার্জনে বেশ উৎসাহী একই সাথে পারদর্শী। হাসানই শীলাকে প্রথম দিকে কাজ করতে নিষেধ করলেও ডলারের সাম্রাজ্যর অর্থলোলুপতার জন্য নিজেই তার কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। মূলত নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় অর্থর ব্যপকতা ও এর প্রভাব পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাই নিয়ন্ত্রণ করে। যে কারণে পুঁজিবাদ অনেকটা ‘চেইন সিস্টেম’ এর মতো কাজ করে।

ইউরোপ, আমেরিকা তথা উন্নত বিশ্বে যেখানে মানুষের পরিচয় মিলিয়ন- ট্রিলিয়ন ডলারে পরিমাপিত হয়, সেখানে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোও হয়তো বা ডলারের পাল্লায় ওঠে যায়। মানুষ অর্থের বিনিময়ে নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রথা এমনকি দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে দূরে ঠেলে দেয়। উপন্যাসের শীলা বাঙালি সংস্কৃতি বাদ দিয়ে মার্কিন মেয়েদের সংস্কৃতির ধারক হয়ে পড়ে। নিজের হাতে মুখে ভাত তুলতে লজ্জা পায় শীলা। কাটা চামচে সে এখন অভ্যস্ত। অনর্গল ইংরেজি বলার অভ্যাসও হয়ে গেছে শীলার। ভাতের পরিবর্তে পিজা অথবা সামান্য স্ন্যাকস খেতেই ভালো লাগে তার। মূলত শীলা নামক মেয়েটির আমূল পরিবর্তন ঘটে ডলারের দেশে আমার পর।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় যেমন ক্রেতা ও বিক্রেতার সাথে অবাধ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়, তেমনি এই সমাজব্যবস্থায়ও মালিক ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে প্রতিযোগিতায় অবাধ বিচরণ হয়ে থাকে। গরিব কিংবা গরিব থেকে ধনীতে রূপান্তরিত করতে পারে। উপন্যাসের হাসান চাকুরী হারিয়ে ফেলে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটালেও হঠাৎ সে আই.বি.এম এর চাকুরির খার পেয়ে যায়। যা হাসানের কাছে স্বপ্নাতীত বলে মনে হয়। হাসানের কাছে চাকুরীটা আমেরিকার মিরাকল’।

আরও পড়ুন : ‘লণ্ঠনের গ্রাম’ হীরক জ্যোতির আলোক বিকিরণ

ডলার সাম্রাজ্যের সামনে দুনিয়াটা ক্রিস্টাল বা হিরার মতো চকচকে হলেও ভিতরে রয়েছে অন্ধকারের গল্প। যে গল্প তৈরি ও শেষ হয় একই সময়ের ও প্রেক্ষাপটে। ডলারের সামনে মানুষ অসহায়। নিজের অসহায়ত্বের জন্য হাসান যেমন নিজেকে আড়াল করে রাখে তেমনি শীলাও নিজেকে ধ্বংস করে দিতে চায়। আর এই ডলার পেলে হয়তো পুরো পৃথিবীটাই হাতে চলে আসে। রিজিয়া রহমান উপন্যাসের ইতি টেনেছেন এভাবে-

মনোরম আলোর আভায় শীলার পালের ডাইম নিকেলের কদর্য দাগ লুকিয়ে পড়েছে। শীলার মুগ্ধ দৃষ্টি আলোর সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল আকাশে। ডাইম কোয়াটারগুলোই যেন তারা হয়ে ছড়িয়ে গেছে সেখানে। দামী ক্রিস্টাল আর হিরার ঝলক তুলে তৈরি করেছে মিলিয়ন ডলারের আকাশ। দুঃখী দেশকে বুকের পার্সে ঘুম পাড়িয়ে রেখে সেই আকাশটাকে ছুঁয়ে দিতে চাইল শীলা। ভালোবাসল আমেরিকাকে।

ওডি/এসএন

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড