• রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ঘুস-দুর্নীতির মহা-আখড়া এখন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড

চেয়ারম্যানের বাহাদুরি সর্বময়, বেহাল দশায় কারিগরি শিক্ষা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:১৫
বোর্ড চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খানে
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খান। ছবি- সংগৃহীত

সরকারের নজর যখন কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন, বোর্ডের চেয়ারম্যান তখন ব্যস্ত নিজের উন্নয়ন নিয়ে। 'চেয়ারম্যান' পদটি তার কাছে এখন টাকা কামানোর মেশিন। খাত যাই-ই হোক সেটাকে টাকার উৎস্য বানাতে পটু এ চেয়ারম্যানের রেট করাও আছে নির্দিষ্ট কিছু কাজে। বোর্ডের নিয়োগে তার একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবেই, তবে আত্মীয়-অনাত্মীয়ের তফাৎ করেই উৎকোচ গ্রহণ করেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তন, অনুমোদন, পাঠের বিষয় খোলা এ ধরণের কাজে রেট আছে। তবে কোনো অনুষ্ঠানে নিতে গেলেও দামদর করেও টাকা দেওয়া যাবে। বোর্ড চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খানের হাতে এখন অনিরাপদ সম্ভাবনাময় কারিগরি শিক্ষা।

জানা যায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট (এনপিআই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবকে অভিযোগ জানিয়েছে। অভিযোগটি হচ্ছে, তাদের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে দুই দফায় ২০ লাখ টাকা ঘুস দিতে হয়েছে।

এনপিআইয়ের রেজিস্ট্রার মো. সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের আয়তন বাড়ানোর জন্য আগের ঠিকানা মহাখালী থেকে বর্তমান ঠিকানা বনশ্রী, খিলগাঁওয়ে যাওয়ার জন্য গত বছর ৪ ডিসেম্বর বোর্ডে আবেদন করা হয়। এর জন্য বোর্ড চেয়ারম্যান ২০ লাখ টাকা ঘুস দাবি করেন। এ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরুতে তিনি কালক্ষেপণ করেন এবং পরে অনুমোদন দেবেন না বলে জানান। এরপর আমাদের পাশের পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে সরিয়ে দূরের কেন্দ্র নির্দিষ্ট করেন। আমরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে ১০ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হই। তখন তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে প্রাথমিক অনুমোদন দেন। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আরও ১৫ লাখ টাকা চান। আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য চাপের মুখে তাকে আরও ১০ লাখ টাকা দিই। এরপর অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র হিসেবে পেতে হলে আরও ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। তা না দেওয়ায় এখনো আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর বোর্ড চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে সচিবের কাছে আরেকটি অভিযোগ দিয়েছেন। তাতে বোর্ড চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা পদ্ধতির আইন, নীতিমালা ও গেজেট অমান্য করে নিজের খেয়াল খুশিমতো কার্যাবলী পরিচালনা করে আসছেন। তার কর্মকাণ্ড থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হয়তো তিনি আইন, নীতিমালা, প্রবিধানগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত নন, অথবা জ্ঞাত হয়েও নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী অবজ্ঞা বা অবহেলা করেন। তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে আইন ও কর্মকৌশলের ভুলভাল ব্যাখ্যাদানের মাধ্যমে আমাদেরকে মাঝে মধ্যেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেন।

শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ তৈরির বিরোধিতা ছাড়াও এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে বলে ওই চিঠিতে দাবি করা হয়।

সুফি ফারুক বলেন, পরিচালনা পর্ষদ আইন অনুযায়ী প্রতি ৩ মাস অন্তর অন্তর বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা থাকা স্বত্ত্বেও বিগত দীর্ঘ ৮ মাসেও কোন সভা আহবান করা হয়নি। তিনি বোর্ড সভাতে অপ্রিয় প্রশ্নের জবাব দিতে হয় বিধায় বোর্ড সভা পাশ কাটিয়ে চলেছেন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কৌশলে কালক্ষেপণ করেন। ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার পরিবারের লোকজনের বিশেষ সম্পর্ক বিষয়ে জনশ্রুতি অত্যন্ত অস্বস্তিকর। তিনি আলোচনা যাই হোক, নিজের ইচ্ছেমতো রেজল্যুশন তৈরি করেন এবং অনুমোদনের জন্য চাপ দেন। বোর্ড ও অর্থ কমিটির সভার বিবরণীতে তিনি এ কাজ অনেকবার করেছেন।

এদিকে আরেকটি সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতিবাজ এ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে লাগিয়ে তিনি নিয়োগ বোর্ড নিয়ন্ত্রণে পাঁয়তারা করছেন। চেয়ারম্যানের মেয়ে আনিকা সিদ্দিকা এনি, মেয়ের জামাই মো. আবির রহমান, ছেলে লাবিব-ই-আকবর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চাকরি প্রার্থী। তাদের চাকরি নিশ্চিত বলে কারিগরি বোর্ডে কান পাতলেই শোনা যায়। তিনি পারিবারিক প্রার্থী ছাড়াও আরও অনেক চাকরিপ্রার্থীর চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতবদ্ধ বলে জানা যায়। তাদের সাথে বড় অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এমন অভিযোগও রয়েছে, চেয়ারম্যান পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু পদের শর্ত অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের ওই সদস্য আরও বলেন, চেয়ারম্যানের অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও একগুঁয়েমির কারণে কারিগরি শিক্ষা খাত এগিয়ে যাওয়ার বদলে প্রতিনিয়ত পেছাচ্ছে। পলিটেকনিকসহ কারিগরি শিক্ষার মেরুদ- হিসেবে পরিচিত ডিসিপ্লিনগুলোতে ভর্তি প্রতি বছরই আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।

কারিগরি বোর্ড চেয়ারম্যানকে কোনো বেসরকারি পলিটেকনিকের নবীনবরণসহ কোনো অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে কর্তৃপক্ষকে গুনতে হয় লক্ষাধিক টাকা। তবে এ টাকা অগ্রীম পরিশোধ করতে হয়। বোর্ডের সব প্রশিক্ষণ-কর্মশালার জন্য তাকে সম্মানী দিতে হয়। এমনকি তিনি অনুপস্থিত থাকলেও সম্মানী নেন। অফিসে এসে তিনি ব্যাকডেটে নথিপত্রে স্বাক্ষর করেন। বোর্ডে সনদ বাণিজ্যও চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিলে শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া আর না দিলে ফেল করিয়ে দেওয়া কারিগরি বোর্ডে বড় কোনো ব্যাপার নয়। এ কথা জেনেও চুপ থাকেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ সচিব মহোদয়ের কাছে আছে। এ জন্য একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে কমিটিতে কে কে আছেন, তিনি বলতে পারেননি।

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত বোর্ড চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খানকে কয়েকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে প্রকাশিত একটি গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার কেন্দ্র করিনি বলেই এ অভিযোগ। আমি সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে যাই না। গেলে শিডিউলড হারে সম্মানী নিই। আবার অনেক সময় নিই না। প্রশিক্ষণ-কর্মশালায় যেদিন থাকি না সেদিন সম্মানী নিই না। সাধারণত থাকার চেষ্টা করি।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, অভিযোগ সামনাসামনি করা উচিত। অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড