• শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

২০১৯ এ ৪৮ বছরের রেকর্ড ভাঙে ডেঙ্গু

  জিন্নাত আরা ঋতু

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:২৫
ডেঙ্গু
চলতি বছরে ডেঙ্গুর উপদ্রব (ফাইল ছবি)

২০১৯ সালের এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বিগত সালের সকল রেকর্ডকে হার মানিয়েছে এ বছর। ডেঙ্গু প্রথমে রাজধানীতে এবং পরবর্তীকালে ভয়াবহভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গুর তাণ্ডবে কেঁপে ওঠেনি এমন মানুষ মেলা ভার। 

২০০২ সালে দেশে প্রথম ব্যাপকভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তবে এবারের ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নতুন ইতিহাসের সূচনা ছিল। যদিও বেসরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনশোর কোঠায়, তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেড়শো পার হয়নি। 

ডেঙ্গু জ্বরের ধরনও বদলে গেছে এ বছর, এমন কথা উল্লেখ করে একাধিক চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু হলে আগে প্রথমে উচ্চমাত্রার জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও গায়ে র‌্যাশ বা ফুসকুড়ি হতো। পরবর্তীকালে চার থেকে সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গু হেমোরেজিকের নানা লক্ষণ (প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা কমে যাওয়া, দাঁতের মাড়ি, নাক, মুখ ও পায়ুপথে রক্তপাত) প্রকাশ পেত। কিন্তু ২০১৯ সালে জ্বর ওঠার দু-একদিনের মধ্যে ডেঙ্গু হেমোরেজিকের লক্ষণসহ রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে দেখা গেছে। এমনকি স্বল্প সময়ে রোগী ‘শক সিনড্রোমে’ আক্রান্ত হয়ে হার্ট, কিডনি, লাংসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাচ্ছে। আইসিইউ-তে ভর্তি করার পরও রোগীর মৃত্যু হতে দেখা গেছে।

ডেঙ্গুতে মৃতের তালিকা 

সরকারি হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল এক লাখ ২০১ জন। এ সময় ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৯ হাজার ৫১২ জনে। বর্তমানে দেশেরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ভর্তি রয়েছে ৪২২ জন রোগী। এর মধ্যে ঢাকায় ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ২৫০ জন রোগী। অন্যান্য বিভাগে ১৭৫ জন।

সরকারি হোক আর বেসরকারি ডেঙ্গু আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড এখন পর্যন্ত এটিই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এক মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এত রোগী কখনোই হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। 

এ দিকে ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৪ জনের মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এর মধ্যে ২০৪ জনের মৃত্যু পর্যালোচনা করে ১২৯ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে। 

২০১৯ সালে রাজধানীতে ১৯ হাজার ৯৩৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, এতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ জন। এ ছাড়া রাজধানী ব্যতীত ঢাকা বিভাগে ১১ হাজার ৬১৫ জনের ডেঙ্গু সনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১৯ জনের মৃতের সংখ্যা  নিশ্চিত করে।

এছাড়াও ঢাকা বিভাগের গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৬১৫, মোট ছাড়পত্র পায় ১১ হাজার ৫৭২ এবং ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যু হয় ১৪ জনের। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৫ জনের। 

ময়মনসিংহসহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোণায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৬১, ডেঙ্গু সন্দেহে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ জনে এবং ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যু হয় ২ জনের। অপর দিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায় ২ হাজার ৩৫১ রোগী। 

চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৮ হাজার ১৮৮ জন রোগী। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায় ৮ হাজার ১২৮, ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যু হয় ৭ জনের ও ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যু হয় ২ জনের। 

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর তালিকা

দেশের দক্ষিণাঞ্চল খুলনাসহ কুষ্টিয়া, মাগুরা, নড়াইল, যশোর, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১১ হাজার ৮৫১ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায় ১১ হাজার ৭৭০, ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যু হয় ২৪ জনের ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু নিশ্চিত হয় ৪ জনের। 

রাজশাহীসহ বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাটে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪ হাজার ৮০০ জন। ছাড়পত্র পায় ৪ হাজার ৭৭৮ রোগী, এর মধ্যে ডেঙ্গু সন্দেহে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ জনের, ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৪ জনের। 

রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ২ হাজার ১৬৩ জন। ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যু হয় ৪ জনের, এর মধ্যে ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যু হয় ২ জনের।

বরিশালসহ পটুয়াখালী, ভোলা পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরগুনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৭ হাজার ৩৪ জন রোগী। এর মধ্যে ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যু হয় ৫ জনের, এর মধ্যে ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যু হয় ২ জনের। 

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ১০ রোগী। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায় ১ হাজার ৬ জন, ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিত করে ১ জনের। তবে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা জানা যায়নি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (ডিসেম্বর) মাসে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ২১২ জন।

গত বছর পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ দু-তিনটি জেলায় সীমিত সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলেও এবারই প্রথম দেশের সব জেলায় ডেঙ্গু রোগী মিলেছে। জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস ইজিপ্টের পাশাপাশি এডিস এলবোপিক্টাস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

আইইডিসিআর জানিয়েছে, এবার অন্য বছরের তুলনায় গৃহিণীদের ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা কম। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হলেও বেশি মৃত্যু হয়েছে নারী ও শিশুর।

সাধারণত মশক নিধন কার্যক্রমের স্থবিরতা, গাইডলাইনের অভাব এবং মানুষের অসচেতনতায় ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য দায়ী। হঠাৎ থেমে থেমে স্বল্পমেয়াদি বৃষ্টিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা খুব বেশি মাত্রায় প্রজনন সক্ষমতা পায়। ফলে এডিস মশার বিস্তারও ঘটে বেশি। তবে প্রথম দিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগের আঙুল প্রধানত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং সরকারের দিকে পড়লেও পরবর্তীকালে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় সফলতাটা আসে তাদেরই হাত ধরে।

ওডি/এসজেএ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড