• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : ফারহানের ঈদ

  নাঈম আহসান

১০ আগস্ট ২০১৯, ১২:৫২
গল্প
ছবি : প্রতীকী

বাপের বড় ছেলে ফারহান। বুঝ হওয়ার পর থেকেই পরিবারের অভাব-অনটনের সাথে পরিচয় তার। সংসারের এক মাত্র ভরসা তার কর্মক্ষম বাবা কাসেম আলী। চল্লিশোর্ধ কাসেম আলী পেশায় সাধারণ কৃষক। তিন ভাই আর ছোট্ট এক বোন মিলে ছয় সদস্যের ক্ষুদ্র সংসার। পরিবারের শত অভাব আর টানাপোড়নের মধ্যেও পড়া লেখা চালিয়ে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ফারহান এখন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনার পাশা-পাশি ছোট্ট একটা জবও জুটেছে তার। সামান্য বেতনের এই জবে তার চলে যায় মোটামুটি। বাড়ি থেকে টাকা আনা লাগে না। বাড়ির যা অবস্থা টাকা চাইতে বিবেকে বাধে। ছোট দু'ভাইয়ের পড়া-লেখা আর সংসারের খরচ চালাতেই কাসেম আলী হিমশিম খাচ্ছে। এত কষ্টের ফসল ধান মাড়াইয়ের পর বাজারে সেই ধানের দর শোনে মাথা ঘুরে যায়। 


আর ক’দিন বাদে ঈদ। ঈদ উপলক্ষে ফারহানের বস আলতাফ হোসেন ঘোষণা করেছেন ঈদে সবার বেতন ডাবল করে দেওয়া হবে। ঘোষণাটি শোনে ফারহান যারপরনাই আনন্দিত হয়েছে। দিন কয়েক হলো দু’টো টিউশনিও হয়েছে তার। যাক ঈদে তাহলে বাড়তি কিছু টাকা পকেটে আসবে। অনেক দিনের আশা ছিলো একটা এন্ড্রয়েড ফোন কিনার। তার সমবয়সী সবার হাতে দামি ফোন, তার হাতেই কেবল পুরনো দিনের বাটন। ফোনটা তাহলে চাঁদ রাতেই কিনবো। 
 

রাত ন’টা বাজে। বেশ কয়েকবার  রিং বাজার পর ফোন রিসিভ করেছে ফারহানের ছোট বোন মাবরুরা। সাথে সাথে সে বলা শুরু করলো, ‘কিরে আম্মু কই?’ 
- ভাইয়া আম্মু নামাজে
- ভাইয়া 
- হুম 
- ঈদে আমাকে ইভানার মতো সুন্দর একটা জামা এনে দিবা
- ইভানার আব্বু ওর জন্য অনেক সুন্দর জামা এনেছে
- আচ্ছা তোমার জন্যও সুন্দর দেখে একটা জামা আনবো
- আনবে কিন্তু ভাইয়া
- ঠিকাছে আনবো
ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ কি যেন ভাবলো ফারহান। মাবরুরা ছোট বলে তার মনের কথাটা ভাইকে অকপটে বলতে পেরেছে। বাকি দু’ভাই, তাদেরও তো মন চায় ঈদে নতুন জামা পরতে, মন চায় বড় ভাইকে বলতে, নতুন জামা আনতে; কিন্তু কীভাবে বলবে? তারা যে কিছুটা বড় হয়ে গেছে। বলতে ভীষণ লজ্জা লাগে। আর ভাই তো বড় কোনো চাকরিও করে না। যৎসামান্য বেতনের একটা চাকরি। সেই সারাটা রাত ফরহান অনেক ভেবেছে। বোনের জন্য জামা কিনবে, আর বাকি দু’ভাই? ওদের জন্যও তো কিনা দরকার। এ ভাবনাটা এসে ভিড় জমিয়েছে মাবরুরার সাথে কথা বলার পর থেকে। আর আব্বার জন্য? বুঝ হওয়ার পর থেকে বাবাকে কোনো দিন নতুন জামা পরে ঈদ করতে দেখেনি ফারহান। এই মানুষটার জন্যও ত কিনা দরকার।  এসব ভাবনার মাঝে পরক্ষণই আসলো ফোন কিনাটা। এসব কিনলে তো আর ফোন কিনাটা হবে না।
 

রাত পোহালে ঈদ। মাবরুরা কিছুক্ষণ পর পর ঘুম থেকে জেগে আম্মুকে জিগ্যেস করছে রাত পোহাবার কত দেরি? খানিকটা বিরক্তি গলায় আম্মুর জবাব বললো, ‘অনেক দেরি, ঘুমাও’। ওর জিজ্ঞাসার কারণ হলো কবে রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটবে আর সে সবার আগে ঈদের নতুন জামা পরে সবাইকে দেখিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়াবে। পাশের রুমেই শুয়েছে ফারহান; সে এখন  মা মেয়ের সংলাপের মুগ্ধ স্রোতা । ঘড়ির কাটা তখন রাত দু'টোর ঘর অতিক্রান্ত করছে। থেকে থেকে করুণ সুরে শিয়াল ডাকছে।  ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে মারুরা। ওর খুশি দেখে কে। ঈদের নতুন জামা পরে বাড়ির অন্য পিচ্ছিদের সাথে পুরো গ্রাম চষে বেড়াচ্ছে। সকাল আটটার কিছু পর ফারহানের ছোট দু’ভাই এবং বাবাসহ নতুন জামা গায়ে জড়িয়ে ঈদগাহে যায়। ভাই দু’টো কিছুটা বুঝদার হওয়ায় তাদের খুশিটা মাবরুরার মতো প্রকাশ পাচ্ছে না; কিন্তু তাদের মুখ দেখে তারা যে অনেক খুশি এবং আনন্দে আছে এটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। মাঠের বিম্বারে বসে ইমাম সাহেব দ্বীনি আলোচনা করছেন। আগত মুসল্লিরা ইমাম অভিমুখী বসেছে। বসেছে ফারহানও। কিন্তু তার মন মাঠের আলোচনায় নেই। সে ডুব দিয়েছে ভাবনার অতল গহ্বরে। 

ভাবনার সবুজ বাগানে বসে সে আবিস্কার করেছে - প্রিয় মানুষগুলোর মুখে এক টুকরো হাসি লক্ষ টাকার দামি ফোন কিনার চাইতে অনেক বেশি আনন্দের। অনেক বেশি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড