• বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পরিবর্তন আসেনি চা শ্রমিকদের ভাগ্যে 

  বিশেষ প্রতিবেদক

০৮ মার্চ ২০২৪, ২০:৫০
পরিবর্তন আসেনি চা শ্রমিকদের ভাগ্যে 
সারাদেশে ছোটো-বড় চা বাগান আছে ১৬৭টি
মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯২টি চা বাগান
দৈনিক ১৭০ টাকা মজুরি পান নারী শ্রমিকরা
পাহাড়ে পাহাড়ে কাটে শ্রমিকদের জীবনের ৩৫টি বছর
চা বাগানে অর্ধেক নারী শ্রমিক হলেও নারী হিসেবে কর্মস্থলে যে সুযোগ-সুবিধা থাকার দরকার, তারা তা পাচ্ছেন না। রামভজন কৈরী, নির্বাহী উপদেষ্টা, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন

স্বাধীনতার এতো বছর পেরিয়ে গেলেও চা বাগানের শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি তাদের জীবনযাত্রায়। চা বাগানের এই জনগোষ্ঠী এখনো ব্রিটিশ সামন্তবাদ আর স্থানীয় বাবু-সাহেবদের বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারেনি। এক রকম দাসত্বের জীবন কাটালেও প্রজš§ থেকে প্রজšে§ উৎপাদন ধরে রেখেছেন তার। কিন্তু পরিবর্তন আসেনি চা শিল্পের শিল্পীদের।

অধিকাংশ সময় চা বাগানের কাজে ব্যস্ত থাকেন নারী শ্রমিকরা। কারণ এ কাজে কুঁড়ি উত্তোলনে পুরুষ শ্রমিকদের থেকে নারী শ্রমিকরা অধিক দক্ষ। তাই চা শিল্পের সঙ্গে নারী শ্রমিকদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। জানা গেছে, সারাদেশে ১৬৭টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯২টি। জেলায় দৈনিক ১৭০ টাকা মজুরিতে নারী শ্রমিকরা বিশাল বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চায়ের পাতা তোলেন। প্রত্যেক নারী শ্রমিকের জীবনের ৩০ থেকে ৩৫টি বছর কেটে যায় পাহাড়ের টিলায় টিলায়।

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন চা বাগানের কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, তাদের সারাদিন রোদ-বৃষ্টি-তুফান তাদের মাথার উপর দিয়ে যায়। তারা বিশ্রাম নেয় শুধুমাত্র দুপুরের খাবার সময়টুকুতে। বাগান থেকে বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খেতে গেলে সময় নষ্ট হয়। আর সময় নষ্ট হলে সেদিনের মজুরি কম হবে, তাই তারা বাসায় যান না। এ কারণে বাগানেই তারা দুপুরের খাবার খান। রাগে-ক্ষোভে শ্রমিকরা বলছেন, কাজ করি ভালোভাবে বাঁচার জন্য। এত কষ্টের কাজ করেও যদি বাঁচার মতো মজুরি না পাই তাহলে চা বাগানের কাজ করবো কেন?

চা বাগানের নারী শ্রমিকেরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করেন। আর পুরুষ শ্রমিকরা কাজ করেন তাদের অর্ধেক সময়ে, কিন্তু নারী-পুরুষ সমান মজুরি পান বলে তারা জানান।

চা সংশ্লিষ্টরা জানান, মোট চা শ্রমিকের প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী এবং তাদের প্রায় সবাই খুব ছোটবেলা থেকেই চা বাগানে কাজ করা শুরু করেন। জনপ্রতি চা শ্রমিকদের দিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ চা পাতা তোলার লক্ষ্য দেওয়া হয়। বাগান বিশেষে হয়তো এই লক্ষ্যটি ১৮ থেকে ২৫ কেজিতে উঠানামা করে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে কাটা যায় মজুরি। তেমনি লক্ষ্যের চেয়ে বেশি পাতা তুললে ২ থেকে ৫ টাকা প্রতিকেজি পাতার জন্য বাড়তি মজুরি দেওয়ার কথা। তবে এক্ষেত্রে নারীদের মজুরি কম দেওয়া হয় বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।

আমাদের দেশে ১৭০ টাকায় আট ঘণ্টা কাজ করে দেবে এমন কেউ আছে? এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে রাজনগর চা বাগানে শ্রমিক ঝুমা নাইডু বলেন, আগে আরও মজুরি কম ছিল। এখন মজুরি কিছু বাড়ছে, ১৭০ টাকা হয়েছে। তবে এ মজুরি দিয়ে আমাদের চলে না। এটা তো মানায় না। আমরা শিক্ষায় আগাতে পারি, না পারি জমি কিনে ঘরবাড়ি বানাতে। আমাদের জীবন এরকমই। কোথায় যেন জীবন আটকে আছে।

শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও বাগানের চা শ্রমিক আশালতা কুর্মি বলেন, সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে যে অন্য পেশায় পাঠাব, সেই ক্ষমতা তো আমাদের নেই। চা বাগানের শ্রমিক হওয়ার জন্যই আমাদের জš§। আমার মা-বাবা বাগানে কাজ করছেন। আমি করছি। আমার সন্তানরাও করবে।

চা শ্রমিক সন্তান মিন্টু দেশোয়ারা বলেন, চা বাগানগুলোতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার মানের অবস্থা খুবই নাজুক। কারণ এখানে স্বাস্থ্যসেবার নামে চলে রসিকতা। অনেক চা বাগানে হাসপাতাল নেই, হাসপাতাল থাকলে ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। অভিজ্ঞ ধাত্রী নেই। এই নেই নেই এর মধ্যে চলছে বাগানগুলোর স্বাস্থ্যসেবা।

চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করছেন এস এম শুভ। তিনি জানান, চা শ্রমিকরা সংসার চালান ১৭০ টাকা মজুরি দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে। তাদের শরীরের দিকে তাকালে জীবনযাপনের কষ্ট কেমন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনিতেই এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সবাই হিমশিম খাচ্ছেন। ভালো খাবার তো দূরের কথা নিত্যদিনের বাজার করাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে শ্রমিকদের। চা বাগানের নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি কম পান, গর্ভবতী নারীরা পেটে সন্তান নিয়েও কাজ করেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহী উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, চা বাগানে অর্ধেক নারী শ্রমিক হলেও নারী হিসেবে কর্মস্থলে যে সুযোগ-সুবিধা থাকার দরকার, তা তারা পাচ্ছেন না। চা বাগানের সেকশনগুলোতে নারী চা শ্রমিকদের জন্য শৌচাগার নেই। বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার জন্য সরকার ও বাগান কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানাই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড