• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

পুড়িয়ে দেয়া হয় বাড়ি

আড়ালে লুকিয়ে থাকেন পুনরায় ধর্ষণের ভয়ে...

যে মাটিতে শহীদের দেহাবশেষ সে মাটিতে রমা চৌধুরী জুতো পায়ে হাঁটেননি

  অধিকার ডেস্ক    ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:১৮

রমা চৌধুরী
ছবি : সম্পাদিত

‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত রমা চৌধুরীর জীবনের এমন চিত্র আমাদের স্বাধীন দেশের দিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলে দিচ্ছে, দেশের জন্য তাঁর সব ত্যাগ যেন ধুলোয় মিশে গেছে, সেই ধুলো মাড়িয়ে নগ্ন পায়ে হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করে আহার জোটাতেন। আহারের সন্ধানে হেঁটে বেড়ানো বৃদ্ধা রমা চৌধুরীর শরীরে ছিল স্বাধীনতার ঘ্রাণ, মস্তিষ্কে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দীপ্ত শপথ, অস্তিত্বে ছিল পাক হানাদারদের নৃশংস ছাপ, মুক্তিযুদ্ধে যিনি হয়েছিলেন নিঃস্ব। স্বাধীনতার এত বছর পরেও কি এই রাষ্ট্র রমা চৌধুরীর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পেরেছিল? শূন্য হাতেই কি বিদায় নিলেন একাত্তরের গর্ব এই বীরাঙ্গনা জননী। মরে গিয়ে জাতির কাছে রেখে গেলেন এই প্রশ্ন।

১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে জন্ম রমা চৌধুরীর। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) তিনি। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর ১৯৬২ সালে ইংরেজি সাহিত্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী। পাকিস্তানি হায়েনারা তার সন্তান, ভিটেমাটি, সম্ভ্রম সব কেড়ে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নিজের সম্ভ্রম হারানোর পর দুই সন্তান হারানো, তার মধ্যে সমাজের লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অভাব, জীবন সংগ্রাম ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক সময় রমা চৌধুরীর প্রথম সংসারেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। পরে দ্বিতীয় সংসার বাঁধতে গিয়ে হয়েছেন প্রতারণার শিকার। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনুও ১৯৯৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল। 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাড়িঘর, তিন শিশু সন্তান, স্বামী হারিয়েই ক্ষান্ত হয়নি তার জীবনের দুর্ভোগ। পাক হানাদার বাহিনী তার ওপর চালিয়েছিল অত্যাচার, কেড়ে নিয়েছিল সম্ভ্রম। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একাত্তরের ১৩ মে তিন শিশু সন্তান নিয়ে পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন রমা চৌধুরী। আর স্বামী ছিলেন তখন ভারতে। ওইদিন সেই এলাকার পাকিস্তানি দালালদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীর লোকজন রমা চৌধুরীর বাড়িতে হানা দেয়। নিজের মা, পাঁচ বছর ৯ মাস বয়সী ছেলে সাগর ও তিন বছর বয়সী ছেলে টগরের সামনেই তাকে ধর্ষণ করে এক পাকিস্তানি খানসেনা। পাকসেনারা রমা চৌধুরীকে শুধু ধর্ষণেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের বাড়িও পুড়িয়ে দেয় তখন। হানাদারদের হাত থেকে কোনো মতে মুক্ত হয়ে রমা চৌধুরী পুকুরে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন পুনরায় ধর্ষণের ভয়ে। চোখের সামনে গান পাউডার দিয়ে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় পাকসেনারা। ঘরের মূল্যবান মালামাল, নিজের লেখা সাহিত্যকর্ম চোখের পলকেই পুড়ে যেতে থাকল। কিন্তু হানাদারের ভয়ে কেউ আগুন নেভাতে সে দিন এগিয়ে যায়নি। এক পর্যায়ে রমা চৌধুরী নিজেই ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেন ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ছিঁটেফোটা কিছু রক্ষা করার, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। 

আমাদের সমাজে একজন ধর্ষিতা নারী ধর্ষণের পরে নিত্য ধর্ষিত হতে থাকে প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিতে আর বাক্যবাণে। সমাজের চোখে সে একজন ধর্ষিতা। পাকিস্তানি হানাদারের হাতে সম্ভ্রম হারানোর পর কেউ কেউ হয়তো সহযোগিতার হাত নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু নিকটজনসহ সমাজের কাছে শুরু হল তার দ্বিতীয় দফা লাঞ্ছিত হবার পালা। পাক-হানাদারদের কাছে নির্যাতিত হবার পর সমাজের লাঞ্ছনায় এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়লেন রমা চৌধুরী। পোড়া দরজা-জানালাবিহীন ঘরে শীতের রাতে বস্ত্রহীন থাকতে হয়েছে মাটিতে। গরম বিছানাপত্র নেই। সব পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দিনান্তে ভাত জুটে না। অনাহারে, অর্ধহারে ঠান্ডায় দু'সন্তান সাগর আর টগরের অসুখ বেঁধে গেল। 

১৫ ডিসেম্বর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় সাগরের। ছেলেকে সুস্থ করতে তখন পাগলপ্রায় দশা রমা চৌধুরী'র। গ্রামের এক সাধারণ কাক-ডাক্তার চেষ্টা চালালেন। সেই চেষ্টায় কোনও কাজ হল না। ২০ ডিসেম্বর রাতে সাগর মারা গেল। প্রথম সন্তানকে হারিয়ে রমা চৌধুরী তখন প্রায় পাগল হয়ে গেলেন। একই অসুখে আক্রান্ত হল দ্বিতীয় সন্তান টগরও। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্ধউন্মাদিনী রমা চৌধুরী নিজের ছেলে টগরকে ওষুধ খাওয়াতে গেলেন। নিজের অসাবধানতায় কখন যে ছেলে টগরের শ্বাসরোধ হয়ে গেল, টের পেলেন না রমা চৌধুরী। এভাবে টগরও মারা গেল।

সব হারিয়ে রমা চৌধুরী হয়েছিলেন বইয়ের ফেরিওয়ালা। নিজের লেখা বই ফেরি করে বিক্রি করতেন। তাকে ভালবাসেন, শ্রদ্ধা করেন এমন কিছু বাধা গ্রাহক ছিলেন তার। তারাই রমা চৌধুরীর বই প্রথমে কিনে নিতেন। ২০টি বই প্রকাশ করেছিলেন রমা চৌধুরী। যে দিন বই বিক্রি হয় সেদিন তিনি দুমুঠো খান। যে দিন বই বিক্রি নাই সেদিন রমা চৌধুরী উপস থাকেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ রমা চৌধুরীদের মতো অনেকের কাঁধেই ঝোলা দিয়েছে। খালি পায়ে হাঁটা শিখিয়েছে। সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। সন্তান হারাতে হয়েছে। সমাজের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা সইতে হয়েছে। সত্যিকারের রমা চৌধুরীদের জীবনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। 

যে মাটিতে শুয়ে আছে শহীদেরা, যে মাটিতে মিশে আছে স্বামী-সন্তানের দেহাবশেষ, সে মাটিতে জুতো পায়ে হেটে বেড়াবেন রমা চৌধুরী! সনাতন ধর্মের রীতি অনুযায়ী মৃতদের দাহ করা হলেও রমা চৌধুরী এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না। তার স্বামী-সন্তানের বেলায় এই নিয়মের বাহিরে গিয়ে দিয়েছিলেন মাটি চাপা। পারিবারিক চাপে কয়েকবার জুতো পড়লেও তা ছিল অতি ক্ষণিকের। যে মাটিতে শহীদের দেহাবশেষ, যে মাটিতে তার স্বামী-সন্তানের দেহাবশেষ মিশে আছে সে মাটিতে রমা চৌধুরী পায়ে জুতো চাপিয়ে হেটে বেড়াতে পারেন নাই। এই মাটির প্রতি তার ভালবাসা এখানেই স্পষ্ট হয়ে আছে। নগ্ন পায়ে বীরাঙ্গনা হেটে হেটে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে বেড়াতেন। বেশ কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে গণভবনে গিয়েছিলেন রমা চৌধুরী। তার কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধু দোয়াই চেয়েছিলেন। আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই বলেই জানান। 

রমা চৌধুরী আমাদের একাত্তরের জননী। রমা চৌধুরীরা আমাদের একাত্তরের বীরাঙ্গনা। তপ্ত রোদে নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়ানো রমা চৌধুরী ধারণ করেছিলেন এদেশের স্বাধীনতা। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড