• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : আমরা করবো জয়

  কমল উদ্দিন

১৬ আগস্ট ২০১৯, ১০:৪৪
গল্প
ছবি : প্রতীকী

- ওই, বলটা কুড়িয়ে এনে দে তো?
রাজিব একটা ছোট ছেলেকে ডেকে বলল। ছেলেটা বল কুড়িয়ে এনে রাজিবের দিকে ছুঁড়ে মারলো। রাজিব বলটা ধরে ক্রিজে থাকা ব্যাটসম্যানের উদ্দেশ্যে দৌড়ানো শুরু করলো। ব্যাটসম্যান বলটাকে সীমানা ছাড়া করে একটা মুচকি হাসি দিলো। রাজিবকে কটাক্ষ করলো, ‘এমন বল করে এত ভাব দেখাস কেন? তোর বল নাকি কেউ খেলতে পারে না।’

রাজিবের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তাকিয়ে আছে সেই বল কুড়ানো ছেলেটার দিকে। বলটা সীমানা পেরিয়ে অন্য কোথাও নয়, ছেলেটার হাতে গেছে। এমনকি ছেলেটা দুর্দান্ত ভঙ্গিতে ক্যাচ লুফে নিয়েছে। সেটা দেখে রাজিবের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ছোট্ট একটা ছেলে, এত দূর থেকে উড়ে যাওয়া বলে হাত দেওয়া তো দূরের কথা দৌড়ে পালাবে! ছেলেটা বলটা রাজিবের দিকে ছুঁড়ে দিলো। আবার সে ব্যাটসম্যানের উদ্দেশ্যে দৌড়ানো শুরু করলো।

একটি স্কুল সংলগ্ন খেলার মাঠ। পড়ন্ত বিকাল মানেই লোকারণ্য মাঠ। নানা বয়সী মানুষ। শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সবধরনের মানুষের সমাগম সেখানে। সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। যে যার কাজে মগ্ন। কেউ খেলছে, কেউ জটলা করে গল্প করছে, কেউ যগিং করছে।

রাজিব খেলা শেষ করে বল কুড়ানো ছেলেটাকে একটা কাগজের টুকরো হাতে দেখতে পেল। ছেলেটা কাগজটা পড়ার চেষ্টা করছে। রাজিব তার দিকে এগিয়ে গেল। দেখলো তার হাতে পত্রিকার ছেড়া পাতা। খেলার পাতার অংশ। তাতে সাকিব, তামিম ও মাশরাফির অনুশীলন চলাকালীন ছবিও রয়েছে। ছবিটা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সে। রাজিব তার সাথে কথা বলা শুরু করলো—
- ওই, কি দেখছিস?
- ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে খেলবে, সাকিব-তামিম-মাশরাফি ভাই প্র্যাকটিস করছে। আমি এটা আমার কাছে রেখে দিয়েছি। ইচ্ছা হলেই ছবিটা দেখি।
- খেলা দেখিস, তুই?
- মাঝে মাঝে দেখি। সবসময় দেখা হয় না। দোকানের পত্রিকা পড়ে খবর রাখি।
- তুই পড়তে পারিস? 
- অল্প অল্প পারি। এখনও ভাল মতো পড়তে পারিনা।
- কোন স্কুলে পড়িস?
- কোন স্কুলে পড়ি না। তনিমা আপু আমাদের পড়া শেখায়। আমরা কাজ শেষ করে আপুর কাছে পড়ি।
- তুই কোথায় থাকিস? বাড়ি কোথায়?
- বস্তিতে। আমরা বস্তিতে থাকি। আমরা কয়েকজন একসাথে আপুর কাছে পড়ি। খেলাধুলা করি। তনিমা আপু বলেছে আমরা নাকি খুব ভাল বন্ধু।
- ও আচ্ছা। তোর বন্ধুরা কোথায়? তোর বন্ধুরা আজ খেলতে আসেনি?
- আমরা এখানে খেলিনা। আমাদের বস্তির পাশে খেলার জায়গা আছে, সেখানে খেলি।
- আজকে না খেলে এখানে কেন?
- আমি মাঝে মাঝে এখানে আসি। আপনাদের খেলা দেখে শিখি। তারপর সেটা আমার বন্ধুদের শেখায়।
- তোর বন্ধুদের সাথে এখানেও তো খেলতে পারিস। কাল থেকে এখানে খেলবি। সবাই শিখতে পারবে। আমিও মাঝে মাঝে তোদের শেখাবো।
- না, আমরা এখানে খেলব না।
- কেন খেলবি না?
- আমরা বস্তিতে থাকি। আমরা ভিন্নজগতের মানুষ। আমাদের আলাদা নাম আছে। বস্তির শিশু আমরা। আমরা নাকি পথশিশু।
- বস্তিতে থাকিস তো সমস্যা কি? দেখিস না এখানে তোদের মতো কত ছোট ছেলেরা খেলে, আনন্দ-উল্লাস করে। তোরাও করবি।
- এটা অত সহজ না। আমাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়। পদে পদে লাঞ্ছনার শিকার হই আমরা। এখানে খেলতে এসে অবজ্ঞা সহ্য করার চেয়ে আমাদের ছোট মাঠই ভাল। আমরা ওখানে খেলতে পেরেই খুশি।
- তোর ধারণা ভুলও তো হতে পারে।
- না, ভাই। ধারণা ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। আপনিও জানেন তো, সম্প্রতি ঢাকায় ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়ে কত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অনেকেই মারা গেছে। রোগ তো আর ধনী-গরীব দেখে হয় না। কিন্তু হতভাগা নাহিদ হাসপাতালে ভর্তি হতে পারল না। তার মতো অনেক শিশুই তো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার চিকিৎসার অধিকার নেই। কারণ সে পথশিশু!

রাজিব কোন কথা বলতে পারলো না। সে অন্যদিকে তাকিয়ে ছেলেটার কথা শুনছে। ছেলেটা আবার বলতে শুরু করলো, ‘জাতিসংঘ শিশুদের জন্য যে শিশু অধিকার সনদ বা Convention on the Rights of the Children প্রণয়ন করেছে তাতে শিশুদের যে অধিকারগুলো বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বেঁচে থাকার অধিকার, পিতামাতার সাথে বসবাসের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, চিকিৎসার লাভের  অধিকার, শিক্ষা লাভের অধিকার, বিনোদনের অধিকার।’

এগুলো বলতে বলতে ছেলেটা চুপ হয়ে গেল। আরও কোন অধিকার বাদ পড়লো কিনা মনে করার চেষ্টা করছে। রাজিব এত সময় মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথাগুলো শুনছিল। রাজিব বলল, ‘আর মনে করতে হবে না। তুই  এগুলো কোথা থেকে জানলি?’

- তনিমা আপু আমাদের শিখিয়েছে। তিনিই আমাদের একমাত্র শিক্ষক।
বিষমুখে ছেলেটা উত্তর দিলো। তারপর বলল, ‘শিশু অধিকার সনদে যেগুলো বলা হয়েছে ঐ গুলোতে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে বলেছে। আচ্ছা, আমরা পথশিশুই হলাম, কিন্তু শিশু তো! আমাদেরও তো অধিকার গুলো প্রাপ্য। এগুলো যদি বাস্তবায়ন হতো তাহলে হাসপাতালে নাহিদের জায়গা হতো। আমাদেরকে অবহেলা করা হয় এটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।’

রাজিব কোন কথা বলতে পারলো না। হঠাৎ কয়েকজনের হৈ চৈ শোনা গেল। ‘আপু, ঐ দেখেন সাজিদ। সাজিদ, সাজিদ, সাজিদ!’ চিৎকার করতে করতে মাঠে চলে আসলো। রাজিবের সাথে যে ছেলেটা এত সময় কথা বলছিল সেই হচ্ছে সাজিদ।

‘ঐ সাজিদ, তুই এখনও এখানে কি করছিস? আমরা তো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি।’ সাজিদের খেলার সাথীদের একজন বলল। ‘আরে, দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তোদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, ইনি হচ্ছে রাজিব ভাই। রাজিব স্পোটিং ক্লাবের পরিচালক।’ সাজিদ মুচকি হেসে বলল। 

তনিমা এতক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনছিল। তিনি একগাল হাসি দিয়ে বলল, ‘রাজিব ভাই, আমি তনিমা। সাজিদদের আপু।’
- জ্বি, আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনলাম। তবে আমিও আপনাদের অংশ হতে চাই। সাজিদদের ক্রিকেট শেখাতে চাই। আপনি কি বলেন, আপু?
- তাহলে তো ভালই হবে। আমিও একজন সঙ্গী পেলাম।
সাজিদরা সবাই উল্লাসে ফেটে পড়লো। রাজিবকে সবাই এক সঙ্গে জড়িয়ে ধরলো। আর সমস্বরে বলে উঠলো, ‘আমরা করবো জয়, নিশ্চয়ই।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড