• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : অবসান

  নাসরিন আখতার

১০ আগস্ট ২০১৯, ১০:৪৩
গল্প
ছবি : প্রতীকী

আমি ভার্চুয়াল প্রেমে বিশ্বাসী নই। আমার কাছে প্রেম মানে শরীর। আমি একজন নিরস কাঠখোট্টা মানুষ। তোর সাথে ফালতু বকার মতো সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই।

রুম ডেট ঠিক কর তারপর না হয় আমরা কথা বলি। একথা বলেই সৈকত ফোনটা কেটে দিল। সোহিনী ঠিক বুঝতে পারছে না আজ হঠাৎ করে সৈকতের কি হলো? সে কেন এমন আচরণ করছে? যে সৈকত এতদিনে একবার ও তাকে স্পর্শ করেনি সে কেন এমন কথা বলছে!

খুব রাগ হচ্ছে সৈকত, তুই তো এমন ছিলি না? নিজের কানকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আরো পাঁচটা ছেলের থেকে তো তোকে সম্পূর্ণ একটা আলাদা মানুষ বলেই জানতাম। তুই ও তাহলে ব‍্যতিক্রম নয়? আমি কি ভুল শুনলাম? দেখি আর একবার কথা বলি। একবার, দু’বার, তিনবার ফোনটা বেজে গেল। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মিলল না। প্রচণ্ড একটা রাগ, দুঃখ, ঘৃনা, মান অভিমান, সোহিনীর দু’গাল বেয়ে ঝরে পড়ছে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে তারপর রাত। সোহিনী, প্রতিক্ষনে ফোনটা চেক করছে। না আমার জন্য ওর কোনো সময় নেই। ওর এখন শরীর চাই শরীর। কি আছে এই শরীরে?

কয়েক দিন আগে উচচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমি এখন সম্পূর্ণ টেনশন মুক্ত। পরীক্ষা যা দিয়েছি আশা করি রেজাল্ট খারাপ হবে না। তাই এখন শুধু গল্পের বই পড়ে সময় কাটানো। বাবা লাইব্রেরিতে একটা কার্ড করে দিয়েছেন। সপ্তাহে একবার সেখানে যায় বই পড়তে, বইয়ের গন্ধ উপভোগ করতে। এইভাবে বেশ চলছিল। এরই মধ্যে পাড়ার এক দাদা, যে চাকরি সূত্রে বেশ কয়েক বছর বাইরে কাটিয়ে কয়েক দিন হলো দেশে ফিরেছে। ভালো চাকরি করে। দেখতে শুনতে মন্দ নয়। মায়ের মুখে নীলয়ের নামটা কয়েক দিন ধরেই শুনছি।

বেশ কয়েক বার লাইব্রেরীতে দেখা। এক প্রকার যেচে আলাপ করলো। 
তুই সোহিনী না? আমায় চিনতে পারিস নি? আমি নীলয়। কত বড়ো হয়ে গেছিস। ঠোঁটের নিচের তিলটা আর সেই টোল পড়া  হাসিটা কিন্তু একই রকম আছে। ওর কথা শুনে বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে চিনলাম। ভীষণ অবাক লাগছে কি ভাবে ও মনে রেখেছে এত কিছু! আমার থেকে বেশি চেনে ও আমাকে? নীলয় কথা বলে খুব সুন্দর করে। যে কোনো মানুষ মুগ্ধ না হয়ে পারেই না। আমি ও মুগ্ধ। ওর বুদ্ধিদীপ্ত চাহনী, ওর আকর্ষণীয় চেহারা, ওর সকল বিষয়ে অগাধ জ্ঞান আমাকে চুম্বকের মতো টানছে। এখন প্রায় রোজ আমরা দু’জন একসাথে দিনের কিছুটা সময় কাটায়। 

বেশি দেখা হয় লাইব্রেরীতে। এই ভাবে বন্ধুত্ব বেশ গভীর হচ্ছিল। আমিও নীলয় কে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। কবে ও বলবে তোকে ভালোবাসি সোহিনী, নিজের থেকে বেশী। সেই স্বপ্ন।কবে পাব ওকে একেবারে নিজের করে, সেই স্বপ্ন। নীলয়ের বুকে মাথা রেখে চলছে স্বপ্নের জাল বোনা। দুর আমি এসব কি আবোল তাবোল ভাবছি। নিজের মাথায় টোকা মেরে দেখলাম আমি দিবা স্বপ্নে বিভোর। যাক আমি  নীলয়কে ভালো বেসে ফেলেছি, সেটা কিন্তু বাস্তব সত্যি।

বেশ ছিলাম দু’জনে, সময় কাটছিল খুবই দ্রুত গতিতে। নীলয়ের কাজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে আসছিল। আর প্রচন্ড একটা কষ্ট আমাকে দুমড়ে মুচড়ে কিভাবে থাকব ওকে ছাড়া? একরাশ মন খারাপ নিয়ে নীলয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম। নীলয়ও খুব কষ্ট পাচ্ছিল। ওকে বুকে জড়িয়ে কান্না চাপতে পারলাম না। আর একটা অন্য রকম ভালো লাগায় কখন যে হারিয়ে গেলাম; টের পেলাম যখন নীলয় তার সব ভালোবাসা আমার শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় ছড়িয়ে দিল।
কথা হলো ছয়মাস পরে ফিরে এসে বিয়ে করে আমাকে সাথে নিয়ে চলে যাবে। ওখানে গিয়ে বাড়ি ঠিক করতে হবে। অনেক কাজ। সব ঠিক ঠাক করে ও ফিরে আসবে। এখন শুধু দিন গোনা।

কতদিন আর কতদিন অপেক্ষা করব নীলয়? প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। না কোনো খবর না কোনো চিঠি। শাঁপ গ্ৰস্থ নন্দন কাননের কোনো অধিবাসীর মতো জীবন। এভাবে আর কতদিন আমাদের সন্তানের ভার আমি একা কিভাবে বয়ে বেড়াব নীলয়? 

নীলয় ফিরলো। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে। কিন্তু সেই ফেরাটা যে এতখানি যন্ত্রণাময় হবে সেটা কি জানত সোহীনি? অফিসের বসের মেয়েকে বিয়ে করে নীলয় সস্ত্রীক ফিরলো।
সোহীনির সব স্বপ্ন ভেঙে গেল। নীলয় বিশ্বাস ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে; উপড়ে ফেলেছে মন-
মনের ভিতরে আছড়ে পড়েছে কি ভীষন সাইক্লোন।

বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা থেকে গেল শুধু পিকলুর কথা ভেবেই। জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। বেশ চলছিল মা ও ছেলের এই আশ্রমের জীবন। 

মেয়ের লজ্জা গোপন করতে সোহীনির বাবা তার সন্তানকে এক আশ্রমে রেখে আসেন। আর মাতৃত্বের এক অমোঘ টানে সোহীনির বাড়ি ছেড়ে সেই আশ্রমে শিক্ষাকতা করতে চলে আসা।

সেখানেই আলাপ সৈকতের সাথে। স্পষ্টবাদী কাঠখোট্টা মানুষ। প্রেম ভালোবাসার ধার ধরেনা। তবুও কখন যেন সোহীনি ও সৈকতের মধ্যে একটা নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। সৈকত খুব ভালো ছবি তোলে, সেই আগ্ৰহে  ছুটি পেলে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়।
 
সময় পেলে কিছু সমাজ সেবা মূলক কাজ করে। এই আশ্রমের বাচ্ছাদের নিয়ে একটা ফ্লিম করার উদ্দেশ্যে সৈকতের এখানে আসা। আর সেখান থেকেই একটু একটু করে সোহিনীর সাথে আলাপ, বন্ধুত্ব আর  না বলতে পারা গোপন ভালোবাসা।
দু’জনে কোনো দিন মুখে কিছু বলেনি ভালোবাসার কথা। কিন্তু কখন কিভাবে মনের মধ্যে ভালোলাগার বীজ রোপন হয়ে গেছে কেউ বুঝতে পারেনি।

জীবন ঠিক নদীর মতো করে চলে। এক কূল ভাঙ্গে আর এক কূল গড়ে। 
না সোহিনী আর ভুল করবে না। ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে যতদিন না সামাজিক সীকৃতি পাচ্ছে ততদিন সোহিনী পারবে না সৈকতের হাতে নিজেকে বিলিয়ে দিতে। ঠিক এমন ভাবনার মাঝে সৈকত এই প্রস্তাব দিল। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। পুরুষের প্রতি জন্ম নিচ্ছে ঘৃনার পাহাড়।

ফোনটা বেজে উঠল, সৈকত কলিং। নিমেষেই সোহিনীর সব দুঃখ উবে গেল।
ফোনটা রিসিভ করেই বলল, ‘আমি জানতাম তুই মজা করছিস। আমার সৈকত এমন হতে পারে না।’

তুই তোর ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে থাক। সৈকত ফোনের ও প্রান্ত থেকে দৃঢ়হ ভাবে বলল। আমি যেটা চাই সেটাই চাই। তুই শুধু বল কবে আসতে পারবি। তারপর বাকিটা আমার উপর ছেড়েদে। ছি সৈকত ছি! তুই ও শেষ পর্যন্ত এমন করতে পারলি?

অনেক ভাবনা চিন্তা করে সোহিনী স্থির করলো সে যাবে। সৈকতকে  দিন ক্ষন সময় জানিয়ে দিয়ে ফোনটা কেটে দিল। নিজের সাথে শুরু হলো যুদ্ধ। হাতে আর মাত্র দু’টো দিন। সোহিনী নিজেকে প্রস্তুত করল। এসপার-ওসপার কিছু একটা করবেই সে। হয় তার সম্মান থাকবে নয় সৈকত। তাকে তো বাঁচতে হবে তার সন্তানের জন্য। কিন্তু বার বার তার সাথেই কেন এমন হবে? কেন নারীকে হতে হবে ভোগ‍্য? না সে আর মানতে পারছে না। এত অনুরোধ করা সত্ত্বেও সৈকত এমন জেদ কেন করছে? ওকে তো দাম দিতেই হবে।

সৈকতের প্রিয় পানীয় স্কচ। জীবনে প্রথম সোহিনী নিজে দোকানে গিয়ে স্কচ কিনল। আর সাথে কয়েক পাতা ঘুমের ওযুধ। 
সৈকতের পাঠানো ঠিকানায় সঠিক সময়ে পৌঁছাতে সোহিনী একটু ও দেরি করলনা।

সেখানে গিয়ে সোহিনী একটু অবাক হলো। এটা তো কোনো নামী দামী হোটেল নয়। একটা সাধারণ দোতলা বাড়ি। ও কি ভুল জায়গায় এসে পড়ল। একটু ঘাবড়ে গেল। ভিতর ঢুকতে ইতস্তত করছে এমন সময় একজন অচেনা ভদ্রমহিলা এসে তাকে সৈকতের কথা বলেই ভিতরে নিয়ে গেলেন। বয়স পঞ্চাশ উর্দ্ধে। অতি ভদ্র ব‍্যবহার। কথা শুনে সোহিনীর মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সৈকতকে তো দেখা যাচ্ছে না। কাঁধের ব‍্যাগটা চেপে ধরে সোফার এক কোনায় জড়ো সড়ো হয়ে বসে ব‍্যাগের ভিতরটা আরো একবার পরখ করে  নিল। তকতকে ছুরি আর ছোট্ট নাইলনের দড়ি ঠিকঠাক আছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

সৈকত এখনো এলোনা। ও কি বুঝে গেছে আমার উদ্দেশ্য। ঠিক যেমন আমার না বলা কষ্ট গুলো কত সহজে বুঝে যেত।  আমার গলার স্বর শুনে ও বলে দিতে পারত আমার মনের সুখ দুঃখের কথা। আমার না খেয়ে থাকার কথা। না না সেটা কি করে সম্ভব। এই দু’দিনে আমি তো ওর সাথে একটাও কথা বলিনি।

প্রায় একঘন্টা পরে সৈকত ফিরলো একা নয় সাথে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে। বন্ধুদের চাল-চলন কথা বার্তা ও ঠিক লাগছে না। সোহিনীর চোখে সন্দেহ ঘনিভুত হচ্ছে। প্রচন্ড ঘৃনায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন অবস্থায় সোহিনী কিছুই করতে পারবে না। পুরুষ মানুষ কি শুধু পুরুষ তারা কি মানুষ নয়?

না না আর এক মিনিট ও সময় নষ্ট করবে না সোহিনী। যেমন করেই হোক তাকে এখান থেকে বের হতেই হবে। সে উঠে দাঁড়ালো। পা বাড়ালো বাইরে বের হওয়ার জন্য। আর ঠিক তখন দেখতে পেল সেই ভদ্র মহিলাকে।
যে তাকে এই বাড়িতে ঢুকতে সাহায্য করে ছিল। পুরো দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে। কিভাবে বের হবে এই নরক পুরি থেকে? 
মুহুর্তে সোহিনীর সব চিন্তা শক্তি লোপ পেল। সে ব‍্যাগ থেকে ছুরিটা বের করলো । ভাবছে ভদ্রমহিলার পিঠে বসিয়ে দিয়ে সে পালিয়ে যাবে সোজা থানায়।

ঠিক সেই মুহূর্তে সৈকত ঝাঁপিয়ে পড়ে সোহিনীর হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে বলল কি করছিস, তুই কি পাগল হয়ে গেলি?

যে মানুষ টা তোকে আশির্বাদ করবেন বলে দুদিন ধরে আহার নিদ্রা ত‍্যাগ করেছেন। তুই কিনা তাকেই খুন করতে যাচ্ছিস?
এতক্ষণে সোহিনীর সব সন্দেহের অবসান ঘটল। লজ্জায় অবনত মস্তকে সে সৈকতের পিসিকে প্রনাম করল।  
ইতিমধ্যে আরো অনেকে এসে গেল হৈহৈ করে সোহিনী আর সৈকতের আশীর্বাদের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলো। একটা হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো।

সোহিনী নিজের হটকারীতার জন্য প্রচন্ড অনুতপ্ত। সৈকত তাকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করলো। পুরুষ মানুষের প্রতি যে ধারণা তার জন্মে ছিলে তার অবসান ঘটলো। সোহিনী অনুভব করলো সব পুরুষ শুধু পুরুষ নয়, কিছু পুরুষ মানুষও বটে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড