• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘অদ্ভুত নিয়তি’-এর ১৬তম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : অদ্ভুত নিয়তি

  রিফাত হোসেন

১৭ আগস্ট ২০১৯, ১২:১৬
উপন্যাস
ছবি : প্রতীকী

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল সুমাইয়ার। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে শুভর বুকে শুয়ে আছে। ওঠে গিয়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিলো। শুভর দিকে তাকিয়ে দেখে ওর পুরো মুখে, বুকে লিপস্টিক লেগে আছে। শরীরে শার্ট নেই শুভর। বুকের ঠিক মাঝে ঠোঁটের স্পর্শ, যা এখনো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই  হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলল সুমাইয়া। হাতের মুঠোর আড়ালে মুচকি মুচকি হাসছে। শুভ চোখ মেলে তাকালো। সুমাইয়া তখনও মুখ ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল। সাবধানে বিছানা থেকে নেমে হ্যাচকা টান দিয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে ওয়াশরুমের ভিতরে চলে এলো শুভ। অবাক দৃষ্টিতে সুমাইয়া শুভর দিকে তাকিয়ে আছে। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ঝর্না ছেড়ে দিলো শুভ। দু'জনে ঝর্নার নিচে গিয়ে দাঁড়াল। ভিজে একাকার হয়ে গেছে শুভ আর সুমাইয়া। সুমাইয়ার পিছনের দিকে হাত দিয়ে জামাটা খুলে দিলো শুভ। তারপর বেশ কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সুমাইয়ার দিকে। লজ্জায় সুমাইয়া মাথা নিচু করে ফেলল। 

চোখ তুলে তাকানোর মতো দৃঢ়তা ওর নেই। মনে হচ্ছে অন্য এক জগতে চলে গেছে ও। যেখানে আছে শুধুই সুখ। শুভর দৃষ্টি তীক্ষ্ণতা ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুমাইয়ার দিকে। এতদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। দু'জনেই খুব করে চেয়েছিল একে অপরকে নিজের করে পেতে। কাছ থেকে অনুভব করতে। সুমাইয়ার ঠোঁট বেয়ে ঝর্নার জল গড়িয়ে পড়ছে। শুভ নিজের ঠোঁট দু'টো সুমাইয়ার ঠোঁটে স্পর্শ করালো। ওর ঠোঁটের সবটুকু জল শুষে নিলো শুভ। একদিক দিয়ে শুষে নিচ্ছে, আরেকদিক দিয়ে আবার ঠোঁট দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ শক্ত করে শুভকে জড়িয়ে ধরল সুমাইয়া। খালি গায়ে অপূর্ব লাগছে শুভকে। শুভর পিঠটা খামচে ধরল সুমাইয়া। 

শুভ মুগ্ধতার পরম আবেশে নিজের ঠোঁট দু'টো দিয়ে সুমাইয়ার ঠোঁট থেকে জল শুষে নিচ্ছে। একটু একটু করে গভীরে যাচ্ছে শুভ। ঠোঁট দু'টো ঘাড়ের কাছে নিয়ে এলো। যত্ন করে জল শুষে নিচ্ছে শুভ। কখনো-বা শক্ত করে সুমাইয়াকে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরছে।  ঘাড়ের কাছ থেকে মুখটা নামিয়ে বুকের কাছে এলো শুভ। ঠোঁট দু'টো দিয়ে বুকে স্পর্শ করতেই শিউরে উঠল সুমাইয়া। কিছু মুহূর্তের জন্য ওর পুরো শরীর কেঁপে উঠল। শুভর মাথাটা হাত দিয়ে চেপে ধরল। নিজের ঠোঁট দু'টো শুভর ঠোঁটের গভীর নিয়ে গেল সুমাইয়া। একে অপরের স্পর্শে, এক অদ্ভুত জগতে পাড়ি দিলো শুভ আর সুমাইয়া। দু'জনেরই ঘন নিশ্বাস পড়ছে। সুমাইয়ার ঠোঁট কামড়ে লাল করে দিচ্ছে শুভ৷ তবুও সেদিকে কোনো খেয়াল নেই সুমাইয়ার। পরম স্নেহে ওকে আদর করছে শুভ। সেই আবেশে মগ্ন সুমাইয়া। কিছুতেই ইচ্ছে করছে না শুভর ঠোঁটের গভীর থেকে নিজের ঠোঁট সরাতে। এভাবেই চলল আরো বেশ কিছুক্ষণ। শুভ নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সুমাইয়ার ঠোঁট দু'টো ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘এবার ঠাণ্ডা লেগে যাবে। তাড়াতাড়ি গোসল করতে হবে।’

সুমাইয়া কিছু বলল না। মাথা নিচু করে হাসছে ও। 

গোসল করে বেরিয়ে এলো শুভ। কিছুক্ষণ পরে সুমাইয়াও এসে পড়ল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখে শুভ এখনো জামা-কাপড় পড়েনি। তোয়ালে টা কোমড়ে পেঁচিয়ে বসে আছে চেয়ারে। সুমাইয়া সেদিকে আর ভ্রুক্ষেপ না দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ভালো করে নিজের দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো ও। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা দু’জনের মধ্যে। হঠাৎ করে নিজের শরীরে থাকা তোয়ালে টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুলে ফেলল সুমাইয়া। মুগ্ধ হয়ে নিজেকে দেখছে ও। কিছুক্ষণ আগেও এই শরীর শুভর ঠোঁটের স্পর্শ পেয়েছে। 

চমকে উঠল সুমাইয়া। নিচে থেকে তোয়ালেটা তুলে শরীরে পেঁচাতে গেলে শুভ বাধা দেয়। পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘জামা-কাপড় পড়ে নাও৷ নামায পড়ে একটু বাইরে ঘুরতে যাবো। শুনেছি রিসোর্টের আশেপাশে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। সকালে ওই জায়গাগুলোর সৌন্দর্য আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শরীরটাও ফ্রেশ হয়ে যাবে।’

সুমাইয়া আয়না ফুটে ওঠা শুভর মুখের দিকে তাকালো। তারপর মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘এত রোমাঞ্চ করেও তোমার শরীর ফ্রেশ হয়নি?’

- দু’টো বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। তুমি আমার স্ত্রী। তোমার কাছ থেকে যা পেয়েছি, ওটা আমার হক ছিল। আর প্রকৃতির কাছ থেকে যা পাবো, তা হলো প্রকৃতির কাছ থেকে আমার প্রাপ্তি। সুতরাং দু'টোকে এক করলে হবে না।

- আচ্ছা ঠিক আছে৷ এক করব না দু'টোকে। এবার ছাড়ো আমাকে। কাপড় পরতে হবে।

শুভ ওকে ছেড়ে দিয়ে নিজে 
জামা-কাপড় পরতে লাগল। সুমাইয়া নিজের জামা-কাপড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন কী শাড়ি পরব?’

- বোরকা পরবে এখন। বোরকা পরে নামায আদায় করবে। তারপর দু'জনে হাঁটতে বের হবো বাইরে। আর এখন থেকে বাইরে বের হলে বোরকা পরে বের হবা। অফিসে গেলেও তাই করবে। বুঝেছ?’

সুমাইয়া প্রসন্ন এক হাসি দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’

জামা-কাপড় চেঞ্জ করা হলে শুভ বলল, ‘আমি মসজিদে গিয়ে নামায পড়ে আসি।’

- মসজিদ কোথায় আছে তা তো জানো না তুমি। আর আযানও বেশ কিছুক্ষণ আগে দিয়েছে। তাই বলছি, এই ওয়াক্তের নামায আমার সাথে ঘরেই পড়ে নাও।

- আচ্ছা।

অতঃপর দু’জনে নামাযে দাঁড়িয়ে গেল। 

নামায পড়ে রিসোর্ট থেকে বের হলো শুভ আর সুমাইয়া। দু'জনে নীরবে হেঁটে যাচ্ছে। আশেপাশে কোনো মানুষজন নেই। হয়তো এখনো বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে সবাই। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। মাঝে মাঝে সাদা রঙের পাখিগুলো মাথার উপর দিয়ে উঠে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছে দু'জনের মধ্যে। মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখছে প্রকৃতি। অসাধারণ একটা জায়গা। একদিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে একেবারে ঘোর লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে যায়। চারিদিকে অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করে আটটায় রিসোর্টে ফিরল দু'জন। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসার পর দরজার বাইরে থেকে কেউ একজন ডাক দিলো৷ শুভ বলল, ‘কে?’

দরজার ওপাশ থেকে ম্যানেজারের কণ্ঠস্বর পাওয়া গেল। শুভ দরজা খুলে দিয়ে হাসি দিলো। তারপর বলল, ‘ম্যানেজার সাহেব আপনি এত সকালে?’

- আমি একা না৷ স্যার ও আছেন সাথে।

শুভ অবাক কণ্ঠে বলল, ‘কোথায় উনি?’

- ক্যান্টিনে বসে আছে৷ আপনারা দু'জন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসুন। আমি ওখানে যাচ্ছি।

হাসি দিয়ে লোকটা চলে গেল। শুভ আর সুমাইয়া রেডি হয়ে ক্যান্টিনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। কোণাত একটা টেবিলে বসে আছে মিস্টার জন। মানুষটা বিদেশী হলেও স্বভাব-চরিত্র একদম বাঙালিদের মতো। বিশেষ করে খাওয়া-দাওয়ার দিক দিয়ে। বাঙালি খাবার তার খুব প্রিয়। বাংলার সব কিছু তার পছন্দ হয়ে গেছে। বাংলায় কথা-ও বলতে পারেন খুব স্পষ্ট স্বরে। চোখেমুখে বিদেশী ভাব থাকলেও চলাফেরা এবং কথা বার্তায় মনে হয় তার জন্মস্থান এই বাংলায়। শুভ জিজ্ঞেস করেছিল এই কথাটা। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়৷ কিন্তু আমার বাবা-মায়ের জন্ম বাংলাদেশে। সেক্ষেত্রে মায়ের ভাষার একটা ভালোবাসা আছে আমার মধ্যে। বাবা ইংরেজিতে কথা বললেও ছোট থেকেই মা আমার সাথে বাংলায় কথা বলে। তাই ছোট থেকেই বাংলাটা স্পষ্টভাবে শিখেছি।’

শুভ মিস্টার জন এর সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘মিস্টার জন শুভ সকাল। কেমন আছেন?’

মিস্টার জন শুভর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘শুভ সকাল মিস্টার শুভ।’

সুমাইয়ার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, ‘শুভ সকাল মিসেস সুমাইয়া। আমি ভালো আছি৷ আপনারা কেমন আছেন?’

- আমরা ভালো আছি। তা আপনি এত সকালে এখানে? সকালের খাবার শেষে তো আমাদের যাওয়ার কথা ছিল আপনার অফিসে।

মিস্টার জন হো হো করে হাসতে লাগল। শুভ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মিস্টার জন বলল, ‘এখানে আসার পিছনে একটা উদ্দেশ্য আছে। উদ্দেশ্যটা তেমন বড় না হলেও বেশ ইন্টারেস্টিং।’

শুভ আর সুমাইয়ার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। দু'জনের চোখেমুখে কৌতূহল। মিস্টার জন বলল, ‘কালকে ডিনারের খাবারটা এখনো মুখে লেগে আছে। তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠে অফিসে গেলাম। তারপর কাগজপত্র নিয়ে এখানে চলে এলাম। আপনাদেরও আর কষ্ট করে অফিসে যেতে হবে না। আর আমিও এখানকার সুস্বাদু খাবার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিতে পারব।’

- তা অবশ্য ভালো করেছেন। কিন্তু এখানে ইন্টারেস্টিং ব্যপারটি কোথায়?

মিস্টার জন আবার শব্দ করে হাসতে লাগল। তারপর বলল, ‘আমি দেখতে চেয়েছিলাম আপনারা আমার কথাগুলো কতটা মনোযোগ দিয়ে শুনেন, এবং কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হওয়ারও পরও আমি সিনিয়র অফিসার, এটা ভেবে কথাটা এড়িয়ে যান কিনা। সরাসরি জিজ্ঞেস করলে বিভ্রান্তিতে পড়তেন আপনারা৷ তাই একটু টেকনিক খাটিয়ে বুঝে নিলাম। এটাই ইন্টারেস্টিং ব্যপার।’

লোকটা আবার হাসতে লাগল। সাথে শুভ আর সুমাইয়াও। বেশ ভালো একটা যৌক্তিক টেকনিক ব্যবহার করেছে মিস্টার জন। 

 কথা বলতে বলতে খাওয়া শুরু করল সবাই। খাওয়ার মাঝে শুভ বলল, ‘কালকে তো বললেন এখন আমাদের সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে।’

- হ্যাঁ।

- আগে বললে আমরা ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট চলে যেতাম। আপনি এখান থেকে চলে যেতেন।

- সিলেটের কাজ শুধু একদিনের। তা হলো আজকে। বাকি ছয়দিন এখানে থাকতে হবে আপনাদের। আর প্রজেক্টের কিছু কাগজে আপনাদের সাইন লাগবে। যা এখান থেকে করতে হবে। কাগজগুলো আমি সাথে নিয়ে এসেছি। আপনারা সাইন করে দিলে ম্যানেজার সেগুলো নিয়ে অফিসে চলে যাবে। আর আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে যাবো।
- ঠিক আছে।

খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর মিস্টার জন ওদের কে কাগজগুলো দিলো। কাগজগুলো পড়ে সাইন করে দিলো শুভ আর সুমাইয়া। আরো কিছুক্ষণ কথা বলে গাড়ি নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে বের হলো তিন’জন।
 
ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিল আদিত্য। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল। সোফা থেকে ওঠে দরজাটা খুলে দিলো। দরজার ওপাশে আদিবা দাঁড়িয়ে আছে। আদিত্য অবাক কণ্ঠে বলল, ‘তুই এখানে?’

আদিবা কিছু বলল না বলে আদিত্য কিছুটা ভয় পেলো। অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘চুপ করে আছিস কেন? কী হয়েছে বল আমাকে। মা ঠিক আছে তো?’

- মা ঠিক আছে৷ আমি তোর খোঁজ নিতেই এসেছিলাম। তোর নম্বর তো নেই আমার কাছে। তাই শুভ ভাইকে ফোন করেছিলাম। সে বলল তুই বাড়িতে  আছিস, দেখা করে আসতে।

- ওহ্। আচ্ছা ভিতরে আয়।

আদিবা ভিতরে এলো। সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘সকালে কিছু খেয়েছিস ভাইয়া?’

আদিত্য মাথা নিচু করে বলল, ‘রান্না হয়নি এখনো। ভাবছিলাম রান্না করব। এই করব-করব করতে গিয়ে আর করা হয়নি।"

আদিবা রাগী দৃষ্টিতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সকাল পেড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে। এখনো তোর রান্না হয়নি। সাধারণ জ্ঞানটুকুও নেই তোর মাথায়। ক্ষিদে পেটে বসে থাকবি, অথচ নিজে কিছু রান্না করে খাবি না। কেন যে তোর মতো একটা অলস কে নিজের বাড়িতে রেখেছে শুভ ভাইয়া? আমি হলে কবেই বের করে দিতাম। এত অলস মানুষ আমার একদম পছন্দ নয়।’

আদিত্য মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘সেটা করা তো আর বাকি নেই। সেই কবেই তো বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিস।’

আদিবা বড় করে নিশ্বাস ছাড়ল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘সেটা তোর নিজের দোষেই। আর আমি এখন আর ওইসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না। প্রতিদিন ইউনিভার্সিটি থেকে এসে আমি রান্না করে দিয়ে যাবো এই এক সপ্তাহ।  সেগুলোই ফ্রিজে রেখে, গরম করে খাবি।’

আদিত্য করুণ কণ্ঠে বলল, ‘এর থেকে তো না খেয়ে থাকাই ভালো ছিল।’

আদিবা হাসতে হাসতে বলল, ‘তাহলে না খেয়েই থাক।’

- এতদিন পর ভাইয়ের জন্য মায়া হলো একটু। কোথায় একটু ভালো ভালো সব খাবার রান্না করে খাওয়াবি। তা না করে আরো বিপদে ফেলে দিচ্ছিস।

- বিপদে কোথায় ফেললাম? আমি তো তোকে সাহায্য করতেই এলাম। আচ্ছা যা, সময় পেলে আমি এসে খাবার গরমও করে দিয়ে যাবো। তবে শুধুমাত্র এই এক সপ্তাহ। শুভ ভাই এলে আমি আর আসবো না। তাছাড়া আর কতদিন অন্যের বাড়িতে থাকবি।  তার বিয়ে হয়েছে মাত্র। স্ত্রীকে নিজে একান্তভাবে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য তাদের সুযোগ করে দিতে হবে৷ তুই এখানে থাকলে তারা সবসময় ফ্রি হতে পারবে না।

- অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনো চাকরি হলো না। শুভ ভাই বলল ঢাকায় এসে একটা ব্যবস্থা করে দিবে। তারপর আমি আলাদা বাসায় গিয়ে থাকবো।

- ঠিক আছে। আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি ওয়েট কর একটু। আমি  জানতাম তুই কখনোই রান্না করে খাবি না। আর বেশি ক্ষিদে পেলে বাইরে গিয়ে খেয়ে নিবি। কিন্তু বাইরের খাবারে তো তুই অভ্যস্ত না। তাই আমি বুদ্ধি করে বাড়ি থেকে রান্না করে নিয়ে আসছি। আচ্ছা প্লেট কোথায় আছে?

আদিত্য ওকে রান্নাঘরে রাখা প্লেটগুলো দেখিয়ে দিলো। আদিবা তাড়াতাড়ি করে প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে আদিত্যর সামনে এসে বলল, ‘নে হা কর, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।’

আদিত্য ফিক করে হেসে দিলো। আদিবা বলল, ‘হাসছিস কেন?’

- তুই নিজেই তো মায়ের হাতে খাবার খেয়ে বড় হয়েছিস। আবার আমাকে খাইয়ে দিবি বলছিস। এত বড় হয়ে গেছিস অল্প কিছুদিনের মধ্যেই।

- বিষয়টি ঠিক বড় আর ছোট'র না। সময়ের সাথে সাথে মানুষকে অনেককিছু শিখে নিতে নয়। ধরে নে সাময়ের সাথে চলতে গিয়ে আমিও এইসব শিখে ফেলেছি। মা অসুস্থ। তার উপর নানার বাড়িতে থাকি। মা তো আর সব খাবার খেতে পারে না৷ তাই মায়ের জন্য আমিই আলাদা করে রান্না করি। নিজের হাতে খাইয়ে দিই মাকে। এগুলো করতে করতে শিখে গেছি সবকিছু।

আদিত্যর চোখের কোণে জল ছলছল করছে। শুধু যে ও কষ্টে আছে তা নয়। ওর মা আর বোনও কষ্টে আছে। আদিবা আদিত্যর মুখে খাবার তুলে দিলো। আদিত্য খেতে খেতে বলল, ‘অনেকদিন তো হলো। এবার একটু চেষ্টা কর বোন। মাকে বল আমাকে মাফ করে দিতে। আর কতদিন রাগ করে থাকবে আমার উপর।’

- মাকে তো ভালো করেই চিনিস। এক কথার মানুষ সে। তাছাড়া আমি অনেক চেষ্টা করেছি। ইনফ্যাক্ট এখনো করছি। তোর উপর আর কোনো রাগ নেই আমার। আমিও চাই তুই আমাদের কাছে ফিরে আয়। কিন্তু কী করব বল? মা তো রাজী হচ্ছে না। উল্টো আরো অস্থির হয়ে যায়। আমাদের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। নানার বাড়ি থাকলেও সংসারের দায়িত্বগুলো এখন মামাদের হাতে। বুঝতেই পারছিস কীভাবে দিনকাল যাচ্ছে আমাদের?

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিল আদিবা। আদিত্য হাত দিয়ে আদিবার চোখের জল মুছে দিলে বলল, ‘চিন্তা করিস না। আমি একটা জব পেলেই নতুন বাসা নিবো। তারপর মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াবো। দরকার হলে সারাক্ষণ মায়ের পা ধরে মাফ চাইবো।’

আদিবা কিছু বলল না। আদিত্যর মুখে আবার ভাত দিলো। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠায় আদিবা ভাতের প্লেটটা টেবিলে রেখে দরজা খুলে দিলো। দরজার বাইরে জ্যোতি দাঁড়িয়ে আছি। কেউ কাউকে আশা করেনি। একে অপরের দিকে 
ভ্রু-কুঞ্চিত অবস্থায় তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে থেকেই আদিবা বলল, ‘কাকে চাই?’

জ্যোতির মাথা গরম হয়ে গেল। কিছুতেই নিজেলে কন্ট্রোল করতে পারছে না। রাগে কটমট করছে ও।  বলল, ‘আগে বলুন আপনি কে? আমার বাসায় কী করছেন আপনি?’

আদিবা অবাক হয়ে বলল, ‘আপনার বাসা মানে?’

জ্যোতি ধমকের স্বরে চেঁচিয়ে বলল, ‘আপনার পিছনে যেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে, ওটা আমার স্বামী। সুতরাং এটা আমার বাসা। কিন্তু আপনি কে? আর ওর সাথে কী করছেন আপনি?’

আদিবা আদিত্যর কাছে গিয়ে বলল, ‘এইসব কী বলছে উনি? আর তুই চুপ করে আছিস কেন?’

জ্যোতি রাগটা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। আদিত্য কাছে এগিয়ে গেল। হুট করব আদিত্যর গালে একটা চুমু দিয়ে বলল, ‘আমার স্বামীর কাছে এসেছ কেন তুমি? ওকে স্পর্শ করার অধিকার শুধু আমার একার আছে৷ আর ওকে খাইয়ে দিচ্ছ কেন তুমি।’

- এই এলাকায় যে এইরকম লেভেলের একটা পাগল আছে আগে জানতাম না। আমার নিজের ভাইকে নাকি আমিই খাইয়ে দিতে পারব না। এমনকি ধরতেও পারব না। হাই লেভেলের পাগল ছাড়া এই কথা কেউ বলবে না।

জ্যোতি হঠাৎ থমকে গেল আদিবার কথা শুনে। নিচু স্বরে বলল, ‘উনি আপনার ভাই?’

কড়া গলায় আদিবা বলল, ‘হ্যাঁ। ও আমার ভাই৷ কিন্তু আপনি কোথাকার পাগল? এভাবে হুট করে বাড়িতে ঢুকে আমার ভাইয়াকে নিজের স্বামী বানিয়ে দিচ্ছেন। আমার সামনেই আবার চুমু দিচ্ছেন। লজ্জা করে না আপনার?’

জ্যোতির কণ্ঠস্বর আরো নিচু হয়ে গেল। আদিবার হাত ধরে বলল, ‘মাফ করে দাও রে বোন। আমি শুভ ভাইয়ের ছোট বোন।’

আদিবা হা করে জ্যোতির দিকে তাকালো। তারপর বলল, ‘আপনি শুভ ভাইয়ার বোন? তাহলে আপনি ভাইয়াকে নিজের স্বামী বললেন কেন?’

- ইয়ে মানে, একটু মজা করছিলাম।।

- আর মিথ্যে বলতে হবে না। আমি সবটাই বুঝেছি এবার।

আদিবার গাল টেনে দিয়ে জ্যোতি বলল, ‘এইতো আমার কিউট শালিটা।’

- শালি মানে?

- সরি সরি। ওটা ননদ হবে।

আদিবা আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে না জানিয়ে এতদূর চলে গিয়েছিস? একবার অন্তত বলতে পারতি আমাকে।’

আদিত্য অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘আমি কিছুই জানি না বোন। উনি উল্টো পাল্টা বলছে। উনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শুভ ভাইয়ের বোন হিসেবে যেটুকু চিনি আরকি।’

জ্যোতি আদিত্যর শার্টের কলার টান দিয়ে বলল, ‘মিথ্যে কথা বললে একদম খুন করে ফেলবো।’

আদিত্য কিছু বলল না। জ্যোতি আদিবার কাছে এসে আদিবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমার নাম নিশ্চয়ই আদিবা৷ আদিত্যর কাছে শুনেছি তোমার নাম। যাক, তুমি এসেছ বলে আমি একটু চিন্তামুক্ত হলাম। ভেবেছিলাম তোমার ভাই রান্না করতে গিয়ে আবার উল্টো পাল্টা কাজ করে বসবে। তাই আমিই রান্নাটা করে দিতে এসেছিলাম।’

আদিবা  বলল, ‘আমি তো ভাবতেই পারছি না। ভাইয়ার মতো একজন অলস মানুষ তোমার মতো সুন্দরী একজন মানুষকে জীবন সঙ্গীনী হিসেবে পেয়েছে। একটু পাগলি, তবে বেশ ভালো।’

জ্যোতি হেসে দিলো। আদিত্যর খাওয়া শেষ হলো। জ্যোতি বলল, ‘তাহলে আমি এখন যাই।’

জ্যোতি বলল, ‘একটু পরে যাও। রাতের জন্য রান্না করে দিয়ে যাবো। তারপর দু'জনে একসাথেই বের হবো।’

- আচ্ছা।

জ্যোতি আর আদিবা মিলে রান্না করতে চলে গেল। রান্না শেষ করে বেরিয়ে গেল দু’জনেই। 

আদিবা আর জ্যোতি চলে যাওয়ার পর আদিত্য ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল কলিংবেলের শব্দে। তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে গেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা থেকে নেমে এসে ড্রয়িংরুমে এলো আদিত্য। দরজা খুলে দিলো। দরজার বাইরে জ্যোতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। জ্যোতির চোখেমুখের অবস্থা দেখে ভয়ে আতঙ্কে উঠল আদিত্য। হঠাৎ করেই বুকটা কেমন কেঁপে উঠল ওর। জ্যোতির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। খুব হাঁপাচ্ছে জ্যোতি। হাত থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। জ্যোতি আদিত্যকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। আদিত্য কিছুই বুঝতে পারছে না। সবকিছু কেমন ধোঁয়ার মতো অস্পষ্ট লাগছে। নিজের মনে মনে বলল, ‘হঠাৎ করে কী হলো জ্যোতির? কিছুক্ষণ আগেও তো হাসি মুখে হোস্টেল ফিরে গেল।’

(চলবে...)
আরো পড়ুন ‘অদ্ভুত নিয়তি’-এর ১৫তম পর্ব - ধারাবাহিক উপন্যাস : অদ্ভুত নিয়তি

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড