• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

ছোট গল্প : নুরজাহান

  মাকসুদ জামিল

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:০৬
গল্প
ছবি : প্রতীকী

কবি গোধূলি বেলায় ধলাই নদীর তীর ঘেঁসে হেঁটে হেঁটে নদীর কোল থেকে ভেসে আসা মিহি শীতল হাওয়া গায়ে মাখেন এবং নদীর ঢেউ খেলা দেখেন। এটা তার প্রাত্যহিক অভ্যাস। তবে আজ নদীর পানির ঢেউ খেলা নেই। নিস্তব্ধ নদী। নির্বাক বালুচরের মতো নদী আজ অত্যন্ত শান্ত, নিরিবিলি। নদীটি যেন আজ এক আয়নায় রূপ নিয়েছে। আয়নার সামনে যেভাবে মানুষের স্বচ্ছ চেহারাটি স্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে— তেমনি নদীর পানির দিকে মুখ নিচু করে তাকালে নিজের চেহারার ছবি খুব স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। আজকের নদীটি যেন এক নব্য আয়নার প্রতিচ্ছবি।  

কিন্তু নদীটির আজকের এ অবস্থার কারণ কি— কবি হয়তো আজ সে রহস্য উদ্ভাবনের চেষ্টায় গভীরভাবে মগ্ন। কবিদের এ সুগভীর মগ্নতার কাছে পৃথিবীর সব বিষয় তুচ্ছ। যেন পৃথিবীতে তখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে। পৃথিবীতে তখন কবি আর নদী ছাড়া সব কিছু মৃত। কবিদের ভাবনা এমনই গভীর হয়।

কিন্তু কবির এ গভীর ভাবনা এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দেয় নদীর পাড়ের বালিকা। কবির ধ্যানে চরমভাবে আঘাত করে মেয়েটির এক ‘উফ’ শব্দে। সাথে সাথে তাকিয়ে দেখেন এক সুন্দরী মেয়ে কলসিতে পানি ভরতে গিয়ে নদীর ঘাটলার পুরনো শ্যাওলাতে এক পা পিছলে গিয়ে প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তবে বালিকা এ যাত্রায় কোনোরকমে রক্ষা পেয়েছে। অতঃপর গ্রাম্য মেয়েটি নদীর ঘাটলা থেকে পানি ভর্তি করে কাঁকে কলসি নিয়ে কোমর দুলিয়ে বাড়ি ফিরছে।

এমন সময় কবিও হেঁটে হেঁটে প্রায় ঘাটলার কাছে চলে এসেছেন। প্রকৃতি আর সবাইকে বোকা বানালেও কবিদের চোখে ধুলো দিতে পারে না। কবি নদীর গতিবিধি থেকে চোখ ঘুরিয়ে হয়ে এবার বালিকার গতিবিধির প্রতি মনোনিবেশ করলেন। বালিকাকে কবির খুব মনে ধরেছে। টানা টানা হরিণী চোখ বালিকার। চোখে চোখ পড়লে যেন জ্যান্ত মানব তাঁর সৌন্দর্যের কাছে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।

সন্ধ্যা বেলায় ঊর্ধ্বাকাশে তখন চাঁদ ও কয়েকটা তারকা দেখা যাচ্ছে। আজই কেবল চাঁদটা পূর্ণতা পেয়েছে। কবি একবার চাঁদের দিকে তাকায় ত আরেকবার বালিকার দিকে। যেন তিনি চাঁদের সাথে বালিকার অদ্ভুত এক মিল পেয়েছেন।

মেয়েদের সৌন্দর্যের প্রধান আকর্ষণ তাদের তির্যক মায়াবী চোখ। তারা চোখের চাহনি দিয়ে পৃথিবীকে খুব সহজভাবেই কাবু করতে পারে। তাদের চাহনির কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয় পৃথিবীর মৃত্যুঞ্জয়ী শাসক। এ যেন তাদের এক অলৌকিক ক্ষমতা।

বালিকার পরনে নীল রংয়ের প্রিন্টের গ্রাম্য শাড়ী। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা অঞ্চলের নারীদের এ শাড়ীর চাহিদা ব্যাপক লক্ষণীয়। কোনো আনাড়ি হাতে পরিয়ে দেয়া শাড়ীটিতে বালিকাকে পুরাদস্তুর নতুন গ্রাম্য বউয়ের মতো লাগছে। তৈরিকারকরা যেন উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের এই বালিকার জন্যই এ শাড়িটি তৈরি করেছে।

এ বালিকার রূপের বর্ণনা দিতে ব্যর্থ হবে পৃথিবীর সব লেখক, কবি, সাহিত্যিক। এ গ্রাম্য ললনা আজ বর্ণনাতীত। সে আজ সব লেখনীর ঊর্ধ্বে। কবির এ বালিকার পরিচয় চাই-ই চাই। 

কবিকে দেখে বালিকা ভীষণ লজ্জা পেল। লজ্জায় বালিকার শ্যাম বর্ণের মুখ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। বাম হাতে বাম কাঁকে রাখা পানি ভর্তি কলসি শক্ত করে ধরে ডান হাতে শাড়ীর আঁচলের পাড়টা মুখে গুঁজে দিয়ে মাথা নিচু করে কবির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। যেন বালিকার দু-পা থরথর কাঁপছে। কবির আর তর সইছে না। এবার বালিকার সাথে কবির পরিচয়ের পালা। কবি বালিকাকে সরাসরি প্রশ্ন করে...

- বালিকা, কে তুমি?
- আমার নাম নুরজাহান।
- নুর জাহান মানে জাহানের আলো। মানে পৃথিবীর আলো। চমৎকার! 
 (লজ্জায় এক গাল হাসি দেয়। তবে কোনো কথা নেই।)
- আচ্ছা বলো তো, চাঁদের নাম ‘চাঁদ’ রেখেছিল কে? 
- কেন? কোনো কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক বা অন্যকোনো মহামানব।
- নিশ্চয় সে ভুল করেছে।
- কেন বলুন ত...! (অবাক হয়ে)
- যিনি চাঁদের নামকরণ করেছেন তিনি যদি তোমাকে দেখতেন, তাহলে আমি হলফ করে বলতে পারি তিনি চাঁদের নাম রাখতেন ‘নুরজাহান’।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড