• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : ছেলের চাওয়া

  শাহনেওয়াজ সুমী

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৬
চাওয়া
ছবি : প্রতীকী

বৃদ্ধ রমিজ আলী ক্লান্ত শরীর আর ভাঙা মন নিয়ে টেনে টেনে রিকশা চালাচ্ছে। বার বার তাঁর চোখ ভিজে উঠছে আর সেই ভেজা চোখ আধ ছেড়া শার্টের হাতায় মুছে নিচ্ছে সে। রিকশায় বসা মেয়েটা পুরো ব্যাপারটা খেয়াল করে একবার জিজ্ঞেসও করেছে, চাচা মিয়া কী হয়েছে আপনার? রমিজ আলী কান্না গলায় উত্তর দিয়েছে- ‘কিছু নাগো মা, গরিবের পোড়া কপাল।’  

আজ রমিজ আলীর মন খুব খারাপ। তাঁর টাকার খুব দরকার ছিল আজ। তাই সেই কাকভোরে সে রিকশা নিয়ে বের হয়েছে। দুপুরে শুধু একটা বন রুটি আর এক কাপ চা খেয়েছে। এই যাত্রী উঠার আগে দুইটা কলেজে পড়ুয়া ছেলে উঠেছিল রিকশায় পঞ্চাশ টাকা ভাড়া দাম করে। 

গন্তব্যের অনেকটা কাছে এসে একটা জায়গায় রিকশা থামিয়ে বলল- ‘একটা জিনিস কিনে আনি চাচা’ বলে তাকে বসিয়ে রেখে যখন এক ঘণ্টায়ও ফিরে আসেনি তারা তখন সে বুঝে গিয়েছিল এরা তাকে ঠকিয়ে গেছে। তাঁর  ছানিপড়া চোখ দিয়ে পানি পড়া দেখে ফুটপাতের এক ফলওয়ালা বলল- ‘চাচা এরা গেছে গা মনে লয়। তাও একটা কাম করেন, আমি আপনের রিকশাডা দেহি আপনে খোঁজ লইয়া আহেন।’

রমিজ আলী যা বোঝার বুঝে নিয়ে আর খোঁজ নিতে যায় নাই। 

আগামী কাল তাঁর ছেলের এস এস সি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হবার কথা। ছেলেটা অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করেছে। টিউশনি করে নিজের পড়ালেখা পাশাপাশি সংসারের হালও ধরেছে। বৃদ্ধ রমিজ আলীর চার ছেলের এক মেয়ের মধ্যে এই ছেলেটা সবার ছোট। একটামাত্র মেয়ে ছিল যে কিনা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। মেয়েটা গার্মেটস ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। ভালোই কামাত, কিন্তু একদিন বের হয়ে আর ঘরে ফিরল না। 

বাকি তিন ছেলেকে অনেক কষ্ট করে লেখা পড়া শিখিয়েছে রমিজ আলী। তারা এখন সবাই ভালো চাকরি বাকরি করে বৌ নিয়ে আলাদা কোথাও থাকে। কোথায় থাকে সেই ঠিকানাটাও  রমিজ আলী জানে না। এতে তাঁর কোনো আফসোস নাই মনে। ছেলেরা ভালো আছে এটাই তাঁর শান্তি। সে নিজে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারে না। তবু বাপ ছেলে মিলে যা কামায় তাতে তাদের খাওয়াপড়া চলে যায়। কিন্তু বাড়তি কোনো শখ আহ্লাদ মিটাতে পারে না।  

ছোট ছেলে জাহিদ আর তার মাকে নিয়ে সে এক রুমের একটা ছোট্ট ঝুপড়ির মতো ঘরে ভাড়া থাকে। ভালোই আছে আল্লাহ্‌ তালার অশেষ রহমতে। অনেক দিন আগে মা ছেলের গল্পের সময় ছেলেকে বলতে শুনেছিল একটা নতুন পাঞ্জাবির কথা। তখন ছেলের মা ছেলেকে বলেছিল, ‘এই মাসের  টিউশনির টাকাটা পাইয়া কিন্না আনিস বাপ।’ কিন্তু মায়ের সেই মাসেই কঠিন অসুখে অনেক টাকা লেগে গেল। জমানো টাকা তো গেলই সাথে সেই মাসের বেতন আর অ্যাডভান্সও গেল। 

জাহিদের নতুন পাঞ্জাবি আর কেনা হয় নাই। তাই রমিজ আলী ঠিক করে রেখেছিল ছেলেকে আজ একটা পাঞ্জাবি কিনে দিবেই। একটা পছন্দ করেও রেখেছে। সাদা আর সবুজের চেকের পাঞ্জাবিতে গলায় একটু রং এর কাজ করা। দাম তিনশত পঞ্চাশ টাকা। এই সপ্তাহে সব খরচ করে তাঁর কাছে দুইশ বিশ টাকা জমা ছিল। বাকি টাকাটা আজকে মিলিয়ে কিনবে ভেবেছিল। এ দিকে নিজের রিকশাটাও আজ ঠিক করতে দিয়ে ভাড়ার রিকশা নিয়ে বের হতে হয়েছে রমিজ আলীর। 

সারাদিনে যা কামিয়েছিল সব মিলিয়ে এতক্ষণে প্রয়োজনীয় টাকাটা মিলে যেতো যদি ছেলেগুলো না ঠকাতো। তখনই সে পাঞ্জাবি কিনে, ঘরের সদাই কিনে ঘরে ফিরতে পারত। থাক আল্লাহ্‌ যা করেন ভালো করেন বলে, সব কিছু মন থেকে ঝেড়ে ফেলে সে রিকশা টানায় মন দিল। এই সামনেই মেয়েটা নেমে যাবে। 

রাতে পাঞ্জাবি আর বাজার সদাই করে ঘরে ফিরতে ফিরতে ছেলে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। তাঁর বউ আলেয়া বলল জাহিদের আজ নাকি একটু জ্বর এসেছে। রমিজ আলী বললো ‘থাক ঘুমাক সকালে ছেলেকে পাঞ্জাবি দিও।’ পরের দিন পরিশ্রান্ত রমিজ আলীর  ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেল। ততক্ষণে ছেলে স্কুলে চলে গেছে পরীক্ষার ফলাফল জানতে। এই সুযোগে রমিজ আলীও নিজের রিকশাটা আনতে বের হলো। দুপুরের  একটু আগে আগে হাল্কা বৃষ্টি মাথায় রমিজ আলী ঘরে এসে দেখলো জাহিদ তখনো ফিরে আসেনি। 

চিন্তিত রমিজ আলী রিকশা নিয়ে ছেলেকে আনতে যাবে কিনা ভাবতে ভাবতেই বাইরে কিছু মানুষের হইচই শুনতে পেল। সে তাড়াতাড়ি  ঘর থেকে বের হয়ে দেখল কয়েকটা ছেলে জাহিদকে কাঁধে করে নাচাতে নাচাতে তাঁর ঘরে সামনে চলে এসেছে। রমিজ আলি ভয়ার্ত চোখে ছেলের দিতে তাকিয়ে দেখে ছেলে খুশিতে হাসছে। ঘরের সামনে এনে জাহিদকে কাঁধ থকে নামিয়ে দিতেই সে ছ্যাঁচড়ে ছ্যাঁচড়ে বাবার পায়ের কাছে এসে তাকে  সালাম করে বলল, ‘আব্বা আমি খুব ভালা পাস দিছি। জিপিএ ফাইভ পাইছি।’ রমিজ আলী হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। জিপিএ ফাইভ কি সে তা জানে না শুধু জানে তার ছেলেকে নিয়ে আজ সবাই খুশি। তার এই দুঃখী ছেলের দুইটা পা নাই, জন্ম খোঁড়া এই ছেলে লেখা পড়া থেকে শুরু করে তাদের দেখাশুনা করে এসেছে এতদিন। 

জাহিদ অন্য ছেলেদের সাথে খুশিতে বৃষ্টিতে ভিজছে। বাবার দেয়া আর তাঁর শখের নতুন পাঞ্জাবিটা যে কাদায় মাখামাখি হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেদিকে জাহিদের কোনো খেয়াল নাই। সবাই তাকে সাবাসি দিচ্ছে, ছেলের চোখে মুখে যে খুশির ঝলক দেখা যাচ্ছে কোনদিন আর তা রমিজ আলী দেখেনি। সে জোরে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল, থাক ছেলের আজকের এই খুশিতে একটা পাঞ্জাবি না হয় নষ্ট হবে। আমি আবার আরেকটা নতুন পাঞ্জাবি কিনে দেবে তাকে।

ওডি/এনএম 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড