• বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধুলায় দূষণে অতিষ্ঠ জনজীবন

  নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৫৯
ধুলায় দূষণে অতিষ্ঠ জনজীবন (ছবি- সংগৃহীত)
ধুলায় দূষণে অতিষ্ঠ জনজীবন (ছবি- সংগৃহীত)

মাত্র কয়েকদিন আগে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ এতটাই চরমে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তখন এটিই ছিল পৃথিবীতে সর্বাধিক দূষিত বাতাসের নগরী। এর অর্থ, এ ক্ষেত্রে ঢাকা দিল্লিকেও অতিক্রম করেছিল। বেশ কিছু দিন ধরে ঢাকার বাতাসে দূষণ বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। তাই অতীতের ‘মসজিদের শহর’টি বর্তমানে ‘দূষণের শহর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ঢাকার দূষণ কতটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটি তুলে ধরেছে বৈশ্বিকভাবে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়াল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ২৪ নভেম্বর সকাল সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় ঢাকাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। এরপর কয়েক ঘণ্টার জন্য মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর ও ভারতের কলকাতা শহর দূষণের দিক থেকে ঢাকাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে রাত সাড়ে আটটার পর ঢাকা আবার শীর্ষে চলে আসে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির বায়ুদূষণের খবর গত মাসের শুরুতে বেশ কয়েকবার বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। দূষণের কারণে সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তবে গত মাসে অন্তত আট দিন দিল্লিকে পেছনে ফেলে দূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম।

ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি সম্পর্কে গবেষকেরা বলছেন, নভেম্বর মাসে অন্তত আট দিন (দিনের বেশির ভাগ সময়) ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। এয়ার ভিজ্যুয়াল রাজধানীর সাতটি এলাকার বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার মধ্যে বায়ুর মান সবচেয়ে খারাপ ছিল কারওয়ান বাজার এলাকায়। এরপরই মোহাম্মদপুর ও গুলশান এলাকা। এর বাইরে উত্তরা, মিরপুর ও নর্দ্দা এলাকার বায়ুর মানও বেশ খারাপ। এলাকাভিত্তিক বায়ুর মানের রকমফের থাকলেও সামগ্রিকভাবে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার বায়ু অস্বাস্থ্যকর বলে জানান গবেষকেরা।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দেশের ১১টি শহরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, সাভার, ময়মনসিংহ, রংপুরের বায়ুর মান গত শনিবার খুবই অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিল। তুলনামূলকভাবে চট্টগ্রামের বায়ুর মান কিছুটা ভালো ছিল। খুলনা ও কুমিল্লার বায়ুর মান চট্টগ্রামের চেয়ে খারাপ ছিল। বায়ুর মান অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল সিলেট শহরে।

বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, বাতাসে ভারী ধাতু ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা বেড়ে গেলে ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, স্নায়ুজনিত সমস্যা বেড়ে যায়, বুদ্ধিমত্তা কমে যায়।

এ দিকে, যানবাহনজনিত দূষণ ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। নির্মাণকাজের ধুলাও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। সরকারের পরিবেশ সচিব বলেছেন, ‘ঢাকায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা একা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই সংশ্লিষ্ট সবার মত নিয়ে পদক্ষেপ গৃহীত হবে।’

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রকাশ করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এই তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৩ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে দেশের ইটভাটাগুলোর ওপরে একটি জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশে ইটভাটার সংখ্যা ৪ হাজার ৯৫৯টি। পরে ২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ইটভাটার সংখ্যা বেড়ে ৭ হাজার ৯০২টি হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৮৭টি ইটভাটা ঢাকা বিভাগের মধ্যে গড়ে উঠেছে। ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে মোট যানবাহনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৪।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের এদেশীয় পরিচালক রাকিবুল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, বায়ুদূষণ মোকাবিলার প্রথম কাজ হচ্ছে দূষণের উৎস বন্ধ করা। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জলাশয়গুলো রক্ষা করা। এই দূষিত বায়ুর মধ্যে নগরের মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে, সেই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে সবার আগে বায়ুদূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে দেখতে হবে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এটি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বায়ুদূষণের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, দিনের চেয়ে রাতে দূষণের মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়। সরকারের তৎপরতায় দিনে কিছুটা কমলেও বিকেল থেকে দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বিকেল ৫টার পর থেকে রাতভর মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে ঢাকার বাতাস। গত বৃহস্পতিবার রাতে এয়ার ভিজুয়ালের র‌্যাংকিংকে এক ঘণ্টার জন্য দূষণের তালিকায় শীর্ষে উঠে যায় ঢাকা।

রাতে ঢাকায় দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির বড় কারণ বর্জ্য পোড়ানো। বর্তমানে ঢাকা শহরে ৪০টি স্থানে রাতের বেলায় বর্জ্য পোড়ানো হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাতাস দূষিত হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ এই বর্জ্য পোড়ানো। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সোমবারের সভায় রাতে বর্জ্য না পোড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ও ব্যবস্থাপনা) জিয়াউল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, কুয়াশার সঙ্গে দূষিত বস্তুকণার মিশ্রণে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। বিশেষ করে বাতাসে যখন কুয়াশার প্রলেপ থাকে, তাতে দূষিত বস্তুকণা মাটিতে পড়ে না। ফলে দূষণ বেড়ে যায়। তবে বৃষ্টি হলে মাটিতে সেগুলো মিশে গিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রচলিত আইনেই বায়ুদূষণ অনেকখানি রোধ করা সম্ভব। কিন্তু তা মানা হয় না। পানি ছিটানোর ক্ষেত্রেও যথাযথ নির্দেশনা মানতে দেখা যায় না। শীতকাল শুরুর আগেই ঢাকার চারপাশে একযোগে ইটভাটাগুলো চালু হয়েছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ নেই। এগুলো বায়ুদূষণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

ওডি/কেএসআর

jachai
nite
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
jachai

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড