• বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (৬ষ্ঠ পর্ব)

  রিফাত হোসেন

২০ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:২২
গল্প
ছবি : প্রতীকী

লাঞ্চ শেষে নিজের ডেস্কে বসল সায়েম। তখনই ফোন বেজে উঠল। বিরক্তির সাথে ‘উফ’ শব্দটা করল সায়েম। বসের সাথে বেশ কিছুক্ষণ বকবকানির পরই শান্তিতে একটু খেতে বসেছিল। কিন্তু শান্তিকে অশান্তিতে রূপান্তর করার জন্য মোবাইল-ই যথেষ্ট ছিল। বারবার করে কেউ একজন ফোন দিয়েই যাচ্ছিল। 

- আরে বাবা, যখন দেখছিস ফোন রিসিভ করছে না, তাহলে নিশ্চয়ই ওপাশের মানুষটা ব্যস্ত আছে কোনো কারণে। সেজন্য ফোনটা রিসিভ করছে না। তবুও এতবার করে ফোন দেওয়ার কোনো মানে হয়।

বিড়বিড় করে কথাগুলো বলল সায়েম। রুমালে হাতটা ভালো করে মুছে পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কাশের ভাই এই সময় ফোন দিচ্ছে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে কী?’

অল্প কিছু মুহূর্ত চুপ থেকেই সায়েম ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল। ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনের ওপাশ থেকে কাশেম বলে উঠল, ‘আমি আপনার অফিস গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি ভাইজান। এভাবে কথা বলে ফোনের টাকা ফুরানোর সাহস বা সাধ্য আমার নেই। তাই তাড়াতাড়ি নিচে নামেন।’

সায়েম এবারও কিছু বলতে পারল না। হুট করে ফোন কেটে দিলো কাশেম। সায়েম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘লোকটা বড়ই অদ্ভুত। কখনো রসিকতা করে, কখনো-বা কড়া গলায় কথা বলে। কখনো আবার দুঃখে, বিরহে উদাসীন হয়ে চুপচাপ বসে থাকে।’

চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়াল সায়েম। আশেপাশে একবার তাকিয়ে দেখে নিলো। এরপরে নিজের ডেস্ক ছেড়ে ওঠে নিচে নামতে লাগল। নিচে এসে দেখে কাশেম দাঁড়িয়ে আছে গেইটের বাইরে। গলায় একটা গামছা ঝোলানো। সায়েম ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হ্যাঁ কাশেম ভাই বল, বাবা কেমন আছে এখন?’

কাশেম নিজের দাঁতগুলো বের করে ফিক করে হেসে দিলো। সায়েম বলল, ‘উফ্, পরে হেসো তুমি। এখন বল বাবা কেমন আছে? তোমাকে তো বলেছিলাম বাবার শরীরের অবস্থা কখন কেমন থাকে, সব আমাকে জানাতে। আর বাবার রিপোর্টগুলো এনেছ? তোমাকে তো বলেছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার রিপোর্টগুলো আনতে। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলব।’

- রিপোর্ট আইজ আনতে পারি নাই ভাইজান।

- কেন?

কাশেম লাজুকলতার স্বরে বলল, ‘আগে চাকরিটা পার্মানেন্ট করে দেন, তারপর সব আইনা দিমু।’

সায়েম অবাক হয়ে বলল, ‘চাকরি পার্মানেন্ট মানে? কীসের চাকরির কথা বলছ তুমি?’

- এই যে আপনি প্রতিদিন গোপনে গোপনে কাকার খোঁজ-খবর নেন। আমিই তো আপনারে সব খবরা-খবর আইনা দেই। আর আপনি প্রতি দিন কিছু কিছু টাকা দেন। এইটা হইবো না ভাইজান। আমার এই চাকরিটা আপনি পার্মানেন্ট করে দেন। তারপর মাস শেষে আমাকে বেতন দিবেন। এবং কথা দিতে হইবো যে, ঈদের বোনাস-ও দিবেন।

- ওরে হারামি। তুমি তো খুব সেয়ানা জিনিস। আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার চাকরি পার্মানেন্ট করে দিলাম। তা বেতন কত দিতে হবে?

- আপনি যা দিবেন তাই নিমু। কারণ আপনি আমার পরিচিত।

- ঠিক আছে। এবার বল, বাবার শরীরের কী কোনো উন্নতি হচ্ছে, নাকি অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে?

- সকালেই কাকার সাথে কথা বললাম। এমনিতেই বিছানা থেকে নামে না। আবার একটু কিছু হইলেই রাগারাগি শুরু করে দেয়। গলার জোর তখন এমনিতেই বাইড়া যায়।

- এটা তো উনার পুরোনো অভ্যাস। এটা পরিবর্তন হবে না আর। যাই হোক, তুমি কোনোভাবে রিপোর্টগুলো আনার চেষ্টা কইরো। আমি জানি বাবা নিজে থেকে ডাক্তারের কাছে যাবে না। তাই ডাক্তারকেই বাড়িতে পাঠাতে হবে। কিন্তু এর আগে জানতে হবে মেইন সমস্যাটা কোথায়। অবস্থা বেশি খারাপ হলে প্রয়োজনে তাকে অজ্ঞান করে হাসপাতালে নিয়ে যাবো।

- আচ্ছা ভাইজান। কিন্তু মনে রাইখেন, আমার চাকরি কিন্তু পার্মানেন্ট হয়ে গেছে।

সায়েম হেসে দিয়ে বলল, ‘হুম, মনে রাখব।’

সায়েম আবারও অফিসের ভিতরে চলে এলো। কাশেম মনে মনে বলল, ‘একটা মানুষ, অথচ চাকরি তিনটা। তাও আবার দু’টো পার্মানেন্ট। উফ্, আমার মতো বুদ্ধিমান ব্যক্তি আর কে আছে, যে একসাথে তিনটা চাকরি করে? এই বাপ-ছেলের মান-অভিমান থেকে অন্য কারোর লাভ না হলেও আমার বেশ লাভ হচ্ছে। দু'জনেই একে অপরের খোঁজ নেয় গোপনে। আর আমার মাধ্যমেই। আর দু'জনের দেওয়া চাকরির বেতনই আমি পাই। কিন্তু এইবার কাকার রিপোর্টটা নিতেই হবে আমাকে। ভাইজানের হাতে তাড়াতাড়ি রিপোর্ট দেওয়া লাগবো। নাইলে কাকার বড় কোনো অসুখ হয়ে যাবে।’

বিকেল ৪:৩০ বাজে। সায়েমের অফিস টাইম শেষ। এদিকে সারা’র-ও একই। সায়েম কম্পিউটার অফ করার সময় সারার দিকে তাকালো একবার।
- আশ্চর্য! কোথায় গেল সারা? এক্ষুনি তো দেখলাম বসে আছে। এর মধ্যেই বেরিয়ে গেল!" সারার ডেস্কের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল সায়েম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাড়াতাড়ি করে সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এলো অফিস থেকে। বাস স্ট্যাণ্ডে এসে দেখল সারা দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চয়ই বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। সায়েম মৃদু হাসি দিয়ে সারার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সারা একবার সায়েমের দিকে তাকিয়ে আবারও মুখ ফিরিয়ে বাসের অপেক্ষায় রইল। এমন একটা ভাব ধরল, যেন সায়েমকে চিনেই না ও। অথবা দেখেও না দেখার মতো অবস্থা। বেশ অবাক হলো সায়েম। কেন না, অন্যান্য সময়ে সায়েমকে দেখলেই সারা কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতো। কিন্তু এখন পুরো স্বাভাবিক ভাবেই আছে। প্রতিক্রিয়া তো দূর থাক, সায়েমের দিকে দ্বিতীয় বারের জন্য তাকাচ্ছে-ও না।

সায়েম সারার কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘যতই দূরত্ব রেখে চলবেন, আপনাকে আমি ততই কাছে টেনে নিবো।’

সায়েম আবারও মুচকি হাসি দিয়ে রাস্তার দিকে তাকালো। অদ্ভুতভাবে এবারও সারার কোনো রিয়েকশন দেখতে পেলো না সায়েম। সায়েম-ও কিছু না বলে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর একটা বাস এলে ওরা ওঠে পড়ল। সাধারণত বিকেলের সময়টা থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত রাজধানীতে বিশাল জ্যাম লেগে থাকে। জনসংখ্যা এইসময় একটু বেশিই থাকে৷ কারণ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এই সময়ে অফিস থেকে বের হয়ে নিজ বসতবাড়ির গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বাসে ওঠে। ফলে বাসের সিট ফাঁকা পাওয়াটা-ও মুশকিল হয়ে যায়। তাই প্রতিদিনের মতো আজকেও বাসে ওঠে একপাশে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল সারা আর সায়েম। আজ-ও আকাশের অবস্থা ভালো না। ইদানিং ঘন ঘন মেঘ বর্ষণ হচ্ছে। প্রতিদিনই মেঘেরা উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করছে এদিক-ওদিক। সারাদিন মেঘেরা রাজত্ব করে, আর শেষ বেলাতে বৃষ্টি নেমে যায়। বিশাল এক ঝামেলা। হুটহাট করে বৃষ্টি নেমে পড়ায় না যায় বৃষ্টিতে ভেজা, আর না যায় সহজে এর থেকে রক্ষা পাওয়া। ফলে গুড়িগুড়ি বৃষ্টির পানির জন্য অসুখ-বিসুখ এর মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে চারিদিকে।

সারার ভিষণ শীত লাগছে এখন। আড়চোখে একবার সায়েমের দিকে তাকালো ও। সায়েম তখন জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। বিকেলের এই মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকারে বাইরের সবকিছুই আকর্ষণীয় লাগছে। এক নজরে শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করছে। ক্ষুদার্ত পেটের কেউ যেমন ভাবে খাবারের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তেমনি কিছু মানুষজন-ও মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকারের দৃশ্য দেখলেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিশেষ করে শহুরে পরিবেশের মানুষজন। কারণ এরা সাধারণত এইরকম মুহূর্ত ইচ্ছে হলেই পেয়ে যায় না। ফলে যখন পায়, তখন এর রেশ সহজে কাটাতে চায় না। 

হঠাৎ বাতাসের তীব্রতা বেড়ে গেল। বাতাসের শীতল স্পর্শ পেয়েই শিউরে উঠল সারা। খপ করে সায়েমের একটা হাত খামচে ধরল। চমকে গিয়ে অবাক আর একরাশ বিস্ময় নিয়ে সারার দিকে তাকালো সায়েম। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারল এইরকম হওয়ার কারণটা। সায়েম লক্ষ্য করল সারা রীতিমতো কাঁপছে ঠাণ্ডায়। বাইরে বাতাসের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে৷ কেউ কেউ জানালা বন্ধ করে রাখলেও কয়েকটা জানালা খোলাই আছে। বাসে এত মানুষ থাকা স্বত্ত্বেও ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে শরীরে। সারার কাঁপুনি দেখে সায়েম ওকে কিছুটা কাছে টেনে নিলো। উষ্ণ আর আর্দ্র স্পর্শ পেয়ে সারা সায়েমের বুকের সাথে মিশে গেল নিঃসংকোচে। হাত দিয়ে সারাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়েছে সায়েম। ততক্ষণে বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করছে দু'জনের মনে। সায়েমের বুকের উষ্ণতা আর প্রকৃতির শীতল স্পর্শ সারাকে মুগ্ধ করে তুলেছে। যতটা সম্ভব সায়েমের বুকের সাথে মিশে আছে ও। আশেপাশের মানুষজন কী ভাবছে, সেটা দেখার সময় ওর নেই। ওর শুধু একটু উষ্ণতা চাই। সায়েমের বুকে মাথা রেখেই পরম আবেশে সায়েমের হৃদস্পন্দনের তীব্র ডিপডিপ শব্দ অনুভব করছিল সারা। সায়েম ভিষণ ভাবে চাচ্ছে মুহূর্তটা যেন স্থির থাকে। ঘড়ির কাটা হাত দিয়ে আটকে ধরে রাখতে ইচ্ছে করছে ওর। কিন্তু সময় পেরিয়ে যাচ্ছে নিজ গতিতে। কন্ডাক্টর এর ডাকে সায়েম নড়েচড়ে দাঁড়াল। সারা কিছুটা বিব্রত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বাস ভাড়া দিলো। এরপর গেইটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ সায়েম-ও তাই করল। স্ট্যাণ্ডে বাস থেমে যাওয়ার পর সারা আর সায়েম নেমে গেল। বৃষ্টি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। তীব্র বাতাসের সাথে সাথে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। সায়েম বলল, ‘এভাবে ভিজে ভিজে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই সারা। যাত্রী ছাউনিতে একটু অপেক্ষা করি। বৃষ্টি কমে গেলে নাহয় বাড়িতে ফিরবো দু’জনে।’

সারা কোনো উত্তর না দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। সায়েম কোনোভাবেই বুঝতে পারছে না সারা হঠাৎ এইরকম ব্যবহার কেন করছে ওর সাথে। আর এভাবে বৃষ্টিতে ভিজেই বাড়িতে যাওয়ার কী আছে? এতে আরো শরীর খারাপ হবে৷ সায়েম কয়েকবার পিছন থেকে ডাকল সারাকে। কিন্তু সারা কিছু বলল না৷ অতঃপর কোনো উপায় না পেয়ে সায়েম দৌড়ে গিয়ে সারার কাছাকাছি গেল। এরপর ওর সাথেই হাঁটতে লাগল। বাড়িতে যেতে যেতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে দু’জনে। সায়েম চার তলায় থাকে। তার উপরের তলায় থাকে সারা। সায়েমের ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ সারার হাত ধরে ফেলল সায়েম। সারা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো সায়েমের দিকে। সায়েম বলল, ‘কী সমস্যা আপনার? সেই কখন থেকে দেখছি একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। এর কারণ কী?’

সারা নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘হাতটা ছাড়ুন প্লিজ। কেউ দেখে ফেলবে।’

সায়েম কড়া গলায় বলল, ‘আগে বলুন আপনার সমস্যাটা কী?’

- আমি আপনার থেকে দূরত্ব রেখে চলছি সায়েম। এর কারণ আমি আপনার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ছি আস্তে আস্তে। যা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। আজ সারাদিন অফিসে এইসব ভেবেছি। যে আমি আপনার সাথে কখনো শান্ত গলায় কথা বলিনি, সেই আমিই আজ আপনার সাথে অফিসে গেলাম। আপনার হাত ধরলাম, আপনার সাথে হেসে হেসে কথা বললাম। আজকের সব ঘনটাগুলো সাজালেই বুঝা যায় যে, আমি আপনার প্রতি দূর্বল হতে পড়ছি।

- এতে সমস্যাটা কোথায় সারা? আমি তো আপনাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করি। যা আমি আগেও বেশ কয়েকবার বলেছি আপনাকে। কিন্তু প্রতিবারই আপনি এড়িয়ে গেছেন আমার কথা। এখন যখন আপনি আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছেন, তাহলে আবার বাধা দিচ্ছেন কেন? আপনি কী চান না আমরা একে অপরের জীবন সঙ্গী হই। সারাজীবনের জন্য এক হই।

- না চাই না আমি। আমি কখনোই আপনাকে সারাজীবনের জন্য চাই না। এখন যেভাবে আমরা পরিচিত কিংবা অফিস কলিগ হিসেবে আছি, এর পরেও সেভাবেই থাকতে চাই।

- কিন্তু কেন? আমি তো আপনাকে ভালোবেসেছি। আপনাকে বিয়ে করে নিজের জীবনের একটা অংশ করতে চেয়েছি। এমন তো নয় যে, আমি আপনার যোগ্য না। বা এটাও নয় যে, আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন। তাহলে এত সমস্যা কোথায়? এর উত্তর আমি অনেকবার জানতে চেয়েছি৷ কিন্তু আপনি বলেননি আমাকে।

- এজন্যই বলিনি যে, সমস্যার কারণটা শুনতে আপনার ভালো লাগবে না। আপনি হয়তো মনে মনে কষ্ট পাবেন।

- আমার শুনতে ভালো লাগবে না বলে একটা সত্যি কথা মিথ্যে হয়ে যাবে না সারা। আর আপনাকে পাওয়ার জন্য কষ্টের সত্যিটা শুনতেও আমি রাজি আছি। আমি আপনাকে সাথে নিয়ে অনেক কিছু ভেবে রেখেছি সারা। সাধারণ কিছু নয়, অসাধারণ কিছু।

 - এই সাধারণ একটা জীবনে অসাধারণ কিছু প্রত্যাশা করেন কীভাবে আপনি?

সায়েম মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘যেখানে আমার স্রষ্টা নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ অসাধারণ, সেখানে তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে সর্বনিম্ন অসাধারণটুকু প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অপরাধের কিছু নয়।’

- মধ্যবিত্ত বলে একটা শব্দ আছে, সেটা নিশ্চয়ই জানেন। কিন্তু এর অর্থটা কী আপনি জানেন? অবশ্য আপনার জানার কথা-ও না। কারণ আপনি মধ্যবিত্ত জিনিসটার মধ্যে দিয়ে বড় হননি। কিন্তু আমি হয়েছি। আপনি তো জানেন বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি। আমার বাবা-মা দু'জনেই বয়স্ক এখন। তাদের দেখাশোনা সহ সংসারের যাবতীয় খরচ আমাকে সামলাতে হয়। এবং সারাজীবন সামলাতে হবে। আপনি আমার সাথে সারাজীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন আমার বাবা-মায়ের কী হবে? আমি আপনার কাছে চলে গেলে তাদের কে দেখবে? তারা হয়তো নিজেদের খেয়াল রাখতে পারবে। কিন্তু তারা তো আর নিজেদের প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে পারবে না। রোজগার করার মতো শক্তি বাবার শরীরে নেই সায়েম। আর আমার মা বাইরে গিয়ে রোজগার করবে, মেয়ে হিসেবে এটা আমি কীভাবে মেনে নিবো বলতে পারেন?

- আপনি এখন যেভাবে নিজ রোজগারে নিজের বাবা-মায়ের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন, পরে-ও তাই করবেন। আমি কখনোই আপনাকে বাধা দিবো না।

- আপনি নিশ্চয়ই সারাজীবন এখানে থাকবেন না। একদিন না একদিন তো নিজের বাড়িতে ফিরে যাবেন।

- হ্যাঁ, যাবো। ইতি প্রতিষ্ঠিত হলেই আমরা বাড়িতে ফিরে যাবো। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম শুধুমাত্র ইতির জন্য। ওখানে থাকলে ইতি পড়াশোনা করে কখনোই এতদূর পর্যন্ত যেতে পারতো না। বাবা এইসব কখনোই মেনে নিতো না।

সারা হেসে দিয়ে বলল, ‘যেখানে আপনার বাবা নিজের মেয়েকে বাইরের জগৎ চিনবার অনুমতি দেয়নি, সেখানে ছেলের বউকে কীভাবে বাইরের জগৎ চিনবার অনুমতি দিবে বলতে পারেন?’

- মানে?

- মানেটা খুব সহস সায়েম। আপনার বাবা ইতিকে খুব বেশি পড়াশোনা করতে দিতে চায়নি। চাকরিবাকরি তো দূরে থাক, পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল৷ একবার ভেবে দেখুন সায়েম, আপনি আমাকে বিয়ে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবেন। এরপর আমার অবস্থাটা-ও হবে আপনার বোনের মতো। তিনি ছেলের বউকে কখনোই চাকরি করার অনুমতি দিবে না। আমাকে বাধ্য করবে আপনাদের পুরো পরিবার সামলিয়েই বাকি জীবন পাড় করার জন্য। সংসারের দায়িত্বগুলো পালন করা ছাড়া আমাকে আর কিছুই করতে দিবেন না তিনি। অথচ মেয়ে হিসেবে নিজের বাবা-মায়ের দেখাশোনা করাটাও আমার দায়িত্ব। সেটা পালন না করে কীভাবে বাঁচবো আমি? উনারা যে আমার নিজের বাবা-মা।

- আপনি আমার বাবাকে ঠিক যতটা খারাপ ভাবছেন, আমার বাবা ততটা খারাপ নয়। আমার বাবা যদিও একটু রাগী, নিজের মতামতটাকেই গুরুত্ব বেশি দেন তিনি। কিন্তু এতটাও খারাপ নয় তিনি।

- আমি জানি এইসব শুনতে আপনার ভালো লাগবে না৷ সেজন্যই বলতে চাইনি৷ আর আমি আপনার বাবাকে খারাপ মানুষ বলছি না। আমাদের এই বয়সের সময়টা তিনি আরো আগে পাড় করেছেন। ফলে আমাদের এখনকার চিন্তাধারার সাথে তার চিন্তাধারা মিলবে না। তিনি হয়তো মেয়েদেরকে গুরুত্ব খুব কম দেন। কিন্তু এই গুরুত্ব না দেওয়ার জন্যই আমার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। চাকরি না করলে বাবা-মায়ের দায়িত্ব সামলাতে পারব না আমি। আর আপনার বাবা-ও আমাকে চাকরি করতে দিবে না। যা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। তাই আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। একেবারেই অসম্ভব এটা।

সায়েম রাগে কটমট করছে। ওর ইচ্ছে করছে টেপ দিয়ে সারার মুখটা আটকিয়ে দিতে। যাতে আর কোনো কথা বলতে না পারে। সায়েম এতদিন ভাবতো, শুধুমাত্র ও নিজেই এরমাত্র ব্যক্তি, যে আগাম উল্টো পাল্টা অনেক কিছু ভেবে রাখে। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছে সারা-ও একই লেভেলের মানুষ। এখনো বিয়েই হলো না, অথচ ও বিয়ের পরে কী হবে, সেটা নিয়ে ভাবছে। সায়েম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সারার আরেকটা হাত ধরে ওকে দরজার সাথে চেপে ধরল। সারার মুখের কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে গেল। একেই দু'জনের ভেজা শরীর। তার উপর দু'জন যুবক-যুবতী একে অপরের এতটা কাছাকাছি। যেকোনো সময় উল্টো পাল্টা কিছু হয়ে যেতে পারে ভেবতেই ভয়ে ঘাবড়ে গেল সারা। সায়েম ওর হাত দু'টো এমনভাবে ধরে রেখেছে যে, নড়তেও পারছে না ও। মাথায় উপর ৬০ ওয়াটের একটা ছোট্ট বাল্ব জ্বলছে। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। বজ্রপাতের ঘুমঘুম শব্দ হচ্ছে। শীতল বাতাস সারার শরীরে এসে আঘাত করছে বারবার। চোখ দু'টো বন্ধ করে ফেলল সারা। ওর হাত-পা কাঁপছে। সায়েমের গরম নিঃশ্বাস ওর মুখে এসে পড়ছে। ভেজা চুল থেকে বৃষ্টির পানি ওর ঠোঁট বেয়ে পড়ছে। বৃষ্টির ঠাণ্ডা পানি আর সায়েমের গরম নিঃশ্বাসে ওর ঠোঁট কেঁপে উঠছে বারবার। এই মুহূর্তে সারার কল্পনায় বিরাজ করছে সায়েম। ও অপেক্ষা করছে সায়েমের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শের। সারা নিজের মনে মনে বলল, ‘এক্ষুনি হয়তো লোকটা চুমু খাবে। কিংবা আমার ঠোঁট জোড়া কামড়ে ধরবে। লোকটা খুব অসভ্য তাই না? এভাবে আমাকে লজ্জায় ফেলে দিবে! আচ্ছা, উনি যখন আমার ঠোঁটে চুমু খাবে, তখন কী করব আমি? চুপ করে থাকবো, নাকি জোর করে সরিয়ে দিবো। একটা থাপ্পড় মারতে পারলে মন্দ হবে না নিশ্চয়ই।’

সায়েমের ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর শুনে বাস্তবে ফিরল সারা। সায়েম ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘এত নেগেটিভ কিছু মাথায় আনলে তো চলবে না।’

সারা চমকে গিয়ে কাঁপা-কাঁপা স্বরে বলল, ‘না মানে, আমি এমনিই ভাবছিলাম আরকি। ওইরকম কিছুর উদ্দেশ্য কিন্তু আমার নেই। আর আমি জানি আপনিও ওইরকম কিছু করবেন না।’

- শুধু আমি না। আমার বাবা-ও ওইরকম কিছু করবে না।

সায়েমের কথা শুনে সারার মুখটা ‘হা’ হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যেই। সায়েম আবার বলল, ‘বাবা নিশ্চয়ই আপনার বাবা-মায়ের কথাটা ভাববেন। আপনার চাকরি নিয়ে দ্বিমত করবে না। আর এর পর-ও যদি আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজি না হন, তাহলে আমি জোর করব।’

সারা ঢোক গিলে বলল, ‘জোর করবেন?’

- হ্যাঁ, জোর করব। প্রয়োজনে আপনার বাবা-মাকে কিডন্যাপ করে আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করব। যাতে আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন আপনি। আপনি আমাকে এখনো ভালো করে চিনতে পারেননি সারা। আমি কী কী করতে পারি, সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই। তাই বলছি, এভাবে এড়িয়ে যেয়ে আমার থেকে পাড় পাবেন না আপনি।

সারার হাতটা ছেড়ে দিলো সায়েম। সারা আর এক মুহূর্ত-ও দাঁড়াল না এখানে৷ দৌড়ে চলে গেল। দরজার লক খোলার জন্য ব্যাগ থেকে চাবি বের করল সায়েম। হঠাৎ সিড়ির দিকে তাকাতেই ভীমড়ি খেয়ে গেল। সিড়িতে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িওয়ালা। সায়েমকে তাকাতে দেখেই লোকটা নিজের টাক মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ওরে ভাতিজা, তলে তলে এতদূর চলে গেছ।’

সায়েমের ইচ্ছে করছে লোকটার চুলহীন টাক মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। একেই শরীরে ১৬০ ডিগ্রি রাগ ছিল, এই লোকটার কথা শুনে সেটা বেড়ে গিয়ে ৩২০ ডিগ্রিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। 
 
(চলবে...)

আরো পড়ুন ৫ম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড