• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (৯ম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৫৩
গল্প
ছবি : প্রতীকী

সায়েম লক্ষ্য করল সারা চোখ মুছছে। সারার মনে যে ওকে নিয়ে খারাপ ধারণা তৈরি হচ্ছে, সেটা বুঝতে বাকি রইল না সায়েমের। সায়েম রাফাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। রাগে ওর শরীর জ্বলে যাচ্ছে। সেভাবে জোর-ও করতে পারছে না সায়েম। কারণ কেবিনের বাইরে অসংখ্য লোকজন আছে৷ তারা কোনোপ্রকার ইস্যু পেলেই এখানে এসে হাজির হবে। তারপর শুরু হবে আরেক ঝামেলা। নানান জনের নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ঘটনাটি আরো খারাপ পর্যায়ে চলে যাবে। তাই আস্তে আস্তে রাফাকে বলল, ‘কী করছ কী রাফা? প্লিজ ছাড় আমাকে?’

সায়েমের নরম কণ্ঠস্বর শুনে রাফা যেন আরো পেয়ে বসল। আগের থেকেও শক্ত এবং আরো আষ্টেপৃষ্টে ধরল সায়েমকে। সায়েম কী করবে ঠিক ভেবে পাচ্ছে না। না পারছে রাফাকে কড়া গলায় কিছু বলতে, আর না পারছে সারার কাছে গিয়ে সত্যি ঘটনাটা বলতে। সায়েম অসহায়ের দৃষ্টিতে সারার দিকে তাকিয়ে রইল। সারা হঠাৎ চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল দরজার কাছ থেকে। সায়েম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সারা চলে যাওয়ার পর সায়েম এবার রাফার দিকে তাকালো। ওর দৃষ্টিতে আছে ঘৃণা। সাংঘাতিক ঘৃণা। কিছুক্ষণ সেভাবে তাকিয়ে থাকার পর সায়েম হাত দিয়ে রাফার মুখটা চেপে ধরল। এরপর রাফার কানের কাছে রাগী কণ্ঠে বলল, ‘দরজাটা খোলা আছে। তাছাড়া আশেপাশে অনেক মানুষ ঘোরাঘুরি করছে। সিনিয়র কেউ দেখে ফেললে আমার চাকরি নট হয়ে যাবে।’

সায়েমের কথা শুনে রাফা যেন আনন্দ পেলো। মুচকি হাসি দিয়ে সায়েমের বুকে চুমু দিলো। সায়েমের শরীরের রাগটা যেন কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। রাফার মুখটা চেপে ধরেই জোরে ধাক্কা দিলো। আচমকা ধাক্কায় সায়েমের শক্তির সাথে পেরে না ওঠে ছিটকে পড়ল রাফা৷ সায়েম রাফাকে ধরে ফেলল। হাত দিয়ে মুখটা চেপে ধরায় কোনোরকম শব্দ করতে পারল না রাফা। কিছুটা ব্যথা পেলেও নীরবে সয়ে গেল। সায়েম দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ঠাসস করে একটা থাপ্পড় মেরে দিলো রাফাকে। রাফা গালে হাত দিয়ে ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইল। একটা থাপ্পড় মেরেই থেমে গেল না সায়েম। ওর পুরো শরীরে এখন বিদ্যুতের মতো রাগ ছুটোছুটি করছে। রাফাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরেকটা থাপ্পড় মেরে দিলো। পরপর দু'টো থাপ্পড় খেয়ে ব্যথায় প্রায় কেঁদে দিচ্ছিল রাফা। তবুও নিজেকে সামলে নিলো এটা ভেবে যে, এমনটা হওয়ারই ছিল। ঘটনাটা যে সায়েম স্বাভাবিক ভাবে নিবে না, তা আগে থেকেই জানতো রাফা। সেজন্য নীরবে এইটুকু কষ্ট সহ্য করে নিলো। তবুও নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল বের হয়ে গেল ওর। সায়েম রাগে গজগজ করতে করতে বলল, ‘তোমার মতো বেহায়া আর নির্লজ্জ মেয়ে আমি খুব কমই দেখেছি রাফা।’

রাফা কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল,  ‘প্লিজ আমাকে ভুল বুঝ না। আমি শুধুমাত্র তোমাকে সামনাসামনি দেখার জন্যই এখানেই এসেছি। অন্যকোনো উদ্দেশ্য ছিল না আমার।’

- তাহলে এইসব কী হলো? আর আমি এতবার করে ছাড়তে বলার পর-ও ছাড়ছিলে না কেন তুমি?

মাথা নিচু করে রাফা বলল, ‘তোমাকে স্পর্শ করার সৌভাগ্য তো সবসময় হয় না আমার। সেজন্য এই সুযোগটা এত সহজে হাতছাড়া করতে চাচ্ছিলাম না।’

সায়েম ধমক দিয়ে বলল, ‘এইসব কথা আবার বললে আমার আরো ভয়ঙ্কর রূপ দেখবে তুমি। যা সহ্য করার ক্ষমতা তোমার নেই।’

রাফা চুপ করে গেল। সায়েম দরজার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিলো। তারপর আবার রাফার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন বল তুমি এখানে কীভাবে এসেছ? আর কেন এসেছ?’

- এসেছি কোনোভাবে। আর তোমাকে দেখতে এসেছি।

- তাহলে দূরে থেকে দেখেই চলে যেতে। এতসব নাটক করার কী প্রয়োজন ছিল? আজ তোমার এইসব নাটকের জন্য আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ কষ্ট পেলো। আমাকে ভুল বুঝে চলে গেল। এইসব হয়েছে শুধুমাত্র তোমার জন্য।

রাফা রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলল, ‘দরজার বাইরে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল, তাহলে সেটাই তোমার ভালোবাসার মানুষ।’

- হ্যাঁ। তুমি দেখেছ ওকে?

- না দেখার কী আছে? তোমার আগেপিছে, ডাইনে-বামে কখন কী ঘটে, কে থাকে, সবকিছুই আমি জানি। সব খবরাখবর রাখি আমি।

- তাহলে জিজ্ঞেস করলে কেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আমার ভালোবাসার মানুষ কিনা?

- জাস্টস্ ফর্মালিটি।

- আরে রাখ তোমার ফর্মালিটি। তোমার জন্য মেয়েটা কষ্ট পেলো৷ ওকে কাঁদতে হলো শুধুমাত্র তোমার কূ-কর্মের জন্য।

রাফা হাত কচলাতে কচলাতে বলল, ‘শুধু কী কষ্ট? ওকে তো আমি খুন করব। আচ্ছা তোমাদের এই অফিসের বিল্ডিংটা কত তলা?’

- আটতলা। কিন্তু কেন?

- ইয়েস, এই আটতলা বিল্ডিং থেকেই ওই মেয়েটাকে ফেলে দিবো আমি। ওকে নৃশংস ভাবে খুন করব। যাতে করে ওর প্রতি তোমার এই ভালোবাসা-ও ভয়ে কেঁপে ওঠে। মাংস তো দূরে থাক, শরীরের একটা হাড্ডি-ও খুঁজে পাবে না তুমি।

- চুপ কর রাফা। মনে হচ্ছে দু'টো থাপ্পড়ে তোমার হয়নি। আরো কয়েকটা দিতে হবে।

রাফা থেমে গিয়ে গালে হাত দিলো। সায়েম আবার বলল, ‘তোমাকে সেই বাচ্চা বয়স থেকে দেখছি আমি। যখন তুমি চোখ মেলতেও পারতে না ভালো করে। সত্যি বলছি রাফা, আমি কখনো ভাবিনি তুমি এইরকম হবে। তোমাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল তোমার বাবার। অনেক স্বপ্ন ছিল তার। তিনি মারা যাওয়ার পর সেইসব স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব ফাহাদ নিয়েছিল। আজও সেই মুহূর্তটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ফাহাদ কত কষ্ট করে তোমাকে আদর-যত্ন দিয়ে বড় করেছে, সেটা কী জানো না তুমি? আর সেই তুমিই এইরকম হয়ে গেলে। পাগলামির একটা সীমা আছে। যা বারবার অতিক্রম করছ তুমি। তোমার জন্য ফাহাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ভেঙে যেতে বসেছে। কেন বুঝতে চাইছ না, আমি কখনোই তোমাকে বোনের নজরে ছাড়া অন্যভাবে দেখিনি। যে মেয়েটাকে ছোট থেকে নিজের বোনের মতো দেখে এসেছি, সেই মেয়েকেই কীভাবে অন্যভাবে দেখব আমি? আমি নিশ্চয়ই বিবেকবুদ্ধি হারিয়ে ফেলিনি। তাছাড়া সম্পর্ক হয় অনেকগুলো মানুষের সাথে। শুধু আমার আর তোমার সাথে না। আমার বাবা-মা কখনোই তোমাকে ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিবে না। কারণ তারা তোমাকে নিয়ে সেভাবে ভাবেনি কখনো। এইসব কিছু আমার বাবা-মা জানতে পারলে, তারা তো স্ট্রোক করবে৷ প্লিজ চলে যাও আমার জীবন থেকে। অথবা আমার বোন হয়েই থাকো সারাজীবন। আমি সারাকে ভালোবাসি। আর ওকেই বিয়ে করব।’

- পরিবারের সবাই মেনে নিলে তুমিও আমাকে মেনে নিবে না তো?

সায়েম বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল, ‘আরে ভাই, তোমাকে আমি কী বুঝাচ্ছি, আর তুমি কী বুঝছ? আমার ইচ্ছে করছে তোমাকে খুন করে এই রুমে কোথাও লুকিয়ে রাখতে।’

- আগে বিয়ে কর, তারপর নাহয় প্রতিদিন আমাকে খুন করো।

- রাফা, তুমি একটা সাইকো। তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। আর শোন, আজকের পর থেকে আমার আশেপাশেও যেন তোমাকে না দেখতে পাই আমি। এবং ভুলেও এখানে আর আসার চেষ্টা করবে না। আমি জানি না কার মাধ্যমে এখানে ঢুকতে পেরেছ তুমি। বাট যে আড়ালে থেকে তোমাকে সাহায্য করছে, তাকে আমি ছাড়বো না। কোনোভাবে তার পরিচয় জানতে পারলে দেখবে, এই সায়েম কতটা খারাপ হতে পারে। সেই স্টুডেন্ট লাইফের সায়েম পূনরায় ফিরে আসলে তোমাদের জন্য তা মোটেও ভালো হবে না।" একনাগাড়ে কথাগুলো বলে বসের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো সায়েম। রাফা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সায়েমের বলা শেষের কথাগুলো ও শুনতে পায়নি।

অবশ্য সে চেষ্টাও করেনি। ও শুধু একটা কথাই বারবার ভাবছে,  তা হলো, ‘ভাইয়া আর সায়েম, দু’জনেই বলছে বিয়ের পরের সম্পর্কটা শুধুমাত্র দু'জন মানুষের মধ্যে হয় না, দু'টো পরিবারের মধ্যে হয়। কথাটা কী আসলেই ঠিক? তাহলে আমার এখন কী করা উচিত?’

রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘ইয়েস। উপায় পেয়েছি।’

রাফা-ও কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল কেউ কেউ আড়চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। রাফা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বেরিয়ে এলো অফিস থেকে।

বসের কেবিন থেকে বেরিয়ে সারাকে খুঁজতে লাগল সায়েম। কিন্তু সারার ডেস্কে গিয়ে ওকে পেলো না। ভ্রু-কুঁচকে চারিদিকে চোখ বুলাতে লাগল। সারাকে কোত্থাও দেখতে না পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল সায়েম। সায়েম জানে সারা ওকে ভালোবাসে। কিন্তু সারা সবসময় নেগেটিভ চিন্তাভাবনা নিয়ে চলে। সেজন্যই আজ-ও স্বীকার করেনি সায়েমকে ভালোবাসার কথাটা। তবে সায়েম বুঝতে পারে। সামনাসামনি ঝগড়া করলেও ইতির কাছ থেকে সবসময় সায়েমের খোঁজখবর নেয় সারা। 

এদিক-ওদিক খুঁজেও যখন সারার দেখা পেলো না, তখন এক কলিগকে জিজ্ঞেস করল, ‘সারাকে দেখেছেন ভাই?’

লোকটা হাত দিয়ে ইশারা করে দেখালো। সায়েমের আর বুঝতে বাকি রইল না সারা কোথায় আছে। এক মুহূর্ত-ও দেরি না করে সেখানে যেতে লাগল সায়েম। জায়গাটা তিনতলার এক বারান্দায়। চারিদিকটা খোলামেলা। সাধারণত অফিসয়াল সব পার্টি ওই বারান্দায় আয়োজন করা হয়। বেশ সাজানো-গোছানো একটা জায়গা। সায়েম বারান্দায় গিয়ে দেখল সারা উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু পরপর চোখ মুছছে। সায়েমের মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। সেই সাথে রাফার উপরে রাগটা আরো বেড়ে যাচ্ছে। রাফার জন্যই এতকিছু হলো, ‘মেয়েটা এত সাহস পায় কোথায়? যে অদৃশ্য হারামি ওকে উসকে দিচ্ছে, তাকে সামনে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খেতাম আমি।" বিড়বিড় করে কথাটা বলল সায়েম। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে সামনে এগিয়ে গেল। সারার পাশে দাঁড়িয়ে সারার হাতটা ধরল। হঠাৎ কারোর স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠল সারা। পাশে তাকিয়ে সায়েমকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সায়েম সারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল - " আমাকে শুধুশুধু ভুল বুঝছেন আপনি। আপনি যা ভাবছেন আসল ঘটনাটা মোটেও সেরকম না।’

সারা চোখটা মুছে সায়েমের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। এরপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘রুমের ভিতরে একজনকে জড়িয়ে ধরলেন, আবার এই বারান্দায় খোলামেলা জায়গায় আমার হাত ধরছেন। সবদিক ভালোই তো মেইনটেইন করতে শিখেছেন।’

সারার অভিমানী কণ্ঠ ভারী হয়ে আছে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। সায়েম আবারও সারার হাত ধরল। এরপর বলল, ‘আমাকে বিশ্বাস করুন প্লিজ। আপনি যেমনটা ভাবছেন আমি তেমন ছেলে নই। এতদিন ধরে তো আমাকে দেখছেন, আগে কখনো দেখেছেন এইরকম কিছু. আজ যেটা হয়েছে, সেটা ভুল বুঝাবুঝি।’

- আপনাকে বিশ্বাস করার মতো কোনো স্পেস খুঁজে পাচ্ছি না আমি। আমি তো নিজের চোখেই দেখলাম আপনি ওই মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে আছেন। আচ্ছা সায়েম, আমি আপনাকে বিয়ে করব না বলেছি বলেই কী আপনি অন্য একজনের সাথে এইরকম কিছু করবেন?  আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন বলেছিলেন। এই তার নমুনা। আমি আপনাকে কখনো ভালোবাসি বলিনি ঠিকই, আপনাকে বিয়ে করব এ'কথাও বলিনি ঠিকই। কিন্তু আমি তো এটা বলিনি, যে আমি আপনাকে পছন্দ করি না।

সায়েম অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আমি সবই বুঝতে পারছি সারা। বাট আমার কথাটা একটু মন দিয়ে শুনুন৷ আর আমাকে একটু বিশ্বাস করুন প্লিজ।’

সারা কিছু না বলে আবারও হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। সায়েম আর রাগটা কন্ট্রোল করতে পারল না। সারাকে রেলিংয়ের সাথে ঠেকিয়ে সারার কোমড়ে হাত দিকে কাছে টেনে নিলো। হকচকিয়ে উঠল সারা। সায়েম ওর কোমড় শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। ভয়ে কাঁপছে সারা। কিন্তু সায়েমের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ওর রাগ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেছে। সারাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। সারা বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সায়েমের দিকে। সায়েম কী করতে চাইছে তা ভালো করেই বুঝতে পারছে সারা।
- সায়েম কী অতটাও খারাপ, যতটা আমি ভাবছি? হতেও পারে। নাহলে এভাবে জনশূন্য স্থানে আমার সাথে জোরাজোরি করতো না।
 নিজের মনে মনে কথাগুলো বলল সারা। সায়েম ওর ঠোঁটের দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ একটু একটু করে সায়েম নিজের মুখটা সারার মুখের কাছাকাছি আনতে লাগল। খুব কাছাকাছি আসার পর থেমে গেল সায়েম। সারা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য জোরাজোরি করতে লাগল। কিন্তু সায়েমের শক্ত হাত ওকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়েছে। তার উপর কোমড়টা এমন ভাবে ধরে রেখেছে যে, একটু নড়াচড়া করলেই প্রচণ্ড ব্যথা পাচ্ছে সারা। কিন্তু এভাবে হাল ছাড়া যাবে না।

- সায়েমের মতো নোংরা মানুষের কাছে নিজের ভার্জিনিটি নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
 বিড়বিড় করে কথাটা বলল সারা। সায়েম হঠাৎ মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘খুব ভয় করছে, তাই না মিস সারা?’

সারা মুখে কিছু বলতে পারল না। তবে মনে মনে রাগ দেখিয়ে বলল, ‘উঁহু, আমি তো আরাম পাচ্ছি। শয়তান ছেলে একটা। কাপুরুষের মতো একা একটা মেয়েকে অত্যাচার করে বলছে " ভয় করছে"? যত্তসব নেকামি। তোর কোনোদিনও ভালো হবে না বজ্জাত ছেলে।’

কথাটা মনে মনে বলে সন্তুষ্ট হলো না সারা। ওর ইচ্ছে করছে সায়েমের চোখের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় কথাটা বলতে। কিন্তু না! সারার আসলেই খুব ভয় করছে। আর এই কথাটা শুনলে হয়তো সায়েম আরো রেগে যাবে। যার ফলে ও আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

সারাকে চুপ থাকতে দেখে সায়েম বলল, ‘এবার বলুন তো, দোষটা কার?’

সারা জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো সায়েমের দিকে। সায়েম হঠাৎ সারাকে ছেড়ে দিলো। সায়েমের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে যেন জীবন ফিরে পেলো সারা। বড়বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগল ও। ওর মনে হয়েছিল ভিতরের কলিজাটা কেউ খুবলে নিচ্ছিল। কিন্তু এখন ছাড়া পেয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিলো। সায়েম সারার থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বলল, ‘এক্ষুনি যেটা হলো, সেটার জন্য কে দ্বায়ী? দোষটা আসলে কার? আমার না আপনার?’

সারার দৃঢ়তা যেন বেড়ে গেল হঠাৎ করেই। হয়তো ছাড়া পেয়ে মনে কিছুটা সাহস ফিরে এসেছে। তাই সায়েমের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল, ‘অবশ্যই সব দোষ আপনার। শুধু দোষ বললেই শেষ হয়ে যাবে না, আপনি চরম অপরাধ করেছেন। যাকে বলে সাংঘাতিক অপরাধ। আপনি আমাকে জোর করে জড়িয়ে ধরেছেন। একা একটা মেয়ের উপর অত্যাচার করতে যাচ্ছিলেন আপনি।’

- আমি কাকে অত্যাচার করতে যাচ্ছিলাম সেই বিষয়ে পরে কথা বলছি। আগে এটা বলুন দোষটা যে আমার, সেটা এত জোর দিয়ে কীভাবে বলছেন আপনি?

- আমি এখন মুক্ত। সুতরাং ভয় না পেয়ে জোর দিয়েই সত্যি কথাটা বলেছি আমি। আপনি আবারও কিছু করতে এলে আমি দৌড়ে পালিয়ে যাবো। কারণ আমি এখন মুক্ত। দৌড়ে পালানোর মতো সুযোগ আমার কাছে আছে।

- পালাতে হবে না। আমি আর কিছুই করব না। তবে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আমি আপনাকে জড়িয়ে ধরেছি বলে সব দোষ আমার। আপনার এতে কোনো দোষ নেই, তাই তো?

- হ্যাঁ তাই। সব দোষ আপনার। কারণ আপনিই জোর করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমি নই।

- তাহলে আমার সময়ে এটা উল্টো কেন হবে? ওই মেয়েটাকে তো আমি জড়িয়ে ধরিনি, বরং ও আমাকে জোর করে জড়িয়ে ধরেছিল। একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমার উপর। তাহলে দোষটা ওই মেয়ের না হয়ে আমার কেন হলো?

সারা অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ সেটাই তো। কিন্তু আপনি যে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরেননি তার কী প্রমাণ আছে। এক্ষেত্রে দোষ তো আপনাদের দু’জনেরই। কারণ আমি দেখেছি আপনি মেয়েটাকে ছাড়ানোর কোনো চেষ্টাই করেননি।’

- আপনি দেখার একটু আগেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। বিষয়টি ভালো করে বুঝার আগেই আপনি এসে গেছিলেন। এরপর আপনি চলে যাওয়ার পর ওকে ছাড়িয়ে দিয়েছি আমি। তেমন জোরাজোরি করতে পারিনি কারণ চারিদিকে অনেকেই ছিল। একটা মেয়ের সাথে ফাঁকা রুমে ওই অবস্থাতে দেখলে সবাই আমাকেই ব্লেইম করতো। যা আমার জন্য সম্মানজনক হতো না নিশ্চয়ই।

- কিন্তু মেয়েটা কে ছিল? আর ওভাবে আপনাকে জড়িয়ে ধরেছিল কেন?

সায়েম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রাফার পরিচয় সহ সবকিছু বলতে লাগল। সবটা শোনার পর সারা মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘ওরে আল্লাহ!  এই মেয়ে তো পুরাই পাগল। ও তো অসুস্থ।’

- আমিও সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম আপনাকে। কিন্তু আপনি তো আমাকে ভুল বুঝছিলেন।

- আই এম সরি মি. সায়েম। আমি আসলে ভাবতেই পারিনি এইরকম কিছু হতে পারে। আসলে তখন আপনাকে ওভাবে দেখে আমি ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না। শত হলেও আপনি আমার প্রিয় একজন। হয়তো খুবই প্রিয়।

সায়েম মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘তাহলে স্বীকার করছেন। রাফার কিন্তু একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। কারণ ওর কর্ম-কাণ্ডের জন্যই আপনার মুখ থেকে সত্যি কথাটা বের হলো।"

সারা কিছু না বলে চলে এলো সেখান থেকে। সায়েমও চলে এলো।’


ডিম লাইটের আবছায়া আলোয়  সায়েমের মুখটা দেখতে পাচ্ছে রাফা। একই বিছানার দুই প্রান্তে বসে আছে দু’জন। ঘরে আর কেউ নেই। দরজাটা বাইরে থেকে আটকানো।

(চলবে...)

আরো পড়ুন ৮ম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড