• শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : মাংসের ঈদ

  কাজী সাবরিনা তাবাস্সুম

০৯ আগস্ট ২০১৯, ১২:৩৯
গল্প
ছবি : প্রতীকী

রুবার বিয়ের গল্প অনেকটা লটারির টিকেট জেতার মত! নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সে। অন্য  দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতই তাদের পরিবারে অভাব ছিল কিন্তু সুখের কমতি ছিলনা। বাবা একটা সরকারি সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কেরানীর চাকরি করেন। এক মাসে বেতন হয় তো পরের তিন মাসে বেতনের চেহারা দেখা যায় না! বাঙলা সিনেমার মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবি যেমন, রুবাদের বাসার স্থিরচিত্র ঠিক তেমন। তার মাকে আশপাশের আন্টিরা কুসুম আপা ডাকে। কুসুম আপা হলো এযুগের সেলাই দিদিমনি। ভাগ্যিস বিয়ের পরে কোন এক অজানা কারণে বাবা সেলাই মেশিন কিনেছিল। সেই সেলাই মেশিনের খটখট শব্দ ছাড়া রুবাদের বাসার কারো ঘুম হয়না। বাবার বেতন না পেলেও মা কিভাবে যেন দুই চারটা জামা ব্লাউজ সেলাই করে ভাতের বন্দোবস্ত করেই ফেলেন । তাই রুবা অনেক রকম সমস্যা দেখলেও খাবারের অভাব কখনো দেখেনি। অন্তত আলু ভর্তা ডাল ভাত নামক বেহেশতি খানা তাদের বাসায় ছিল। 

সেই রুবা আজ এমন এক বাড়ীর বউ, যেখানে কাজের লোক কয়জন রুবা তাও জানেনা। কার কি ডিউটি, কে রান্নার দায়িত্বে আর কে ঘরের বিছানা গোছানোর দায়িত্বে, তা রুবা গত সাত মাসেও বুঝে উঠতে পারেনি। তার বিয়ের বয়স সাত মাস। বলা যায় এই সাত মাস ধরে সে মহা সুখেই আছে। হিন্দি সিরিয়ালে যেমন দেখায়, গরীব ঘরের মেয়ের রাজার বাড়িতে বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটি তার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারেনা। সাত সকালে উঠে রাজবাড়ির বাবুর্চির সাথে চা নাস্তা তৈরি করতে শুরু করে অবচেতন মনেই! রুবার জীবনে এমন কিছু ঘটেনি। বিয়ের দিন রাতেই তার শাশুড়ি বলেছে আজ থেকে তুমি এই বাড়ির  রানী! রুবা সত্যিই রানীর মতই আছে। তার করার কিছু থাকেনা, এই নিয়ে সে আফসোসও করেনা। বলা যায় গত সাত মাস ধরে বড়লোকি উপভোগ করতে তার খুবই ভাল লাগছে। শুধু তার শ্বশুড়বাড়ির একটাই সমস্যা, তারা রুবার বাপের বাড়ি যাওয়া পছন্দ করেনা। রুবাকে অবশ্য মুখের ওপর কিছু বলেনি। কিন্তু এই কিছু না বলাটাই রুবা খুব ভাল মত বুঝে নিয়েছে। সত্যি কথা বলতে এইসব শান-শওকতে রুবারও খুব একটা বাপের বাড়ি যেতে মন চায়না। এখন সবার হাতে হাতে ফোন । মন চাইলেই কথা বলা যায়। বাপের বাড়ি গিয়ে বসে থাকার প্রয়োজন রুবা খুব একটা বোধ করেনা। 
চার ভাইবোনের সংসারে রুবা বড়। তার বিয়ের গল্পটা সুন্দর, সিনেমাটিক। 

তার  শ্বশুর জনাব আল মামুন মস্ত ব্যবসায়ী। ব্যাবসার কি একটা প্রচারে তিনি রুবার বাবার সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে যান। মফস্বল এলাকায় ঢাকা থেকে বিশেষ কোন ব্যক্তি গেলে তাকে স্কুল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করতে হয়। সেই ফলশ্রুতিতে  মামুন সাহেবের জন্য এলাকার কলেজে একটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে মামুন সাহেবের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেওয়ার দায়িত্ব থাকে রুবার ওপর। ফুলের তোড়া গ্রহণ করে হাসিমুখে ছবি তুলে রুবার সাথে সৌজন্যমূলক করমর্দন করতে গিয়ে রুবার দিকে চোখ যায় মামুন সাহেবের। মুহূর্তে তাঁর হৃদয় তোলপাড় হয়ে যায়। কেউ কে কিছু বলতে পারেননি তিনি। সেই অনুষ্ঠানেও মনোযোগ দিতে পারেননি। শুধু দায়িত্বটুকু পালন করে সেই রাতেই ঢাকা ফিরে যান। তিনদিন পর তিনি এবং মিসেস মামুন রুবাদের বাড়ি এসে হাজির! মামুন সাহেবের সেদিনের কথাগুলো আসলে নাটক সিনেমাকেও হার মানায়! তিনি রুবার বাবার হাত ধরে বলেছিলেন, রুবা নাকি দেখতে মামুন সাহেবের মায়ের মত! যদিও এটা শুনতে খুবই অবিশ্বাস্য, কিন্তু মামুন সাহেব তাঁর কথায় অটল এবং নিশ্চিত।  বিশ বছর আগে মামুন সাহেব তাঁর মা কে হারান। আজ অবিকল মায়ের চেহারার মেয়ে পেয়ে তিনি ছাড়তে চাননা! 
তিনি তাঁর বৌমা করে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যেতে চান! 

একই রকম প্রস্তাব রুবার বাবার জায়গায় থাকা যেকোন বাঙালী বাবা অগ্রাহ্য করতে পারতেন না। রুবার বাবাও পারেননি। অতঃপর স্বপ্নের মতো মফস্বল শহরের রুবা হীরে মুক্তো জহরতে লাল পরী সেজে হয়ে গেল ঢাকা শহরের মস্ত বড় বনেদী পরিবারের বউ!

আজ বিয়ের সাত মাস পরেও রুবার কাছে সবকিছু নতুন মনে হয়। স্বপ্ন মনে হয়। আল মামুন সাহেব, তার স্ত্রী এবং রুবার স্বামী যে রুবাকে প্রচণ্ড ভালবাসে। তার বিয়ে ঠিকঠাক হবার পর পাড়া প্রতিবেশী ফোড়ন কেটেছিল, এত ধনী পরিবারের সাথে এত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্বন্ধ করা ঠিক হচ্ছেনা। এই বনেদী পরিবার রুবার সাথে খারাপ আচরণ করবে, হয়তো অনেক বড় মাত্রার যৌতুকও চেয়ে বসবে। সত্যি কথা বলতে এইরকম ভয় রুবার বাবা মায়ের মধ্যেও ছিল! অনেকটা ভয়ে ভয়েই রুবাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মামুন সাহেব এবং তার পরিবার আজ পর্যন্ত রুবার বাবার কাছে একটা সূতাও চায়নি। আর রুবার সাথে খারাপ ব্যবহার করা তো কল্পনার বাহিরে। এই যে সামনে কুরবানী ঈদ, যার কারণে রুবার শ্বশুড়বাড়ি ‘মামুন প্যালেস’ - এ বিশাল হৈ চৈ! কই রুবাকে তো কেউ কোন কাজ করতেই বলেনা! রুবা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে মামুন প্যালেসের কাণ্ড কারখানা দেখে! কুরবানী ইদের জন্য যে এমন এলাহী প্রস্তুতি হতে পারে তা রুবা চিন্তাই করতে পারেনা! ইদের বাকি এখনো আটদিন। এই বাড়িতে বিশাল একটা সাদা রঙের গরু কেনা হয়ে গিয়েছে। গরুর দাম শুনে তো রুবার আক্কেল গুড়ুম! কিন্তু এই নাকি শুরু, কেনা হবে আরো গরু। শুধু তাই নয়, ছাগল এবং উটও নাকি কেনা হবে! রুবার দেখতে বেশ মজাই লাগে! মামুন প্যালেসের পেছনে বেশ বড় খোলা জায়গায় বেঁধে রাখা হচ্ছে গরুকে। গরু ছাগলের যত্ন করার জন্য চাকর বাকরও নিযুক্ত করা হয়ে গিয়েছে। রুবা ভেবে পায়না, এত মাংস খাবে কে? 

তবে এই চিন্তার অবসান হতে চললো বৈকি! মামুন প্যালেসের ম্যানেজারকে সে দেখেছে লিস্ট তৈরী করতে। কার কার বাড়িতে মাংস যাবে সেই লিস্ট। সব নামগুলো সমাজের বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, অমুক, তমুক, শেষ নেই। রুবার পুরো লিস্ট দেখার ইচ্ছে রইলো না। বিয়ের পর থেকেই তার স্বভাবে এই ব্যাপারটা লক্ষণীয়। কোন বিষয়েই সে খুব একটা মনোযোগ রাখতে পারেনা। তার মন খুব  অস্থির। গরু বিষয়ক উত্তেজনাও হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল! 

ইদের বাকি আর মাত্র তিন দিন। রুবা বসে আছে তার স্বামী আসাদ আল মামুনের সাথে। আসাদ মানুষটা খুব ভাল। কিন্তু বাবার ব্যবসায় এত ব্যস্ত  থাকে যে বিয়ের সাত মাস পরেও রুবার সাথে সেভাবে কোন সুন্দর সময়ই কাটাতে পারেনি। সে যা হোক, কথা প্রসঙ্গে আসাদ রুবাকে বললো, ‘তোমার বাবার সাথে কথা হয়েছে? কেমন আছে সবাই? গরু কেনা হয়ে গিয়েছে?’
আসাদের শেষ প্রশ্নটা রুবার কানে কেমন যেন বাজলো। ‘সে বললো, গরু কেন কিনবে? গরু কেনেনাই তো!’
অল্পবয়সী রুবাকে আসাদের immatured মনে হয় । সে হেসে বললো, ‘কেন গরু কিনবে না কেন? তাহলে কি ছাগল কিনবে?’
রুবার খুব রাগ হলো! 
- কি আশ্চর্য! গরু ছাগল কিনবে কেন? আমার বাবা কি কুরবানীর হাট দিবে?
আসাদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো ! রুবার মাথায় একটা টোকা দিয়ে বললো, ‘আরে বুদ্ধু! কুরবানীর হাট দিবে কেন? কুরবানী  দিবে। আর কুরবানী দিতে হলে গরু ছাগল কিছু একটা কেনা লাগবে না? ইদের দিন যে মাংস খাও সেটা কই থেকে আসে শুনি?
রুবাকে একটুও বিচলিত মনে হলোনা! চট করে বললো, ‘কেন, বাজার থেকে আসে!’ 
আসাদ রুবার দিকে তাকিয়েই রইল। মনে মনে ভাবলো এই মেয়ে এত বোকা কেন? রুবার মন খারাপ হবে ভেবে কথা আর বাড়ায়নি। বললো, ‘বাবা কে ফোন করো। কেমন আছে খোঁজ খবর নাও। তোমার ভাইবোন দের জন্য ইদ উপহার পাঠাবো। ওদের কি পছন্দ জিজ্ঞেস করো। আর বাবাকে বলো গরুর ছবি পাঠাতে । আমি দেখবো।তুমিও দেখবে ....’
বলতে বলতেই আসাদের ফোন বাজলো। সে উঠে চলে গেল। 

রুবাও উঠে চলে গেল সেই বারান্দায়, যেখান থেকে তার শ্বশুড়ের কেনা গরু ছাগল উটগুলো দেখা যায়! রুবার মাথায় আসাদ অনেক গুলো প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিয়েছে। রুবা উত্তর খুঁজছে। তার বয়স উনিশ। গত আঠারো বছরে কোনদিন তার মনে পড়েনি যে গরু ছাগল কেনার মতো হৈ চৈ কিংবা উত্তেজনা তাদের বাসায় ছিল। হ্যাঁ, সে বান্ধবীদেরকে দেখেছে গরু ছাগল কেনা নিয়ে গল্প করতে। কিন্তু সেই গল্পে রুবা কোথায় ছিল? রুবার মনে পড়েনা। সে তো কখনো বোঝেইনি, কুরবানী ইদ মানে সবাই গরু ছাগল কুরবানী দেয়! তারা ভাইবোন শুধু জানতো কুরবানী ইদ মানে বাবা বাজার থেকে মাংস কিনে আনবে। মা সেই মাংস রান্না করবে। তারা ভাই বোন অধীর আগ্রহে বসে থাকতো কয়েক মাস পরে বাসায় রান্না হওয়া মাংস কে কেন্দ্র করে। তার বাবা মা কোনদিন তাদেরকে বুঝতে দেয়নি কুরবানী দেয়ার সামর্থ্য তাদের নেই! সন্তানের কাছে কুরবানী প্রসঙ্গটাই এড়িয়ে সন্তানকে ভালবাসার মাংস ভাত মুখে তুলে দেওয়া সেই বাবা মা হয়ত আজও দুই কেজি মাংস কেনার পরিকল্পনা আঁটছেন। আর এখানে রুবার শ্বশুড়বাড়িতে কুরবানীর পশুর প্রতিযেগীতা! 

রুবার ভাইবোনেরা আজও জানেনা কুরবানী ইদ আসলে কি? সারাজীবন ধরে যে উত্তেজনায় তার বাবা মা আর ভাইবোনেরা অংশ নিতে পারলোনা, সেই উত্তেজনায় শামিল হতে রুবার হঠাৎ খুব কষ্ট হল! এত এত গরু ছাগলের মাতামাতি ফেলে তার ইচ্ছে করলো ছুটে চলে যায় সেই মফস্বলে। যেখানের ছোট দুই রুমের কোয়ার্টারে তার মা সারারাত সেলাই মেশিনে খটখট শব্দে ঝড় তুলবেন । আর বাবা ইদের নামাজ শেষে দুই কেজি গরুর মাংস কিনে নিয়ে বাসায় ফিরবেন। রুবার কাছে এটা আসলে কুরবানী ইদ ছিলনা, এটা ছিল মাংসের ইদ! বাবা মায়ের ভালবাসা এবং কষ্ট দিয়ে কেনা মাংস! মধ্যবিত্ত হলেও আত্মসম্মান এবং আত্মমর্যাদা বোধের কারনে তার বাবা কোনদিন কারও কাছে মাংস চায়নি এবং নেয়নি। অথচ রুবা জানে, কারো যদি কুরবানী দেয়ার সামর্থ্য না থাকে, সে অন্য ব্যক্তি, যে কুরবানী দিয়েছে তার কাছ থেকে মাংস আনতে পারে। তাই আজ যখন এই বনেদী পরিবার থেকে মাংস বিতরনের লিস্ট হয়, তখন রুবা সেই লিস্ট খুঁজে বাবার নামটাও পায়! সে খুব সাবধানে বাবার নামটা কেটে দেয়। এই মাংস তার বাড়ি গেলেই ভাইবোনেরা জানতে পারবে কিসের মাংস। বাবাকে প্রশ্ন করবে। মাংসের ইদের সংজ্ঞা বদলে যাবে তাদের কাছে! রুবা তা চায়না, একদম চায়না। গত সাত মাসে রুবা যা বুঝতে পারেনি, আজ সাত মিনিটে সে কেমন করে যেন সব বুঝে গেল। হঠাৎ যেন সে বড় হয়ে উঠলো। বড় হওয়া এই রুবার খুব ছোটবেলায় ফিরে যেতে মন চাইল। সারারাত তার মা পাশের বাড়ির ভাবিদের ইদের জামা সেলাই করতে করতে পাগল হয়ে যেত! ভোরে ঘুম থেকে উঠে রুবা দেখতো তার বাবাও মায়ের সাথে হাত চালাচ্ছেন। জামায় বোতাম লাগিয়ে দিচ্ছেন, সুঁচে সূতা পরিয়ে  দিচ্ছেন! সেই হইচই, সেই ব্যস্ততা, সেই দুই কেজি মাংসের স্মৃতি রেখে বারান্দা দিয়ে বড় বড় গরু ছাগল দেখতে যে রুবার খুব কষ্ট হয়! মেয়েদের বিয়ে হয়, তারা এক বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়ি  যায়, কোন বাড়ির অভ্যাসগুলো গায়ে মাখাবে শুধু সেটাই বুঝতে পারেনা! 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড