• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : ক্যাম্পাসে প্রেম

  জান্নাত লাবণ্য

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২৯
গল্প
ছবি : প্রতীকী

২০০১ সালে রুবি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তখন ওর বন্ধু বান্ধবের অভাব হল না। কেননা ও খুব মিষ্টি আর মিশুক স্বভাবের মেয়ে। সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে প্রেমের প্রস্তাবও পেল অনেক। অনেকেই বিকেল বেলা হলের গেটে হাজির হতো। আলাপ জমানোর চেষ্টা করতো। প্রেম পত্র থেকে শুরু করে প্রেমের উপন্যাস ও অন্যান্য উপহার দিল কয়েক জন। রুবি সব কিছুই ফেরত দিয়ে দিল।

এসবের প্রতি ওর একদমই আগ্রহ ছিল না। তাছাড়া ওর পরিবার খুবই রক্ষণশীল। এসব কখনোই মেনে নিবে না। তাই বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডা, ঘোরাঘুরি এগুলোয় ভালো লাগতো ওর।

তবে দিন যত যেতে লাগলো প্রথম ইয়ারের বন্ধুরা আস্তে আস্তে যার যার নিজের মতো করে ব্যস্ত হওয়া শুরু করলো। কেউ টিউশনি, কেউ বিসিএসের পড়া, কেউ কোন সংগঠনের কাজে, কেউ বা প্রেম করতে, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী শিক্ষক হতে বর্তমান শিক্ষকদের সাথে উঠ বস বাড়িয়ে দিল। অনেকে পার্টটাইম কাজও শুরু করলো।

সকলেই যেন প্রথম ইয়ারের হাসি খুশি চিন্তাহীন সময় টাকে বছর খানেকের ভিতরেই উগরে দিয়ে বড্ড বেশি বাস্তবতার পথে চলতে শুরু করলো। এদিকে রুবি কিছুদিন চেষ্টা চালালো একটা থিয়েটারে যুক্ত হতে। কিন্তু খুব বেশি নিয়মতান্ত্রিক সময় পার করা ওর ভালো লাগলো না। এরপর ক্লাসের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করলোও। সময় পেলেই লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে থাকতো। কিন্তু দিনকে দিন বড্ড বেশি একা হয়ে পড়ছিলও। বিকালবেলা বেশির ভাগ শিক্ষার্থী হল থেকে বিবিধ কারণে বের হতো। রুবিও বের হতো তবে সঙ্গী সাথি কেউ ছিল না তেমন। ও নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল ক্রমান্বয়ে।

এরই মাঝে লাইব্রেরিতে মানস নামের একটি ছেলের সাথে পরিচিত হল রুবি। অন্য বিভাগের ছাত্র হলেও, মানস ছিল রুবির ব্যাচমেট। একই টেবিলে ওরা পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করতো। অনেক বিষয়ে আলাপও হতো। একসময় লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে একসাথে বিকালের নাস্তা করতে চলে যেত খাবার দোকানে। ধীরে ধীরে ওদের বেশ ভালো বন্ধুত্ব তৈরি হল। যদিও মানস হিন্দু তবুও নিঃসঙ্গতা কাটাতে ওকে বন্ধু হিসাবে পেয়ে রুবি বেশ আনন্দিত হল। তাছাড়া ভিন্ন ধর্মের বলে ওদের মাঝে কোন ধরনের প্রেম ভালোবাসার উৎপত্তি ঘটবে না মনে করে রুবি খুব স্বস্তি বোধ করছিল।

প্রায় দিন মানস এসে হাজির হতে লাগলো রুবির হল গেটে। রুবিকে সাহায্য করার জন্য শপিং করতেও তারা একসাথে যাতায়াত শুরু করলো। কবে যে ওরা একে অপরকে তুই থেকে তুমি বলে সম্বোধন করা শুরু করলো তাও বুঝি ওদের সচেতন মনের গোচরে এলো না।

পরিস্থিতি এমন হল যে প্রতিদিন রুবি যেন আনমনে অপেক্ষা করতো মানসের। হলের খালা কখন ডাক দিবে চিৎকার করে, রুবি খালা ৪৫০ গেস্ট। খালার এই ডাকটা শোনার জন্য রুবি কান পেতে থাকতো। হলের ফোনেও কল দেওয়া শুরু করলো মানস। মশার কামড় খেয়েও রাত দুইটা তিনটা পর্যন্ত কথা বলতো ওরা। তখন মোবাইল ফোনের এতো চল হয়নি। হলের ফোনই ভরসা। ফোনে যে খুব গভীর গোপন কোন কথা হতো, তা কিন্তু নয়। এই কী করছ? ভাত খেয়েছ? কোথায় খেলে? কী খেলে? রান্না কেমন হয় তোমাদের হলে? গরম পড়ছে না খুব! এমন এলোমেলো কতো সাধারণ কথা। তবুও ফোনের লাইনে দাড়িয়ে থাকা অন্য মেয়েদের তাগাদা না থাকলে সারারাত চলতো হয়তো ওদের কথা। এভাবেই পার হয়ে গেল একটি বছর। ওরা দুজনেই দুজনের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেতে লাগলো।
হঠাৎ রুবির এক বান্ধবী একদিন ওকে সরাসরি প্রশ্ন করে ফেললো, কীরে মানসের সাথে তোর চলছে কেমন?
রুবি প্রশ্নটা শুনে চমকে গেল। উত্তরে ও বললো, কথাটার মানে কী?
- মানে আবার কী? তোরা যে প্রেম করছিস এটা তো আর কারো কাছে অজানা না।

রুবি কোন উত্তর দিল না। সেখান থেকে চলে গেল। কিন্তু কথাটা ওর মন থেকে গেল না। সত্যিই তো মানসের সাথে আসলে ওর কী সম্পর্ক? এটা কী শুধুই বন্ধুত্ব। না তা নয়। এটা ঠিক ওরা কেউ কাউকে প্রপোজ করেনি। কিন্তু ওরা যে একে অপরের সাথে মানসিক ভাবে মিশে গেছে। মানস হিন্দু আর রুবি মুসলিম। কী হবে এই সম্পর্কের সমাপ্তি! মাথাটা সেদিন ফাঁকা হয়ে গেল রুবির। সেদিন বিকালে খালা যথা সময়ে রুবির নাম ধরে ডাকলো। রুবি কোন উত্তর দিল না। বিছানায় মুখ গুজে খালার ডাক শুনলো।

রুমমেট মিলি একটু পরে ঘরে এসে বললো, ‘আপু ভাইয়া অনেকক্ষণ ধরে গেটে দাড়িয়ে আছে। আমি ঢুকছি দেখে আপনাকে খবর দিতে বললো।’
রুবি বললো, ‘তুমি যদি বের হও তবে ওকে বলে দিও, আমি অসুস্থ বের হব না আজ।’

পরদিন ডিপার্টমেন্টেও গেল না রুবি। দুপুরের দিকে ওর ক্লাসমেট মুনিরা আসলো ওর রুমে।

রুবি শুয়ে ছিল। মুনিরা কাছে এসে বললো, ‘কী হয়েছে তোর? মানসের সাথে ঝগড়া করেছিস নাকি?’

রুবি শোয়া থেকে বসে বললো, ‘এসব কথার মানে কী?’

মানস এসেছিল ডিপার্টমেন্টে। তোকে খুঁজলো। পরে আমাকে ডেকে বললো, তুই কাল থেকে ওর সাথে দেখা করছিস না। হল গেটে এসে বিকালে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল ও।হলের ফোনে কল দিছে, তাও তুই ফোন ধরিস নাই। ওকে দেখে মনে হল সারারাত ছেলেটা ঘুমায়নি। এসব রাগ অভিমান বাদদে। আজ বিকালে ও আসবে। তোকে বের হতে বলেছে।

‘শোন ও আমার এমন কিছু লাগে না যে ওকে এতো অস্থির হতে হবে।’ খুবই ককর্শ কণ্ঠে উত্তর দিল রুবি।

‘তাই কিছু হয় না তোর? তো এতদিন কী করলি?’ বিরক্ত হয়ে বললো মুনিরা।

তারপর চলে যাওয়ার আগে মুনিরা রুবিকে বললো, ‘কিছু হয় কি হয় না সেটা সামনাসামনি বসে ঠিক কর। লুকিয়ে থেকে নয়।’

সেদিন বিকালে যথাসময়ে হলের খালা কল দিতে লাগলো রুবিকে। কিন্তু রুবি একটা বই মুখের উপর খুলে শুয়ে থাকলো।

প্রায় ঘণ্টা খানিক বাদে মিলি এসে বললো, ‘ভাইয়া আজও দাড়িয়ে আছে আপু। বলছে আপনাকে বের হতে, না হলে ভাইয়া সারারাত এখানেই দাঁড়িয়ে  থাকবে।’

রুবি বুঝতে পারলো মানস আজ দেখা না করে যাবে না। তাই ও গুছিয়ে নিয়ে হল গেটে গেল। গেটের পাশের সুপারি গাছটার নিচে মানস এখনও দাঁড়িয়ে আছে। মিলিকে আসতে দেখে ও এগিয়ে এলো।
মানসই কথা শুরু করলো, ‘কী ব্যাপার! কী হয়েছে তোমার? চল মেডিকেলে যাই।’
- না লাগবে না। এখন শরীর ভালো।
- তাহলে চল বাইরে নাস্তা করি।
- না। আমার ইচ্ছা করছে না।
- তোমার কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে আমাকে বল।
- কিছু হয়নি।
- তবে এমন করছো কেন?
- এমনি।
- তুমি আমাকে বলবে না? ওকে আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো।
- কেন এসব পাগলামি করছো। শোন বন্ধু হও বন্ধুর মতো থাকো।

কথাটা মানসের মনে খট করে লাগলো। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, ‘আমি কী আসলেই শুধুই তোমার বন্ধু! এর বেশি কিছু না? আমার চোখে চোখ রেখে বলতো।’

রুবি হতবিহ্বল হয়ে গেল। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রিকশায় উঠে পড়লোও। মানসও উঠে বসলো রিকশায়।

তারপর ওরা গিয়ে বসলো খুব নিরিবিলি একটা জায়গায়। যেখানে এর আগে ওরা কখনো বসেনি। যেখানে শুধু জুটিরায় বসে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড