• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

আসামের নাগরিক পঞ্জি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর 

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ আগস্ট ২০১৯, ১৬:০৪
এস জয়শঙ্কর
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (ছবি : দৈনিক অধিকার)

ভারতের আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি নিয়ে যা হচ্ছে সেটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে জানিয়েছেন ঢাকায় সফররত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর।   

মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।  

আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি-না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই।’

এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সঙ্গে থাকলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

এর আগে ভারত সরকার বাংলাদেশ সীমান্তের নিকটস্থ আসাম রাজ্যের নাগরিকদের একটি নিবন্ধন প্রকাশ করে। যেখানে দেশটি প্রমাণ করতে চাচ্ছে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ১৯৭১ এর ২৪ মার্চ ওই নাগরিকরা আসাম রাজ্যে অনুপ্রবেশ করে। আল জাজিরার প্রকাশিত খবর।  

ভারতের উত্তরের রাজ্যগুলোর প্রায় ৪০ লাখ অধিবাসী এই নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব নাগরিকরা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিল বলেও প্রমাণ করবে বলে দাবি করে বিজেপি সরকার।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার বিজেপি সরকার আসাম রাজ্য থেকে অভিবাসীদের অপসারণের পরিকল্পনা করছে। যদিও স্থানীয় কর্মকর্তারা সম্প্রতি তাদের অভিবাসী হিসেবে মনোনীতদের আশ্বাস দিচ্ছেন যে তাদের অবিলম্বে নির্বাসন দেওয়া হবে না।

আসামের চূড়ান্ত খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৪০ লাখ ৭ হাজার ৭০৮ জনের নাম বলে আল জাজিরা এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, এদেরকে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে পুশ ইন করার পরিকল্পনায় আছে ভারত সরকার। 

এছাড়া বিজেপির বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন, আসামে যে নাগরিক তালিকা করা হয়েছে, তাদের মধ্য থেকে যারা বাদ পড়েছেন তারা অবৈধ বাংলাদেশি এবং তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। 

সম্প্রতি (গত ৬ আগস্ট) বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরেও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্ অবৈধ অনুপ্রবেশের ইস্যু নিয়ে বৈঠকে কথা তুলেন। ওই বৈঠকে তিনি ভারতে অবৈধভাবে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশ করে বলে দাবি জানান। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত বাংলাদেশিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে তা ঠেকাতে সীমান্তে বাংলাদেশকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এছাড়া ভারত সীমান্তের পুরোটাতেই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে চায় বলে জানিয়েছে।

ভারতের আনা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জবাবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশি ভারতে যায় না। যারা যায় তারা ভিসার মাধ্যমে যায়। এছাড়া তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘আমাদের দেশ থেকে তোমাদের দেশে বেড়াতে যায়, চিকিৎসা সেবা নিতে যায় বা শিক্ষা সফরে যায়। নেক্সটডোর নেইবার (প্রতিবেশী) তোমরা, সেজন্যই যায়।’ 

সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘আইন অনুযায়ী করা হলে তাতে বাংলাদেশের আপত্তি করার কিছু নেই। জয়েন্ট বাউন্ডারি অ্যাক্ট অনুযায়ী যেভাবে আগে তারা করেছে সেভাবেই বাকিটা করলে আমাদের অসুবিধা নেই।’

এ দিকে অনুপ্রবেশ ইস্যু যৌথ বিবৃতিতে রাখার বিষয়ে ভারত বাংলাদেশকে এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করেছে বলে সফররত বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন। 

তারা বলেছেন, অনুপ্রবেশ ইস্যু যৌথ বিবৃতিতে রাখার ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে একটা চাপ তৈরি করা হয়েছিল। দিল্লীর বৈঠকে এসব আলোচনা হলেও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। দুই দেশ আলাদা আলাদাভাবে বক্তব্য তুলে ধরেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যদিও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি এবার বাংলাদেশ এবং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল না, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তোলা হয়। তবে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতের বক্তব্য গ্রহণ করেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতকে জানিয়েছেন, ‘অনুপ্রবেশের ব্যাপারে তারা যেটা আমাদেরকে বলছেন, যেটা ওনারা বলতে চাচ্ছেন, যে তোমাদের দেশ থেকে তো বহুলোক আসে। আমি সেখানে বলেছি, আমাদের দেশ থেকে এখন আর অবৈধভাবে যায় না। ভিসা নিয়েই যায়। অবৈধভাবে যাওয়ার কোনো প্রশ্ন আসে না কারণ আমাদের দেশে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়ে গেছে।’

ভারতের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ২৩ লক্ষ লোক বৈধভাবে গিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘তারাই স্বীকার করেছেন, গত বছর নাকি আমাদের ১৪ লক্ষ লোককে তারা ভিসা দিয়েছেন। আর মাল্টিপল ভিসা দেওয়া ছিল। সব মিলিয়ে ২৩ লক্ষ বাংলাদেশের নাগরিক গত বছর ভারত গিয়েছিল।’ 

এছাড়া ভারতের পক্ষ থেকে পশ্চিমবাংলায় সামনের বিধানসভা নির্বাচনের সময় সীমান্তে নজরদারির জন্য বাংলাদেশকে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘ওনারা (ভারত) বলছিলেন যে, পশ্চিমবাংলায় ইলেকশন হবে, সেই সময় বর্ডারটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমি বলেছি, বর্ডার আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’

অন্য দিকে গত ২৩ জুলাই ভারতের সংসদ লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানানো হয়, ভারতে গ্রেফতার হওয়া অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যায় শীর্ষে এখন বাংলাদেশি মানুষ। পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গত পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ করে গ্রেফতার হয়েছেন ৯ হাজার ৩২৩ জন বাংলাদেশি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তারা।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এখন রয়েছেন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, এই পাঁচ বছরে ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে গ্রেফতার হয়েছেন ৫৮৩ জন বাংলাদেশি। অন্যদিকে, মেঘালয় সীমান্তে ২৭০ জন, আসাম সীমান্ত থেকে ৫৯ জন এবং মিজোরাম সীমান্ত থেকে ১৪ জন বাংলাদেশি গ্রেফতার হয়েছেন।

এর আগেও হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ্ ভারতে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের বিতাড়িত করা হবে বলে বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে ভারতে ভোটের প্রচারে নেমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তার সরকার অবৈধ বাংলাদেশিদের লোটাকম্বল নিয়ে ফেরত পাঠাবে।

অন্যদিকে দৈনিক অধিকারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের আসাম রাজ্যের নাগরিক পুঞ্জি বা এনআরসি ইস্যু নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া সংখ্যালঘুরা কোথায় এমন প্রশ্নে তিনি ভারতের দিকে ইঙ্গিত দেন। ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে বলে দাবি করে। আর ওই বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করেন রানা। 

তিনি বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের সনাক্তের নির্দেশ দিয়েছে। খুঁজে বের করা শুরু হয়ে গেছে। আসামে ৪০ লক্ষকে খুঁজে পেয়েছে। তার মধ্যে ১৭ লক্ষ মুসলিম এবং ২৩ লক্ষ হিন্দু সম্প্রদায়ের।

ওডি/এআর 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড