• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ছোটগল্প : ভাঁটফুল

  হিমারিকা লিমা

১৬ মার্চ ২০২০, ০৯:১৩
গল্প
আমার শৈশব একাকীত্বে কাটলেও বিবর্ণ ছিল না (ছবি : হিমারিকা লিমা)

আজ বহুবছর পর মনে হলো,
বিশাল একটা ভুতুড়ে বাড়িতে বেড়ে উঠায় প্রকৃতিগত কিছু বাড়তি সুবিধে পেয়েছি আমি। আমার শৈশব একাকীত্বে কাটলেও বিবর্ণ ছিল না। বরং চারপাশটা ছিল অপার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। আজকাল মাঝেমাঝে ভাবতে ভালো লাগে, আমি এক বিশাল প্রকৃতির সাম্রাজ্যের একক অধিকারিণী ছিলাম। 

শুরুতেই বলছি,
ভূতুড়ে বলার আসল কারণ-
আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন খুব দুরন্ত  ছিলাম। একঘেয়ে, বদমেজাজি, মারকুটেসহ সুন্দর উপাধি ছিল আমার। মা আমাকে সামলে নিতে ঐই ভূতের বিষয়টা মাথায় চরম ভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তবে মায়ের বিশ্বাস  ছিল, আমার উপর সত্যি একটা জীনের নজর আছে। কারণ, আমি বাড়ির যে পাশটা ঘন জঙ্গল ছিল। যে পাশটাই একা একা ঘুরে বেড়াতাম। যেখানে মধ্যাহ্নের সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করতো না, সেখানে আমার পদচারণ ছিল সারাক্ষণ। আজকাল সে জায়গাটাই একা যাওয়ার ইচ্ছেটাই গা ভয়ে ছমছম করে।

জোড়া পুকুরের মাঝামাঝি একটা স্থানে কতগুলো গাছ জমাট বেঁধে আছে। তারপর সারি সারি চেনা-অচেনা গাছের  ছায়া শেষে বাহির বাড়ির ঘরটার বারান্দা একটা বাচ্চা মেয়ে ধুলোবালি নামক খেলাঘর পেতে রাখতো প্রতিদিন। নিজের  বড় হয়ে যাওয়ার পরও মনে হয় ছোটবেলার সবকিছু হারিয়ে গেলেও মনে মনে আজও খেলাঘর পাতি।

আজ ঐদিনগুলোর কথা মনে পড়লেই প্রথম স্মৃতিতে ভেসে উঠে কিছু বনফুলের ছবি। বিশাল  বাড়িটাই  অযত্নে প্রতিদিন ফোট তো নাম না জানা বেশকিছু ফুল। আর দোয়েল, ঘুঘু, শালিক, ময়না, হলদে পাখির চলাচল ছিল মানুষের চলাচলের থেকেও শাব্দিক। আমার মনে পরে ঐ হলদে পাখিটার কথা। যাকে পোষ মানানোর ইচ্ছেই কত চিড়েজল ঢেলেছি।

ফুলের স্পর্শ বা ঘ্রাণ আজও আমায় মুগ্ধ করে, যেমনটি করতো ছোটবেলায়। জারুল, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, ল্যান্টেনা, কয়েক রকমের সাদা ফুল বাড়ির আনাচেকানাচে ফোটে থাকতো। ফুলের সুবাস পাওয়া যে সাধনার বিষয় কখনো  মনেই আসতো না।

নয়নতারা, হাসনাহেনা, সন্ধ্যামাতলীর কল্যাণের কখনো বুঝতে পারিনি পুষ্পহীন ঋতু বয়ে যেতে পারে। মৌসুমি ফুলের ঝোপে বছরের পর বছর জন্মমৃত্যুর খেলা হতো অজান্তে।

তবে এতো ফুলের মাঝেও প্রিয় ফুল ছিল নাম না জানা এক বনফুল। শুভ্র পাপড়ির মাঝখানে একটা অদ্ভুত লাল রং লেগে থাকতো ফুলগুলোতে। তোরা বেঁধে ফোট তো শীতে শেষে। গাছে গাছে কিশলয় মনের অজান্তে জেগে উঠলেও ঐ  নাম না জানা বনফুলগুলো স্মরণ করিয়ে দিতো বসন্ত এসে গেছে।
 আর তখনি মা বলে দিতো,
‘এটা ভালো ফুল নয়। হাতে ধরতে যাবি না, চোখ ওঠা রোগ হবে।’ চোখ ওঠা বিষয়টা যে খুব যন্ত্রণাদায়ক তা পূর্ব অভিজ্ঞায় অনুধাবন করতাম।
তবে ফুলটার প্রতি ভালবাসা কমতো না। স্পর্শের বাহিরে অচেনা মায়া হয়ে রয়ে গেছে ঐ প্রথম ভালবাসার বনফুল।

আমার দেয়া নাম ‘চোখ ওঠা ফুল’ এর মায়া আজও কাটে নি। আজকাল আর আমার শহরে ঐ ফুলটা ফোটে না। বসন্তে আমার বাড়ি ফেরাও হয় না। তবে আমি এখন ঐ ফুলটার নাম জানি। শৈশবের আতঙ্ক মিশানো প্রিয় ভাঁটফুলের প্রত্যাশা এখনও আমি করি। এক নজর দেখার ইচ্ছে জাগে। স্পর্শ করতেও ইচ্ছে করে  ঐ শুভ্রতাকে।

আরও পড়ুন : গল্প : বিদায়; সাময়িক

তবে মাঝেমাঝে প্রশ্ন জাগে অন্ধ বিশ্বাসে সত্যিটা জানার পরেও। আচ্ছা, সত্যিই কী ভাঁটফুলের স্পর্শে চোখ ওঠে?

নাকি একজন মা চাইনি তার মেয়ে কোন অখ্যাত বনফুলের প্রেমে পড়ুক?

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড