• রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গণমাধ্যমের ডিজিটাল সমীকরণ

কতটা এগিয়েছে, কতটা পিছিয়ে বাংলাদেশ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:৫০
অধিকার

বিবর্তনের পথ ধরে সামনের দিকে এগিয়েছে মানবসভ্যতা। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র- আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কাঠামো ক্রমাগত যুক্তিগ্রাহ্য, মানবিক ও শ্রেয়তর করার অব্যাহত প্রচেষ্টার মাঝেই নিহিত আছে সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে মানুষের চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা। জনমানসে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে নাগরিকতাবোধ, জনমনে ক্রমশ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে সার্বভৌমত্বের ধারণা। আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের পাশে যুক্ত হয়েছে গণমাধ্যম, যা কার্যত রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে। উনিশ শতকে বিজ্ঞানের এ অর্জন সংবাদপত্রের ইতিবৃত্তে আধুনিকতার উদ্বোধন ঘটায়। চীনে হাতে লেখা খবরের কাগজের চল থাকলেও ইউরোপ-আমেরিকা এমনকি ভারতবর্ষেও সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে এ শতকেই। সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে সংবাদপত্র নতুন যুগের সূচনা ঘটায়। গণতান্ত্রিক অনুশীলনের সংস্কৃতিতে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা, নতুন গতি। ছাপা পত্রিকাসহ গণমাধ্যমের ওপর ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব বাড়ছে। ডিজিটাল মাধ্যমের সুবিধা নিয়ে গণমাধ্যম আরও গতিশীল হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন ডিজিটাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সনাতনী মিডিয়াতেও লেগেছে নতুন যুগের হাওয়া। টিকে থাকার লড়াইয়ে সকলকে ডিজিটাল আয়োজনে সাড়া দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশে ইউনিক বা একক মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ সাইটে তরুণদের মুখ্য অংশগ্রহণ। সংবাদপত্র পাঠক তথা গণমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এখন মাল্টিমিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে। ফলে মিডিয়া তার চরিত্র বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। সামনের দিনগুলো হবে অনলাইন পরিসরের দিন। বর্তমানে ডিজিটাল সমীকরণে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটা এগিয়েছে, কতটা পিছিয়ে?

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’র (বাসস) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি একবিংশ শতাব্দীকে তথ্যপ্রযুক্তির শতাব্দীতে পরিণত করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির যে অভাবনীয় ও উদ্ভাবনী বিস্তার, যে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, সেটার কারণেই আমরা আজ সারা পৃথিবীকে গ্লোবাল ভিলেজ করছি। গ্লোবাল ভিলেজ কথাটাই এসেছে তথ্যপ্রযুক্তি থেকে। সে কারণেই গণমাধ্যমগুলো তথ্য প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল সমীকরণে বাংলাদেশের গণমাধ্যম অনেক দূর এগিয়েছে। ফলে প্রতি মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে কন্টেন্ট বা আধেয় ছড়িয়ে দিতে পারে। আমি নিজেও মনে করি গণমাধ্যমের ডিজিটাল এখন গণমানুষের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

আরেফিন সিদ্দিক বলেন, তথ্য প্রযুক্তির বিস্তারে কারণে গণমাধ্যমের যে অবাধ স্বাধীনতা পুরো বিশ্বজুড়ে, সে টিকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে, বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করা, সেটি আমাদের জন্য এখন আরও বেশি বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশেরে গণমাধ্যমের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। আমরা অনেক সময় গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে সংবাদ করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই সরকারের পক্ষ থেকে, যারা গণমাধ্যম দেখাশোনার দায়িত্বে থাকে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তারা কিছুটা শঙ্কিত থাকেন এবং সেই কারণে কিছু আইন কানুন করা হয়েছে। এই আইন কানুন কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রনের জন্য নয়। এগুলো হচ্ছে গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত রাখা। এ ধরনের আইন পৃথিবীর সব দেশে, গণতান্ত্রিক দেশেই আছে। গণতন্ত্রের একটাই কথা আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেব, কিন্তু স্বাধীনতা যেন কোনো অপরাধের দিকে নিয়ে না যায়। এই স্বাধীনতা যেন অপব্যবহার না হয়।

এ বিষয়ে চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশে বা বিশ্বের দরিদ্রতম, অনুন্নত দেশে যখন ‘উন্নয়ন’ শব্দটি উচ্চারিত হয় তখন প্রথমেই যা ধারণায় আসে তা হলো খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর কৃষি উন্নয়নে এই দেশগুলো কতটুকু এগিয়েছে। হয়তো আরও কিছু সূচকের কথাও উঠে আসবে। উল্টো দিকে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকালে হয়তো প্রযুক্তি, আধুনিকতা, কর্মসংস্থান, ভালো বেতন- এসব উন্নয়নের কথাই উঠে আসবে। পশ্চিমা দুনিয়াতে এমন ধারণাটি অস্বাভাবিক নয়। যদি বাংলাদেশের উদাহরণটি টানি, তাহলে সত্যিকারের উন্নয়ন বলতে বোঝাবে মানুষের উন্নয়ন, তাদের জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তনের বিষয়টি। আর এ কাজটি ত্বরান্বিত করতে সমাজের দর্পন, গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।

শাইখ সিরাজ বলেন, গণমাধ্যম নামক এই স্তম্ভটির কাজের ব্যাপ্তি অনেক। এশিয়া মহাদেশে ষাটের দশকের শেষ দিকে উন্নয়ন সাংবাদিকতার শুরু। তখনকার নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে উন্নয়নের লক্ষ্যে যোগাযোগের ধারণাটি যখন রাজনৈতিক এবং বিদ্যাজাগতিক সমর্থন পেয়েছিলো, ঠিক তখন থেকেই। সে সময় উন্নয়ন সাংবাদিকতাকে মূল্যায়ন করা হয় জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে। বোঝাই যাচ্ছে এই সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। ধীরে ধীরে, অন্যান্য মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে এই ‘নতুন’ সাংবাদিকতার ধারণা, বিশেষ করে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলার পথে আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন নতুন নিয়ম, ধারণা, এবং অনালোকিত অনেক কিছুই হয়েছে আলোকিত। তবে, বলতেই হচ্ছে উন্নয়ন সাংবাদিকতার নতুন নতুন ধারণাগুলো এখনো সন্নিবেশিত হয়নি বিদ্যাজাগতিক পরিমণ্ডলে, সাংবাদিকতার অধ্যয়নে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী গণমাধ্যম ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ সাইটে তরুণদের মুখ্য অংশগ্রহণ। সংবাদপত্র পাঠক তথা গণমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এখন মাল্টিমিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে। ফলে মিডিয়া তার চরিত্র বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে সংবাদ পাঠক মুহূর্তে জানতে পারছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমও সে পথেই হাঁটছে। অন্য যে বিষয়টিতে আমি আলোকপাত করতে চাই তা হলো তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর সঠিক বিশ্লেষণের কাজ এখনো অনেক বাকি আর এই কাজ শেষে মাঠে প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন আরও অনেক বেশি পেশাদারিত্বের।

গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাখাওয়াত আলী খান বলেন, গণমাধ্যম বর্তমান সময়ে যে দ্রুত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ইতিহাসে বিশ্বব্যাপী এমন রূপান্তরের ঘটনা এর আগে কোনো ক্ষেত্রে ঘটেছে কি না, বলা কঠিন। বরং বলা যায়, নীরবে ঘটলেও এই ‘বিপ্লব’ বোধ করি সব বিপ্লবের বাড়বাড়ন্ত। মুহূর্তে মুহূর্তে এখন বদলে যাচ্ছে গণমাধ্যমের অবয়ব। গণমাধ্যম সম্পর্কে যেসব কথা সদ্য জেনে আপ্লুত হচ্ছি, আগামীকাল বা পরশুই তা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক অতীত ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। আজকের ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এই বিষয়টি যেমন ঘটছে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে, ততটা দ্রুত না হলেও এই পরিবর্তন আসছে আমাদের প্রিয় কাগুজে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও। সংবাদপত্র বিলুপ্ত হওয়ার নয়, এই বিশ্বাসের পক্ষে কিছুদিন আগেও কিছু ‘অকাট্য’ প্রমাণ হাজির করতে আমরা চেষ্টা চালিয়েছি। সেই সব প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা এখনো পুরোটা হারিয়ে যায়নি।

তিনি বলেন, সংবাদপত্রজগতের সর্বশেষ অবস্থা হলো, উন্নত দেশগুলোতে হালে সংবাদপত্র অনেকটাই পাঠকের আকর্ষণ হারাচ্ছে। সেই সব দেশে অনেক নামকরা বড় সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কাগজের সংবাদপত্র কেবল অনলাইনে টিকে আছে। কিন্তু উন্নয়নশীল এমনকি মধ্য আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও চিত্রটি খানিকটা আলাদা। এই দেশগুলোতেও অনলাইন মাধ্যমের জনপ্রিয়তা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে নতুন সংবাদপত্র প্রকাশের ঘটনাও নেহাত কম নয়। সংবাদপত্রের দীর্ঘদিনের পাঠকেরা তাঁদের এই বিশ্বস্ত বন্ধুকে একেবারে ছেড়ে যায়নি। তবে এটা ঠিক যে যুগের হাওয়া বুঝে বড় বড় সংবাদপত্র অনলাইন সংস্করণ চালু করেছে। একই সঙ্গে কাগজের সংবাদপত্র ক্রমশই তাদের রূপ পাল্টাচ্ছে। একদিকে সংবাদপত্র যেমন প্রধানত ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে আগের চেয়ে অনেক রঙিন হচ্ছে, তেমনি সংবাদপত্রের আধেয়রও পরিবর্তন হচ্ছে। সংবাদ হিসেবে গণ্য ঘটনার বিবরণ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে, খেলাধুলাসহ অনেক ঘটনাই সরাসরি দেখানো হচ্ছে টিভিতে, ফলে পরের দিন প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো দিতে বাধ্য হচ্ছে সেই ঘটনারই ব্যাখ্যা কিংবা বিশ্লেষণ। আবার সংবাদপত্র এই মুহূর্তে আলোচনায় নেই, তেমন বিষয় নিয়েও ব্যাখ্যামূলক কিংবা অনুসন্ধানমূলক সংবাদ প্রকাশ অথবা ফিচার তৈরি করছে। বেশ কিছু পাঠক অবশ্য এই প্রক্রিয়া পছন্দই করছেন এবং তাদের সংখ্যা বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি নতুন পাঠক সৃষ্টিতেও সহায়ক হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই (সোশ্যাল মিডিয়া) অধিকাংশ ‘ব্রেকিং নিউজ’ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশ তাতে সত্য-মিথ্যা গুলিয়ে ফেলছে। কেউ কেবল অর্ধ সত্য দিয়ে সৃষ্টি করছে বিভ্রান্তি। অথচ বিশ্বাসযোগ্যতাই হচ্ছে প্রকৃত গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড। ডিজিটাল গণমাধ্যমগুলোর আরও বস্তুনিষ্ঠার সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে। সজীব সংবাদপত্র বজায় রাখার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালালে এবং পরিবর্তনের এই ধারায় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আশা করি ডিজিটাল গণমাধ্যমেও মানুষের আস্থা থাকবে।

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড