• রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘অদ্ভুত নিয়তি’-এর ১৩ তম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : অদ্ভুত নিয়তি

  রিফাত হোসেন

০৯ আগস্ট ২০১৯, ১৬:৩১
উপন্যাস
ছবি : প্রতীকী

জ্যোতি মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। আদিত্য প্যাকেটটা খুলে পাঞ্জাবি বের করল৷ বিস্ময়কর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পাঞ্জাবির দিকে। তারপর বলল, ‘আকাশী রঙের পাঞ্জাবি। একদম জ্যোতির শাড়ির রঙের মতো। শুভ ভাই কী সত্যিই সবার জন্য সেইম রঙের ড্রেস কিনেছে? নাকি এর পিছনে অন্য কোনো কাহিনী আছে। ইরা কী রঙের ড্রেস পড়েছে আজ, সেটা দেখলেই বুঝতে পারব আসল কাহিনিটা।’

আদিত্য আর দেরি না করে পাঞ্জাবিটা পড়ে নিলো। এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

বাইরে এসে ইরাকে পেলো না আদিত্য। জ্যোতিকেও না। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা ঘরে গেল। ওই ঘরে গিয়ে দেখল ইরা আর জ্যোতি সহ আরো অনেকেই আছে। আদিত্য ইরার দিকে তাকালো৷ ইরার পরনে খয়েরী রঙের একটা শাড়ি। ইরার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আদিত্য মনে মনে বলল, ‘জ্যোতিকে ঠিক যতটা আকর্ষণীয় লেগেছে, ইরাকে ঠিক ততটা লাগছে না। ইরা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না আজ৷ অবশ্য ওকে আগেও শাড়ি পরা অবস্থায় দেখেছি আমি। তাই হয়তো আজকে খুব একটা আকর্ষণীয় লাগছে না ওকে। শাড়ি পরে অন্য দিনের থেকে আলাদাও লাগছে না ওকে৷ জ্যোতিকে আজকে অদ্ভুত সুন্দরী লাগছে। মনে হয়েছে নতুন এক জ্যোতিকে দেখেছি আজকে। হয়তো শাড়ি পরা অবস্থায় জ্যোতিকে প্রথম দেখেছি বলে এমনটা মনে হয়েছে।’

আদিত্য আবার ইরার দিকে তাকাল। ওর পরনে খয়েরী রঙের শাড়ি৷ কপালে ছোট টিপ। ইরা কখনোই এত ছোট টিপ পরে না। হয়তো জ্যোতির কাছ থেকে নিয়েছে আজ। মুখে একগাদা মেকআপ। এটা ইরার পুরো অভ্যেস। যেখানেই যাক না কেন?  সবসময় মুখভর্তি মেকআপ থাকবেই। ঠোঁটে লিপস্টিক। চুলগুলো বয়স্ক মহিলাদের মতো করে খোপা করে রেখেছে। ইরাকে আজ কেমন বুড়ী বুড়ী লাগছে৷

ফিক করে হেসে দিলো আদিত্য। জ্যোতি ওর পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর একটু উঁচু হয়ে আদিত্যর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘পাগলের মতো একা একা হাসছেন কেন?’

জ্যোতির কথার উত্তর না দিয়ে আদিত্য বলল, ‘পাঞ্জাবিটা আপনি দিয়েছেন, তাই না?’

জ্যোতি মাথা নেড়ে হ্যাঁ ইশারা করল। আদিত্য আবার বলল, ‘ইচ্ছে করেই আপনার শাড়ির রঙের মতো একি রঙের পাঞ্জাবি দিয়েছেন আমাকে?’

জ্যোতি আবারও মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। আদিত্য বলল, ‘কিন্তু কেন?’

- কারণ সবার দৃষ্টি যেন আমাদের দিকে থাকে। আমরা যখন একসাথে হাঁটবো, তখন সবাই ভাববে আমাদের মাঝে একটা গভীর সম্পর্ক আছে৷ কিছু একটা চলছে আমাদের দু'জনের মধ্যে।

আদিত্য অবাক কণ্ঠে বলল, ‘কী বলছেন এইসব?’

- আরে এগুলো হলো প্রেমের একেকটা ধাপ। যা দু'জনে মিলে অতিক্রম করতে হবে। আপনার মতো গাধা এইসব বুঝবে না।

জ্যোতি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঘর থেকে বাইরে চলে গেল। আদিত্য  ইরার দিকে তাকিয়ে দেখে ইরার দৃষ্টি ওদের দিকে। মাথা চুলকাতে-চুলকাতে বলল, ‘বুঝলাম না। জ্যোতি কী মজা করার জন্য ইরাকে শুনিয়ে শুনিয়ে এইসব বলল? নাকি সিরিয়াসলি কথাগুলো বলল। এই মেয়ের মতিগতি তো সাংঘাতিক থেকে আরো সাংঘাতিক হচ্ছে।’

শুভর কথায় ভাবনায় ছেদ পড়ল আদিত্যর। শুভ বলল, ‘তোরা রেডি তো? এবার কিন্তু বেরোতে হবে।  নাহলে রাতে আবার লঞ্চ ধরতে পারব না।’

- হ্যাঁ, আমরা রেডি।

অতঃপর সবাই মিলে সুমাইয়াদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। খুব বেশি দূরে না হওয়ায় তাড়াতাড়ি ওই বাড়িতে পৌঁছে গেল সবাই। খাওয়া- দাওয়া শেষে শুভকে একটা রুমে বসিয়ে দিয়ে বাইরে এলো আদিত্য। কিছুক্ষণ পর জ্যোতি আর ইরা এলো ওর কাছে। চারিদিকে মানুষজন। ইরা পিছনে, জ্যোতি আর আদিত্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে জ্যোতি আদিত্যর একটা হাত চেপে ধরল। সাথে সাথে চকমে উঠল আদিত্য। কৌতূহলী দৃষ্টিতে জ্যোতির দিকে তাকাল। জ্যোতি কিছু বলছে না বলে আদিত্য আর কিছু বলল না। সেভাবেই হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে আদিত্য চেষ্টা করছে হাত ছাড়ানোর। কিন্তু পারছে না ও। জ্যোতি শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। আর আদিত্যও তেমন জোর করছে না মানুষ উল্টো পাল্টা ভাববে বলে৷ বেশ কিছুক্ষণ পরও যখন জ্যোতি ওর হাত ছাড়ছিল না। তখন এক প্রকাশ বিরক্ত হয়ে আদিত্য কড়া কণ্ঠে বলল, ‘এইসব কী হচ্ছে জ্যোতি? আমাকে ধরে রেখেছেন কেন? সবাই কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে দেখুন।’ 

জ্যোতি কিছু বলল না। হাঁটতে হাঁটতে আবার ঘরে চলে গেল। বিছানায় পাশাপাশি বসে আছে সুমাইয়া আর শুভ। জ্যোতি আদিত্যর হাত এভাবে ধরে রেখেছে তা চোখ এড়ায়নি সুমাইয়ার। ও কৌতূহলী কণ্ঠে বলল, ‘কিরে জ্যোতি, এভাবে উনার হাত ধরে রেখেছিস কেন?’

জ্যোতি ভ্রু-কুঁচকে বলল, ‘হিংসে হয়?’

সুমাইয়া বলল, ‘হিংসে হবে কেন?’

- এইসব ছোটখাটো কাজ এই জ্যোতি বিয়ের আগেই সেড়ে নেয়। তাই ভাবলাম হয়তো হিংসে হচ্ছে তোমার।

সুমাইয়া শুভর দিকে তাকালো। সে বেচারা চুপচাপ অসহায়ের মতো  বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে ওকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুমাইয়া বলল, ‘কী আবোলতাবোল বলছিস জ্যোতি? এখানে গুরুজনেরা আছেন দেখছিস না।’

- আরে আমি কী এমন বললাম? তুমি যখন ভাইয়ার হাত ধর, তখন তো আমি কিছু বলি না। তাহলে আমি উনার হাত ধরে রেখেছি বলে তুমি আমাকে বকছ কেন?

সুমাইয়া রাগী দৃষ্টিতে জ্যোতির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জ্যোতি হেসে দিয়ে বলল, ‘আরে রেগে যাচ্ছ কেন ভাবী? আমি তো মজা করছিলাম। ভাইয়ার বিয়ে, এইটুকু মজা না করলে কীভাবে হবে বল?’

সুমাইয়া এবারও কিছু বলল না। তবে চোখদুটো নামিয়ে নিয়ে মুচকি হাসি দিলো। কাজী সাহেবকে ইশারায় বলল, বিয়ের কাজ শুরু করতে।

আদিত্য জ্যোতির হাত ধরে বাইরে আসল। তারপর রাগী কণ্ঠে বলল, ‘সবসময় ফাজলামি ভালো না জ্যোতি। আমি আপনার বড়। ধরতে গেলে প্রায় আপনার ভাইয়ের সমবয়সী। সবসময় আপনি আমার সাথে ফাজলামি করবেন না। আমার এখন ইচ্ছে করছে আপনাকে একটা থাপ্পড় মারতে। আপনার নাহয় নিজের গ্রাম এটা। সবাই পরিচিত। তাই যাই বলেন না কেন? কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি তো অন্য জায়গা থেকে এসেছি, আমার তো সম্মান বলে কিছু একটা আছে নাকি? সাধারণ জ্ঞানটুকু আপনি মাঝে মাঝে হারিয়ে ফেলেন জ্যোতি। গ্রামের মানুষদের কথা বাদই দিলাম। কারণ আমি একটু পর চলে গেলে তারা সব ভুলে যাবে। কিন্তু শুভ ভাই আর উনার স্ত্রী। উনারা তো আমাকে আবারও দেখবে। শুভ ভাই আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আমাকে ছোট ভাই হিসেবে খুব স্নেহ করে। আপনার এইসব কর্মকাণ্ডে উনার মনে আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হবে। ভাবী আমাকে একেবারেই চিনে না। সে হয়তো ভেবেই নিয়েছে আপনার আর আমার মাঝে কিছু একটা আছে৷ হয়তো মনে মনে ভাবছে আমাকে আশ্রয় দিয়ে তারা ভুল করেছে৷ তাদের আশ্রয়ে থেকে আমি তাদেরই বোনের দিকে নজর দিয়েছি৷ কতটা খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তাদের মনে আপনি ভাবতে পারছেন৷ আপনাকে প্রশ্রয় দিয়ে আমি ভুল করেছিলাম।  আপনাকে অনুরোধ করছি, এখন থেকে আপনি আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন। তাছাড়া ঢাকায় ফিরে আমি আপনাদের থেকে আলাদা হয়ে যাবো।’

জ্যোতি কিছু বলল না। হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মাথা নিচু করে চলে গেল। আদিত্য পিছনে তাকিয়ে দেখে ইরা দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ওদের সব কথা শুনেছে। আদিত্য চলে যেতে চাইলে ইরা বলল, ‘ওইভাবে না বললেও পারতে। শুধু শুধু মেয়েটাকে কাঁদালে।’

- সবটা নিশ্চয়ই শুনেছে। তাহলে তুমি একবার ভেবে দেখো, ও যা করছে তা কী ঠিক? শুভ ভাইয়ের আশ্রয়ে থেকে আমি কীভাবে উনার বোনের সাথে এভাবে চলাফেরা করব। জ্যোতির পাগলামি দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। আর এইসব দেখে শুভ ভাই আর সুমাইয়া ভাবীর মনে তৈরি হচ্ছে আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা।

- তোমাকে কে বলেছে, জ্যোতি পাগলামি করছে৷ ও তোমাকে আরো অনেক আগে থেকেই পছন্দ করে।

আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর বলল, ‘বিয়ের কাজ শেষ হলে শুভ ভাইকে বলো আমি বাইরের দিকে আছি।’

- উল্টো দিকে যেও না। তোমার কাছে তো আবার ফোন নেই। খুঁজতে সমস্যা হবে।

- সামনের দিকেই যাবো। শুভ ভাইদের বাড়িতে যাওয়ার পথেই আমাকে পাবে।

- আচ্ছা।

বিয়ের কাজ শেষ হলে শুভ আদিত্য আর জ্যোতিকে খুঁজতে থাকে। ওর মাথায় একরাশ চিন্তা ভর করেছে।  এদিক ওদিক অনেক জায়গায় খুঁজেও পাচ্ছিল না ওদের দু'জনকে। তখন ইরা এসে বলল, ‘আদিত্য সামনেই আছে। আমাকে বলে গেছে ও। কিন্তু জ্যোতি কোথায় গেছে তা আমি সঠিক জানি না। প্রায় অনেকক্ষণ আগে থেকে ওকে দেখছি না। আমি ভেবেছিলাম তুমি কোনো কাজে পাঠিয়েছো ওকে। তাই এখানে নেই৷ কিন্তু এখন তো দেখছি তুমিও ওর খোঁজ জানো না।’

- আদিত্য নিশ্চয়ই জানবে জ্যোতি কোথায় আছে? কারণ ওর সাথেই ঘর থেকে বের হয়েছিল জ্যোতি। চল তাহলে আদিত্যর ওখানেই যাই।

ইরা শুভকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আদিত্য জানে না জ্যোতি কোথায় আছে। কারণ আমরা যখন এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন আদিত্য বাইরের দিকে যায়, আর জ্যোতি ভিতরের দিকে চলে আসে। আমি এখানেই ছিলাম এতক্ষণ। জ্যোতি বাইরের দিকে গেলে অবশ্যই আমার নরজে পরত।

শুভর কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছে। পুরো বাড়ি খুঁজেও যখন জ্যোতিকে পাওয়া গেল না, তখন নিশ্চয়ই সবার চোখের আড়ালে বাইরে চলে গেছে ও। শুভ বলল, ‘তুই আমার সাথে আয় ইরা। বাইরেটা একটু খুঁজে আসি।’

পিছন থেকে সুমাইয়া বলল, ‘আমি কি আসবো তোমাদের সাথে?’

- না। তুমি তোমার বাবা-মায়ের কাছে থাকো এখন। তাদের সাথে কথা বল।

- আচ্ছা।

শুভ আর ইরা বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত হয়ে গেছে প্রায়। গ্রামের রাস্তা, তার উপর চারিদিক অন্ধকার। মোবাইল বের করে লাইট জ্বালিয়ে হাঁটতে লাগল শুভ আর ইরা৷ কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখল আদিত্য গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ ওর কাছে গিয়ে বলল, ‘এই রাতেরবেলা তুই এখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’

আদিত্য অপ্রস্তুত স্বরে বলল, ‘না মানে, ভালো লাগছিল না। আর এখানে ঠাণ্ডা বাতাস আছে, তাই দাঁড়িয়ে আছি । বিয়ের কাজ তো শেষ নিশ্চয়ই। কিন্তু শুধু আপনার কেন? ভাবী সহ বাকি লোকেরা কোথায়?’

- জ্যোতি কোথায় জানিস তুই?

বেশ অবাক হলো আদিত্য। জ্যোতির কথা ওকে জিজ্ঞেস করছে কেন বুঝতে পারছে না। তাছাড়া জ্যোতি তো তখন ভিতরের ঘরের দিকেই গেল। আদিত্যকে চুপ থাকতে দেখে শুভ আবার বলল, ‘কী হলো চুপ করে আছিস কেন?’

- আমি কীভাবে জানবো জ্যোতি কোথায়? ওকে তো আমি শেষ দেখেছি আপনাদের বিয়ে যেখানে পড়াচ্ছিল, সেখানে। তারপর তো আমি এখানে চলে আসি।

- সুমাইয়াদের পুরো বাড়ি খুঁজে দেখেছি আমি। কোত্থাও নেই ও। আচ্ছা ও কী আমাদের বাড়িতে চলে গেছে তাহলে?

- এটা প্রায় অসম্ভব। কারণ আপনাদের বাড়িতে যাওয়ার এই একটাই রাস্তা যা দেখলাম আমি। আর সন্ধ্যার আগে থেকে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। সুতরাং ও বাড়িতে যায়নি আমি শিওর।

- তাহলে কোথায় গেল জ্যোতি?

- তখন ওকে নিয়ে আমি ঘর থেকে বাইরে আসি। ওর ফাজলামির জন্য আপনারা সবাই গুরুজনদের সামনে বারবার অপ্রস্তুত হচ্ছিলেন। তাই আমি একটু ধমক দিয়ে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করি। এরপরই ও মাথা নিচু করে ভিতরের দিকে চলে গেছে। তারপর আর দেখা হয়নি আমাদের।

শুভ হাটু গেড়ে বসে পড়ল রাস্তায়। আদিত্য ওর হাত চেপে ধরে বলল, ‘একটু শান্ত হন ভাই। আশেপাশে কোথাও আছে নিশ্চয়ই। একটা মানুষ তো আর এভাবে উধাও হয়ে যেতে পারে না। ভালো করে খুঁজলেই পাওয়া যাবে।’

শুভ কেঁদে দিলো। আদিত্যর হাত শক্ত করে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছে, ‘ওর জেদ সম্পর্কে তোরা কেউ কিছু জানিস না। এই জেদের কারণে অনেক সময় অনেকের সাথেই ওর ঝামেলা হয়েছে। গ্রামে কয়েকটা বখাটে ছেলে আছে। ওদের মধ্যে একজন জ্যোতিকে খারাপ ভাষায় কি যেন বলেছিল। আর জ্যোতি রেগে গিয়ে সেদিনই ওর সব বান্ধুবীদের নিয়ে ওকে ইচ্ছেমতো মারধোর করে। আমার খুব ভয় হচ্ছে আদিত্য। বারবার মনে হচ্ছে ওই ছেলেটাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জ্যোতির কোনো ক্ষতি করেছে। জ্যোতি আমার একমাত্র বোন। আমার জীবনের সবটুকু আদর, ভালোবাসা, স্নেহ দিয়ে ওকে বড় করে তুলেছি আমি। ওর কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে ঠিক রাখবে পারব। আমার বোন আমার নিশ্বাস। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনি আমার বোনের কিছু হলে আমি বাঁচব না।’

ভয় যে আদিত্যর করছে না, ঠিক তা না। ও নিজেও খুব ভয়ে আছে। একবার মনে হচ্ছে ওই ছেলেটাই জ্যোতির কোনো ক্ষতি করেছে। আবার মনে হচ্ছে ওর রাগী গলায় বলা কথাগুলো শুনে জ্যোতি খুব কষ্ট পেয়েছে। তাই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজেই নিজের কোনো ক্ষতি করেছে। আদিত্যর গলা ক্রমশ শুকিয়ে আসছে। ভয়টা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। 

ইরা বলল, ‘নদীর ওদিকে যায়নি তো জ্যোতি?’

শুভ কান্নাস্বরে বলল, ‘সেইরকম কোনো সম্ভবনাই নেই। কারণ, সন্ধ্যার পর নদীর ওদিকে কেউই যায় না।’

- এমনও হতে পারে অভিমান করে ওদিকে চলে গেছে। আমাদের উচিত একবার গিয়ে খোঁজ নেওয়া।

শুভ ওঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে।’

তিনজন মিলে আমার নদীর পাড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নদীর পাড়ে চলে গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে পেলো না ওরা। পুরো নদীর পাড় ফাঁকা। কোথাও কোনো মানুষজন নেই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখলো দু'জন লোক লাইট হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। লোক দু'টো এখানকার পাহারাদার। ইরা ওদের কাছে গিয়ে জ্যোতির একটা ছবি দেখিয়ে বলল, ‘এই মেয়েটিকে এখানে দেখেছেন আপনারা?’

লোক দু'টো ছবিটির দিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘না। সন্ধ্যার পর এখানে আর কাউকেই দেখিনি আমরা।’

অতঃপর সেখান থেকেও চলে আসল ইরা, শুভ আর আদিত্য। শুভ আর ইরা অনবরত কেঁদেই চলেছে। আদিত্য কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। নিজের ভিতর অপরাধবোধ কাজ করছে। খুব অনুশোচনা হচ্ছে জ্যোতির প্রতি তখনকার ওই অমানবিক ব্যবহারের জন্য। অতটা কড়া করে না বললেও হতো। ও তো আর বাচ্চা মেয়ে নয়। ঠিক ভাবে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝত।

ইরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমার উচিত ছিল ওকে আগলে রাখা। সেই কলেজ লাইফ থেকে ওকে আগলে রেখেছি আমি। অনেকবার বলেছি আমার সাথে আমার বাড়িতে থাকতে। কিন্তু না। সে হোস্টেলেই থাকবে। তবুও আমি হোস্টেলের সিনিয়র আপুদের অনুরোধ করে বলেছি ওর একটু খেয়াল রাখতে। আর কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাতে৷ ক্যাম্পাসে কোনো ঝামেলা হলে আমি ওকে হোস্টেল থেকে ক্লাসে নিয়ে আসতাম। আবার হোস্টেকে দিয়ে আসতাম। এত বছর ধরে ওকে আগলে রেখেছি, কোনো সমস্যা হয়নি। অথচ আজ নিজের গ্রামে এসে মেয়েটা উধাও হয়ে গেল। আমার উচিত ছিল ওর সাথে সাথে থাকা।’

শুভ কোনো উত্তর দিলো না। অনবরত কেঁদে যাচ্ছে শুধু। এত বছরের জমিয়ে রাখা কান্না বাধ ভেঙে আজ চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ওর। হতাশ হয়ে সুমাইয়াদের বাড়িতে ফিরল। ওকে কোথাও পাওয়া যায়নি বলে সুমাইয়া সহ জ্যোতির বাবা-ও কাঁদতে শুরু করল। পুরো বিয়ে বাড়িটা হুট করেই থমথমে পরিবেশ হয়ে গেল। সবার চোখে জল ছলছল করছে। ভয়ঙ্কর এক আতঙ্ক বিরাজ করছে সবার মনে৷ হয়তো এক্ষুনি কে এসে খারাপ একটা খবর দিয়ে যাবে। কেউ এসে বলবে জ্যোতির লাশটা ওখানে পড়ে আছে। অথবা এটা বলবে কয়েকটা মানুষ রূপি জানোয়ার ওর জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে৷ ওকে খুবলে খেয়েছে ওরা।  কিংবা সে নিজেই নিজের জীবন ত্যাগ করেছে। এইসব ভাবতে গিয়েও আতঙ্কে উঠছে সবাই।

(চলবে...)
আরো পড়ুন ‘অদ্ভুত নিয়তি’-এর ১২ম পর্ব -
ধারাবাহিক উপন্যাস : অদ্ভুত নিয়তি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড