• শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

দেশে দুকোটি কিডনি রোগী, বিকল হচ্ছে বছরে ৪০ হাজার  

  অধিকার ডেস্ক

১৯ মে ২০১৯, ১৭:১৫
কিডনি রোগ
হাসপাতালের কিডনি ওয়ার্ডে রোগীরা (ছবি : বিবিসি)

বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে ভুগছে, যাদের মধ্যে প্রতিবছর ৪০ হাজার কিডনি পুরোপুরি অকেজো হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা কিডনি ফাউন্ডেশনের জরিপ থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

বাংলাদেশে কিডনি রোগীর জন্য মাত্র দুরকম চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। তাদের হয় ডায়ালাইসিস অর্থাৎ যন্ত্রের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে কিডনির কাজ করানো অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন।
 
ঢাকার শাহবাগ এলাকায় বিশেষায়িত ডায়াবেটিক হাসপাতাল বারডেমে কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য বড় ইউনিট রয়েছে, কেননা ডায়াবেটিস থাকলে সেটিও একটা পর্যায়ে গিয়ে কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। এই হাসপাতালে কিডনি রোগীর অনেক ভিড় লক্ষ করা যায়। 

বিশেষায়িত এই ডায়াবেটিক হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় চাঁদপুর থেকে আসা কিডনি রোগে আক্রান্ত তরুণীর অভিভাবকের সঙ্গে। তিনি জানান যখন তরুণীর বয়স পাঁচ বছর তখন ডায়াবেটিস ধরা পড়েছিল। এর প্রায় ১০ বছর পর অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সেই তার কিডনি বিকল হয়ে গেছে।

তিনি আরও জানান রোগীর বাবা মা অনেক আগে মারা যাওয়ায় বোনের মেয়ের চিকিৎসা ব্যয় সম্পূর্ণ তার ওপর এসে পড়েছে। কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় তিনি চরম অর্থ সংকটে পড়েছেন। 

তরুণীটির ডায়ালাইসিসের জন্য যে ৪০ হাজার টাকা প্রয়োজন তা এই নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানান তার অভিভাবক। এ অবস্থায় তরুণীটির পরিবার অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছে। 
  
বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে ডায়ালাইসিসের ব্যয়ের কোনো সরকার নির্ধারিত তালিকা নেই। এ কারণে প্রতিষ্ঠান ও মানভেদে ডায়ালাইসিসের খরচ ভিন্ন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে একবার ডায়ালাইসিস করাতে আড়াই হাজার টাকা থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ গুণতে হয়। অপরদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো নিজেদের মতো করে মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। এ কারণে এসব হাসপাতালে একবার ডায়ালাইসিস করাতে সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, যা বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশে অনেক বেশি। কিডনি অকেজো হওয়া একজন রোগীকে সপ্তাহে দুই বা তিনবার পর্যন্ত ডায়ালাইসিস করাতে হয়।

’কিডনি রোগীদের পরিবারগুলোর এই ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতে হয়। কিডনি বিকলের কারণে যত রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়, তার ৯০ ভাগ রোগীই এক বা দুইবার ডায়ালাইসিস করার পর আর এই ব্যয় সামলাতে পারে না। তবে কিডনি প্রতিস্থাপন করার ব্যয় কিছুটা কম হলেও এর ডোনার পাওয়া যায় না’- বলেন বারডেম হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সারোয়ার ইকবাল।  

কিডনি আক্রান্ত হয়ে বারডেমে চিকিৎসা নিতে আসা একজন ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকার আসমা বেগম। এই নারীও ডায়ালাইসিসের ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন।  

ডায়ালাইসিসের ব্যয়ের বিষয় নিয়ে নিয়ে ফাউন্ডেশনের প্রধান অধ্যাপক হারুন আর রশিদ বলেন, ’মানসম্মত হাসপাতালের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যাপ্তিটা তেমন নেই। কিডনি রোগের শেষ অবস্থার রোগীদের জন্য দেশে ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের সুবিধাও এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে নতুন ৪০ হাজার রোগীকে ডায়ালাইসিস সেবা দেয়া এবং প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয় না।’

পুরুষের চেয়ে নারীদের কিডনি আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অবস্থাটা আরও প্রকট। পারিবারিক অসহযোগিতায় নারীদের একটা বড় অংশ চিকিৎসকের নাগাল পান না। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে এমন ধারণা পোষণ করেন বারডেম হাসপাতালের ড. মেহরুবা আলম।

তিনি আরও বলেন, পুরুষের তুলনায় ডাক্তারের কাছে মেয়েদের অ্যাকসেস এখনও কম। মেয়েদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চিকিৎসকের কতটা সাহায্য পেল, তার অর্থ কতটা আছে বা পরিবার তার চিকিৎসার জন্য কতটা অর্থ বরাদ্দ রাখছে।

মেয়েদের কিডনির সমস্যা একটা পর্যায়ে তাদের সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও বাধা উল্লেখ করে এই নারী চিকিৎসক বলেন রোগের মধ্যে থাকা অবস্থায় যদি সন্তান এসেও যায়, তাতে অনেক জটিলতা থাকে।

গত বছরের এক দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে  ড. মেহরুবা আলম বলেন, ’একজন রোগী বাচ্চা ধারণ করলেন। হয়তো বাচ্চাটাকে বাঁচানো যেতো। মেয়েটা বাচ্চা রাখতে চাইলেও তার স্বামী কোনোভাবেই রাজি হন না। ফলে আমাদের বাচ্চাটাকে গর্ভপাত করাতে হয়েছে।’

প্রথমত, অনেকটা ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। নেফ্রাইটিস বা প্রস্রাবের প্রদাহ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ বা অতিমাত্রায় ব্যথানাশক ঔষধ প্রয়োগ করা এবং খাদ্যাভাস। এছাড়া বংশগত বিষয়ও এই রোগের একটা কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। 

চিকিৎসকরা আরও মনে করেন, যে সব রোগের কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে সব রোগে আক্রান্তরা নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করান না। আর মানুষ এখনও সেভাবে সচেতন হয়ে ওঠেনি।   

একেবারে শেষপর্যায়ে কিডনি অকেজো হওয়ার পর বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসকের কাছে যান। কী কারণে কিডনি রোগ বেশি হয়, সেটা মানুষের জানা উচিত। ডায়াবেটিসসহ যে সব কারণে বেশি হয়, সেগুলো কিন্তু প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন অধ্যাপক সারোয়ার ইকবাল।

ডায়ালাইসিসের বড় অঙ্কের তুলনায় কিডনি প্রতিস্থাপন বা সংযোজন করার ক্ষেত্রে খরচ কিছুটা কম। চিকিৎসকদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, এখন দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তবে সমস্যা হচ্ছে কিডনি পাওয়াটা বেশ কঠিন।

বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপন আইন কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। রোগীর বাবা-মা ভাই বোনের পাশাপাশি চাচাতো ভাইবোনের কিডনি দেয়ার ব্যবস্থা আনা হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তির কিডনি নেয়ার বিধানও রয়েছে। 

মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তির কিডনি পাওয়ার ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থা কিডনি প্রতিস্থাপন ফাউন্ডেশনের প্রধান অধ্যাপক মো. আব্দুস সালাম বলেন, আইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হলেও বাংলাদেশে এখনও এই পরিবেশ তৈরি হয়নি। আইনে থাকলেও আমরা এখনও এটা করতে পারিনি। মনে হয়, আমাদের দেশের মানুষ এখনও এটার জন্য প্রস্তুত নন।

তিনি আরো বলেন, ’আইসিইউ'তে যে সব রোগীদের বেঁচে থাকার কোন সম্ভাবনাই থাকে না তাদের কিডনি নেওয়া যেতে পারে। কয়েক মাস আগে চেষ্টা করেছিলাম যে, কোনো একটা ব্রেন ডেড রোগীর কিডনি দিতে। কিন্তু কেউই রাজি হননি। ভবিষ্যতে এটা হলে হয়তো কিডনি পাওয়ার সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।

নারী রোগীর জন্য পুরুষ রোগীর চাইতে কিডনি পাওয়া অনেক সময় বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বারডেম হাসপাতালের ডা. মেহরুবা আলম বলেন, পুরুষ রোগীর জন্য তার স্ত্রী প্রথমে কিডনি দেয়ার জন্য এগিয়ে আসেন। কিন্তু নারী রোগীর ক্ষেত্রে স্বামীরা সেভাবে আসেন না। 

তিনি বলেন, বারডেমে স্বামীর জন্য কিডনি দিয়েছেন, এরকম ১০/১২টা ঘটনা আছে। কিন্তু একজন স্বামী তার স্ত্রীর জন্য কিডনি দিয়েছেন, এমন কোনো রেকর্ড নেই। এ ক্ষেত্রে মেয়েরা স্বামীর সহযোগিতা পায় না।

বাংলাদেশে কিডনি রোগের চিকিৎসার ব্যয় এবং সুযোগ সুবিধা অপর্যাপ্ত। সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও ঢাকায় ব্যক্তি মালিকানায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কিছু ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে উঠলেও ঢাকার বাইরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা সীমিত। অপরদিকে বেশিরভাগ জেলায় কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা সেভাবে নেই।

কিডনি রোগের চিকিৎসা বিস্তারে কমিউনিটি হাসপাতালগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করছেন অধ্যাপক হারুন আর রশিদ। তিনি বলেন, একজন রোগীকে কত কম খরচে চিকিৎসা দেয়া যাবে লাভজনক সেন্টারগুলোতো এটা চিন্তাও করে না। অলাভজনক সেন্টারের সংখ্যাও বেশ অপ্রতুল। বিভাগীয় শহরগুলোতে কিছু কিছু ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা আছে তবে তার সংখ্যা একেবারে নগণ্য। এছাড়া গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসার কথা চিন্তা করা খুব দুস্কর।

অভিজ্ঞ এই চিকিৎসক মনে করেন আগামী ২০ বছরে কোনোভাবেই বাংলাদেশের সব কিডনি রোগীকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিকের ওপর গুরুত্ত্বারোপ করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকে যদি উদ্যোগ নেয়া যায়, তাহলে আমরা কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চরক্তচাপ-এসব রোগ প্রতিরোধ করতে পারি।

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার ইউনিট করা এবং চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনার ব্যাপারে বিভিন্ন পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অপ্রতুলতা রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টানোর বিষয়ে সন্দিহান চিকিৎসকগণ। 

সূত্র : বিবিসি  

ওডি/আরএইচএস 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড